জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখার পরেও ভোলা জেলার জলেরা দরিদ্রই থেকে যায়

আহরিত ইলিশের বিচারে ভোলা জেলা একক ভাবে সবার শীর্ষে; মোঃ জহিরুল ইসলাম

জুলাই ০৬ ২০২০, ১০:৩৮

Spread the love

আজকের ঝলক নিউজ :

দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মৎসখাত প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করে আসছে। মৎসখাত থেকে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৩%, জিডিপির ৪.৩৭% এবং মোট কৃষি খাতের ২৩.৭% ভাগ অর্জিত হয় (১)। ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে মোট বার্ষিক মৎস উৎপাদন ছিল ৩৪,১০,২৫৪ মেট্রিক টন এবং ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩.৫১ মেট্রিক টন যা দেশে মাছের মোট উৎপাদনের ১১% এবং জিডিপির ১% ((Sharker et all, Fish Aqua J 2016 7.2)। মাছ বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন খাবারের অন্যতম একটি উপাদান যা প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০% সরবরাহ করে। এক্ষেত্রে ইলিশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করে। এর গুরুত্বের জন্য এটি বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। দেশের ইলিশের স¤পদ মূলত সর্ব সাধারণের জন্য অবারিত একটি খাত হিসেবে বিবেচিত এবং এই বৃহৎ সম্পদ দেশের বিশাল মৎসজীবি জনগোষ্ঠী কর্তৃক আহরিত হয়ে থাকে।

ভারতীয় নদী ”সাদ”(Tenualosa ilisha, Hamilton, 1822)যা স্থানীয়ভাবে ”ইলিশ” নামে পরিচিত তা থেকেই বাংলাদেশের বৃহত্তর এই একক মাছের প্রজাতির নামের উৎপত্তি। বঙ্গপোসাগরে তিন ধরণের ইলিশ মাছ পাওয়া যায় যথা, তেনুয়ালসা ইলিশ, কেলি ইলিশ এবং টলি ইলিশ(Tenualosa ilisha, Hilsa kelee, and Hilsa toli)। প্রাপ্ত ইলিশের মধ্যে বেশির ভাগই তেনুয়ালসা প্রজাতির। সাধারণভাবে যদিও ইলিশ মাছ নদীর মাছ (এ্যানাড্রমাস মাছ) হিসেবে বিবেচিত তথাপি, একে সামুদ্রিক মাছ (ডায়াড্রমাস মাছ) হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়, যার অর্থ এই মাছ নদী এবং সমুদ্র উভয়েই বিচরণ করে।

এই এ্যানাড্রমাস মাছ সাধারণত ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, বাগেরহাট, লক্ষীপুর, চাঁদপুরে মেঘনা নদীর মোহনায়, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার জেলায় এবং মেঘনা এবং পদ্মা নদীতে পাওয়া যায়। যদিও, প্রতি বছর সারা দেশজুড়ে আহরিত ইলিশের বিচারে ভোলা জেলা একক ভাবে সবার শীর্ষে।

ভোলা বাংলাদেশের মূল ভুখন্ড হতে বিচ্ছিন একটি জেলা শহর যা নদীর মোহনা দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং বাংলাদেশের দক্ষিণের সাতটি উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত বৃহত্তম একটি দ্বীপ। এটি বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত এবং এর আয়তন ৩৭৩৭.২১ কিঃমিঃ। এর উত্তরে বরিশাল এবং লক্ষীপুর জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে লক্ষীপুর এবং নোয়াখালী জেলা এবং মেঘনা নদী ও শাহবাজপুর চ্যানেল এবং পশ্চিমে পটুয়াখালী জেলা এবং তেতুলিয়া নদী অবস্থিত। কৌশলগত দিক থেকে সুবিধা জনক স্থানে অবস্থানের কারণে ভোলা জেলায় প্রতি বছর সর্বোচ্চ পরিমাণে উৎকৃষ্ট মানের ইলিশ আহরিত হয়। ভোলা জেলাকে পরিবেষ্টিত করে রাখা নদীসমূহ বিশেষত, তেতুলিয়া এবং এর শাখাসমূহ ইলিশের প্রজনন এবং বেড়ে ওঠার উত্তম স্থান। প্রজনন মৌসুমে ইলিশের স্থান পরিবর্তনের মূল নদীগুলোও ভোলা জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। যার ফলে, সারা বছর এই জেলার নদীতে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ মাছ পাওয়া যায় এবং জেলেরা প্রতি বছর প্রায় ১১৪,৬৪৬ মেট্রিক টন ইলিশ সহ মোট ১৬০,৮০৮ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করে (বাংলাদেশ মৎস চাষ হ্যান্ডবুক-২০১৩-১৪)।

এই পরিসংখ্যান আরও দেখায় যে, ভোলা কেবল মাত্র বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইলিশ উৎপাদনকারী (১১৪,৬৪৬ মেঃটঃ) জেলাই নয় উপরন্তু দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০% এর যোগানদাতা (মোট দেশজ উৎপাদন ৩৮৫,১৪০ মেঃটঃ) (বাংলাদেশ মৎস চাষ হ্যান্ডবুক-২০১২-১৩)। প্রতি বছর ইলিশ আহরণের এই হার ৮%-১০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে (ওয়ার্ল্ড ফিস)। আহরিত ইলিশের মোট মুল্য প্রায় ৫০,০০০ মিলিয়ন টাকা (৫,০০০ কোটি টাকা) যা জাতীয় অর্থনীতিতে ভোলা জেলার মৎস শিকারিদের বার্ষিক অবদান। ইলিশের পাশাপাশি এসব জেলেরা প্রতি বছর আনুমানিক ৪৫০ কোটি টাকা সমমূল্যের অন্যান্য প্রায় ৪৬,১১২ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করে থাকে। তথাপি, জাতীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখার পরেও ভোলা জেলার প্রায় ১.৫ লক্ষাধিক জেলেরা দেশের অন্যান্য জেলেদের মতই দরিদ্রই থেকে যায়।

মোঃ জহিরুল ইসলাম,

সহকারী পরিচালক, জেন্ডার-এ্যাকুয়াকারচার ও কোস্টাল ফিশারিজ ।

ছবি : ইকোফিশ প্রকল্প থেকে নেয়া ।


Translate »