মৎস্যজীবীদের নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন

মৎস্যজীবী ও জেলেদের আর্থ-সামাজিক জীবিকা; মোঃ জহিরুল ইসলাম

ডিসেম্বর ২২ ২০২০, ২০:২৬

Spread the love

 

ajkerjholok

ভোলা জেলায় ক্ষুদ্র পরিসরে মৎস চাষের সাথে স¤পৃক্ত অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র, প্রান্তিক এবং প্রতিক’ল পরিবেশের কাছে অসহায়। উপক’লীয় এলাকার জেলেরা অন্যতম প্রগতিশীল এবং প্রতিযোগীতাপূর্ণ একটি এলাকায় বসবাস করে যেখানে ঝুঁকি তাদের জীবিকার কৌশলের একটি অংশ। এটি দরিদ্রদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে কিন্তু একই সাথে এটি তাদের জীবন, স¤পদ, আয় এবং সঞ্চয়ের উপর হুমকি সৃষ্টি করে যার অর্থ মৎসজীবি সমাজের মানুষের দরিদ্রতা হতে মুক্ত হবার উলেখযোগ্য সুযোগ থাকা জরুরী। কিন্তু বাস্তবতা হল, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জেলেদের জীবিকার মতই ভোলা জেলার জেলেদের জীবিকাও সময়ের সাথে দূঢ় ভাবে অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভোলা জেলার বহু সংখ্যক জেলেদের জীবন এবং জীবিকা জেলার চারপাশের পানি স¤পদের সাথে স¤পৃক্ত। নদী তীরে বসবাসকারী জেলেদের জীবিকার মান বহুলাংশে নদীর জীব-বৈচিত্র এবং মৎস স¤পদের উপর নির্ভরশীল। একটি জীবিকাকে তখনই টেকসই বলা যায় যখন তা মানুষকে পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলতে এবং চাপ ও ঝুঁকি হতে মুক্ত থাকতে এবং প্রাকৃতিক স¤পদের বিনষ্ট না করে বর্তমান ও ভবিষ্যতে স¤পদের ব্যবস্থাপনা এবং সুরক্ষা করতে সহায়তা করে (চেম্বার্স, ১৯৯২)।

বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক এবং জীবিকা স¤পর্কিত গবেষণা প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে যে, ক্ষুদ্র পরিসরে মৎস চাষীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং জীবিকার স্বরূপ-প্রকৃতি দেশের সমগ্র উপক’লীয় অঞ্চলে কম-বেশি একই রকম। এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গবেষক এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা অনেক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং এসব গবেষণা প্রতিবেদন ওয়েবসাইট সহ বিভিন্ন মাধ্যম বিস্তারিত পাওয়া যাচ্ছে। তথাপি আমরা ভোলা জেলার ক্ষুদ্র মৎস চাষীদের আর্থ-সামাজিক এবং জীবিকার জাতিগত অবস্থা স¤পর্কে আলোকপাত করছি।

জরিপকালীন সময়ে সেকেন্ডারি ডাটার সত্যতা জেলেদের জীবিকার অবস্থা স¤পর্কিত বিভিন্ন ভেরিয়েবলের প্রেক্ষিত বিবেচনায় যাচাই করা হয়েছে। এই ভেরিয়েবলের মধ্যে রয়েছে বয়স কাঠামো, ধর্ম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুবিধাসমূহ, পরিবারের আকার, বাড়িঘরের অবস্থা, সুপেয় পানির সুবিধা, পয়ঃনিস্কাশন সুবিধা, বিদ্যুত সুবিধা, আয়, ঋণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ সুবিধা, ঝুঁকি, অধিকার,অসহায়ত্ব/দুরবস্থা, সমস্যা ইত্যাদি।

ক) বয়স কাঠামো
বয়স কাঠামো কোন সমাজে একজন জেলের অবস্থান এবং ভ’মিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ভোলা জেলার জেলেদের বয়স কাঠামো বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিভিন্ন বয়স ভিত্তিক দল যথা, ১৫-৩০ বছর (যুবক দল), ৩১-৫০ বছর (মধ্যম বয়স দল), ৪৫ বছরের উর্ধে (বৃদ্ধ বয়স দল) ইত্যাদির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। দেখা গেছে যে, মধ্যম স্তরের বয়স কাঠামো(৩১-৫০ বছর) ছিল সর্বোচ্চ ৪০% এবং বৃদ্ধ বয়স দল (৪৫ বছর এবং তদুর্ধ) ছিল সব চেয়ে কম (২৫%)। গবেষণা এলাকায় ৩৫% জেলে যুবক বয়স কাঠামোর (১৫-৩০ বছর) অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর অর্থ হল, মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত মানব স¤পদের বেশির ভাগই সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষম বয়স কাঠামো অর্থাৎ ১৫-৪৫ বছর বয়স কাঠামো থেকে আসে যা এক্ষেত্রে নিয়োজিত মোট মানব স¤পদের ৭৫% এর যোগান দেয়।

খ) ধর্মীয় অবস্থা
গবেষণা অঞ্চলে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের একচ্ছত্র প্রধান্য পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রায় ৯৫% জেলে মুসলমান ধর্মাবলম্বী এবং বাকি ৫% জেলে হিন্দু। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষত দেশের মধ্যাঞ্চলে অনেক স্থানেই বৃহৎ সংখ্যক জেলে হিন্দু ধর্মাবলম্বী (জলদাস স¤প্রদায়), কিন্তু উপক’লীয় অঞ্চলে বেশীরভাগ জেলেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এই পরিস্থিতি এটা প্রমাণ করে যে, মুসলমান জেলেরা বছরের পর বছর ধরে মাছ ধরা পেশায় যোগদান অব্যাহত রেখেছে যেখানে চিরাচরিত হিন্দু জেলেরা নিজেদের অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত করেছে যার মধ্যে পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে স্থানান্তরও অন্তর্ভ’ক্ত।

গ) জেলেদের শিক্ষাগত অবস্থান
শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি অনুসন্ধান করে দেখা গেছে ভোলা জেলার ৮.৩৩% জেলে নিরক্ষর। বেশিরভাগ জেলে (৪৫%) শুধুমাত্র স্বাক্ষর করতে পারে যা এই এলাকায় কিছু সংখ্যক এনজিওর শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রমের ফল বলে প্রতীয়মান হয়; অন্যদিকে ৪১.৬৭% জেলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছে (১ম থেকে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত) এবং অবশিষ্ট ৫% জেলেরা মাধ্যমিকের গন্ডি (৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী) পর্যন্ত পৌঁছেছে।

জরিপ পরিচালনাকালীন সময়ে জেলেদের সাথে আলোচনা করে দেখা গেছে তারা তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে আরও উপরের দিকে নিয়ে যেতে আগ্রহী। তারা শিক্ষিত হতে চায় যেন অন্যরা তাদের অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে তাদেরকে প্রতারিত করতে না পারে। মন্দা মৌশুমে যখন জেলেদের কাজ কম থাকে কিংবা একদমই থাকে না তখন অধিকাংশ পরিবার তাদের স্কুল পড়–য়া বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারে না। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিলক্ষিত হয়েছে যা হল, এইসব জেলে পাড়ার কাছাকাছি খুব কম সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

জেলেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বাইরে শিশুদের শিক্ষাগত অবস্থান প্রমাণ করে যে, অধিকাংশ শিশুই অতি দরিদ্রতার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা পর্যন্ত সমাপ্ত করতে পারে না। এর ফলে বাবা-মায়েরা তাদের ছেলে সন্তানদের নিজেদের সাথে নদীতে মাছ ধরার কাজে নিযুক্ত করে। অধিকিন্তু, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যখন কোন পরিবারে কম সংখ্যক উপার্জনকারী সদস্য থাকে কিংবা পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য অধিক আয়ের প্রয়োজন পড়ে তখন অনেক পরিবারই তাদের ছেলে সন্তানদের অন্য নৌকায় মাছ ধরার জন্য পাঠায়। অন্যদিকে, শিক্ষার সাথে আপোষ এবং অনেক ঝুঁকি থাকার পরেও বাল্যবিবাহ জেলে পারার মেয়েদের ক্ষেত্রে খুবই প্রচলিত একটি ব্যবস্থা। যদিও কোন পরিবারের কোন সন্তান স্কুলের গন্ডি পেরোতে পারে তাদের পিতা-মাতারা সেই সন্তানদের কলেজে ভর্তি করাতে সমর্থ হন না। এর ফলে এসব ছেলেরা হয় মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত হয় কিংবা গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে তৈরী পোষাক কারখানা কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে কাজ করে অর্থ আয় করার চেষ্টা চালায়। এর ফলে, শিক্ষা গ্রহণের তীব্র ইচ্ছা থাক সত্বেও শিশুরা শিক্ষা হতে বঞ্চিত হয়।

ঘ) জেলেদের স্বাস্থ্য সুবিধা সমূহ
কোন পরিবার কিংবা সমাজে জীবিকার মান কিংবা অবস্থান নির্ধারণে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিফলন। জেলেরা যে স্বাস্থ্য সুবিধাসমূহ ভোগ করে তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। সাধারণত জেলেরা অদক্ষ, অপেশাদার গ্রাম্য ডাক্তারদের থেকে তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে থাকে। দেখা গেছে প্রায় ৬০% পরিবার অদক্ষ গ্রাম্য ডাক্তার/ ঔষধের দোকানের উপরে নির্ভরশীল যাদের আসলে নিরাপদ চিকিৎসাশাস্ত্র স¤পর্কে কোন ধারণা নেই, যদিও ৩০% পরিবার জটিল কোন সমস্যার কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যায় এবং বাকি ১০% কবিরাজি চিকিৎসার উপরে নির্ভরশীল। একটি ভাল লক্ষণ হল এই যে, বেশিরভাগ পরিবারই তাদের সন্তানদের ক্যা¤েপইন চলাকালীন সময়ে পোলিও টিকা দেবার জন্য নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।

যাহোক, এক সাধারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে জেলে পাড়ার অবস্থানগত কারণে জেলে পরিবারগুলোর উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কমপ্লেক্স হতে সেবা গ্রহণের হারে ব্যাপক তারতম্য হয়। ভোলা জেলার অধিকাংশ জেলে পাড়াই উপজেলা সদর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত যা জেলে পাড়া এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের পথে বিরাট এক অন্তরায়। এবং দুর্গমতার কারণে জেলে পাড়াগুলোতে কমিউনিটি ক্লিনিকও নেই যেখান থেকে প্রয়োজনে জেলেরা তাদের স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে।

ঙ) পরিবারের আকার
এই জরিপে প্রাপ্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ৫৩.৩৩% পরিবারে ২-৫ জন, ৪০% পরিবারে ৬-৯ জন, এবং কেবলমাত্র ৬.৬৭% পরিবারে ১০ কিংবা ১০ এর অধিক সদস্য ছিল। দেখা গেছে যে, জেলেরা পূর্বের তুলনায় এখন পবিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সচেতন।

চ) আবাসন পরিস্থিতি
গ্রামের বাড়িগুলো মূলত টিনের চালা ঘর; এই টিনের ঘরগুলোকে আবার ক্ষুদ্র টিনের চালা এবং মাঝারি টিনের চালা এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। দেখা গেছে জেলেরা স্থায়ীত্ব এবং বাতাসের বিপরিতে সুরক্ষার কারণে তাদের ঘরের চালা হিসেবে টিন বেশি পছন্দ করে। উপরন্তু, আজকাল বাঁশ এবং ছনের তুলনায় টিনের দাম কম। অধিকাংশ জেলে পরিবারই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কিংবা সরকার কর্তৃক নির্মিত গুচ্ছ গ্রামে বসবাস করে কারণ তাদের নিজেদের কোন জমি নেই কিংবা জমি কেনার সামর্থ্যও নেই। এসব জেলেরা ভোলা জেলার স্বাভাবিক বিষয় নদী ভাঙ্গনের কারণে প্রায়শই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তাদের বসতি স্থানান্তর করে। এই জন্যই তারা চালা হিসেবে টিন পছন্দ করে কারণ এটা প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্যত্র দ্রæত স্থানান্তর করা যায়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, অধিকাংশ উত্তরদাতাই ক্ষুদ্র টিনের চালা ঘরে বসবাস করে এবং শুধু মাত্র ৪০% জেলেদের নিজেদের বসত ভিটা আছে এবং ৬০% জেলেদের নিজেদের কোন জমি নেই এবং তারা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কিংবা গুচ্ছ গ্রামে বসবাস করে।

ছ) নিরাপদ পানির সুবিধাঃ
এটি একটি ভাল দিক যে, ১০০% পরিবার টিউবওয়েলের পানি পান করে। অধিকাংশেরই নিজস্ব টিউবওয়েল না থাকলেও তারা প্রতিবেশীদের এবং স্বল্প দুরত্বে অবস্থিত স্কুল এবং মসজিদে সরকার কর্তৃক স্থাপিত টিউবওয়েল থেকে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে পারে। ভোলায় ৬০ জন জেলের মধ্যে শুধু মাত্র ৪ জনের নিজস্ব টিউবওয়েল ছিল এবং বাকি ৫৬ জন জেলে প্রতিবেশীদের এবং সরকারী টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করে থাকে। জেলেরা যখন নদীতে মাছ ধরতে যায় তখন খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিশের সাথে তারা খাবার জন্য প্লাস্টিকের পাত্রে করে টিউবওয়েলের পানি নিয়ে যায়।

জ) পয়ঃনিস্কাশন সুবিধাঃ

জেলেদের পয়ঃনিস্কাশন সুবিধা খুবই নগন্য, ৭৪% পায়খানাই কাঁচা এবং ২২% পায়খানা আধা-পাকা যা এখানকার জেলেদের দরিদ্র আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং নি¤œ আয়ের পরিপ্রেক্ষিতকেই তুলে ধরে। এছাড়াও দেখা গেছে যে, বেশিরভাগ শিশুরাই খোলা স্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করে।

ঝ) বিদ্যুত সুবিধাঃ
দুর্গম এবং বিদ্যুতের লাইনের থেকে অনেক দূরে বসবাসের কারণে জেলে পাড়াতে কোন বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। জেলেরা কেরোসিন তেল দিয়ে তাদের ”হারিকেন” বাতি জা¡লায়।

ঞ) আয়ের উৎস সমূহঃ
দেশের অন্যান্য স্থানের মতই ভোলা জেলার জেলেরা তাদের মূল আয় এবং পুষ্টির জন্য মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল। বংশ পর¤পরায় তারা মাছে ধরার সাথে স¤পৃক্ত। জরিপ অঞ্চলের জেলেরা দিন, রাত কিংবা দিন-রাত ২৪ ঘন্টাই মাছ ধরার কাজে স¤পৃক্ত থাকে বলে জানা যায়। দিনের বেলায় জেলেরা সাধারণত ভোর ৫টা থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত মাছ ধরতে পছন্দ করে। আর রাতের বেলায় তারা সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত মাছ ধরে। মাঠ পর্যায়ে পেশাদার এবং মৌসুমি উভয় ধরণের জেলেদেরই অস্তিত্ব লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমান বিশ্লেষণ বলছে পেশাদার জেলের হার আনুমানিক ৬৫% এবং মৌসুমি জেলের হার ৩৫%। দেখা গেছে অমৌসুম কিংবা যে সময়ে মাছ ধরার উপরে নিষেধাজ্ঞা থাকে তখন জেলেরা বিকল্প কোন পেশায় নিযুক্ত থাকে, যেমন- ৩০% জেলে কৃষি কাজ করে, ২৫% জেলে শ্রমিকের কাজ করে, ৩০% জেলে গবাদি প্রাণি যেমন-গরু, ছাগল, মহিষ, হাস-মুরগী ইত্যাদি পালন করে, ১০% জেলে রিক্সা-ভ্যান চালায় এবং ৫% জেলে ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে স¤পৃক্ত থাকে।

ট) বার্ষিক আয়
একটি পরিবারের আয়ের অবস্থা কোন একটি সমাজের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নির্দেশ করে। একজন জেলের বার্ষিক আয় তার প্রধান এবং বিকল্প পেশা থেকেই মূলত এসে থাকে। ভোলা জেলার সমস্ত জেলেদের তাদের বার্ষিক আয়ের ভিত্তিতে মোট চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ভাগে সেসব জেলেরা রয়েছে যাদের বার্ষিক প্রকৃত আয় ৫০,০০০ টাকার কম। দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে মূলত সেসব জেলেরা যাদের আয় যথাক্রমে ৫০,০০১ থেকে ৭৫,০০০ টাকা, ৭৫,০০১ থেকে ১০০,০০০ টাকা এবং ১০০,০০০ টাকার উর্ধে। দেখা গেছে যে, সবচেয়ে কম বার্ষিক আয় অর্থাৎ ৫০,০০০ টাকার কম আয় করা জেলেদের সংখ্যাই মূলত সবচেয়ে বেশি (৪৫%) এবং সবচেয়ে বেশি আয় করা অর্থাৎ ১০০,০০০ টাকার বেশি আয়কারী এমন জেলের সংখ্যা সবচেয়ে কম (মাত্র ১০%)। ২৫% জেলেদের বার্ষিক শুদ্ধ আয়ের পরিমান ৫০,০০১ থেকে ৭৫,০০০ টাকা এবং ২০% জেলেদের বার্ষিক শুদ্ধ আয় ৭৫,০০১ থেকে ১০০,০০০ টাকা। এতে দেখা যায়, বছরে ৫০,০০০ টাকা শুদ্ধ আয় করতে পারেনা এমন জেলে পরিবারের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

ঠ) ঋণের সুবিধা
এই এলাকায় বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যাংক যেমন আশা, র্ব্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, প্রশিকা, কারিতাস, কোস্ট ট্রাস্ট এবং কিছু মহাজন জেলেদের মাঝে ঋণ বিরতণ করে থাকে। সরকারী ঋণ সুবিধা জেলেদের কাছে পৌছায় না যেহেতু ঋণ ব্যাংকের গ্রহণের নীতিমালার সাথে জেলেদের অবস্থান এবং সক্ষমতা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে জেলেদের জন্য ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু জেলেরা বিভিন্ন করণে ব্যাংক থেকে লোন গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেনা। বর্তমান এক জরিপে দেখা গেছে যে প্রায় ৬৫% জেলে বিভিন্ন এনজিও থেকে ৫,০০০-১্০০০ টাকার সমপরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছে এবং প্রায় ৩৫% জেলে কোন ধরণের ঋণই গ্রহণ করেনি (এস আফরোজ ২০১৪)।

মাছ বাজারজাতকরণ শৃঙ্খলে অর্থায়নের ক্ষেত্রে আড়ৎদারগণ মূল ভুমিকায় আসীন, যেখানে তারা এই প্রক্রিয়ার পূর্বে এবং পরে উভয় সময়েই অর্থায়ন করে থাকে। জেলেদেরকে উলেখযোগ্য হারে ঋণ দেবার পেছনে সরবরাহকারী এবং ক্রেতার স¤পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করে। যখন একজন জেলে কোন দাদনদারের কাছ থেকে দাদন গ্রহণ করে তখন সে কার্যত তার সমস্ত মাছ একজন নির্দিষ্ট আড়ৎদারের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দাদনদার এবং আড়ৎদার একই ব্যক্তি হন। এক্ষেত্রে আড়ৎদার কমিশনের ভিত্তিতে লাভবান হন (প্রায় ৫%-৭%)। একই সাথে আড়ৎদার ঋণ দেবার মাধ্যমে কিছুটা ঝুঁকিও গ্রহণ করেন কারণ, ঋণ গ্রহণের পরে সমস্ত টাকা সহ ঋণ গ্রহীতা অন্যত্র চলে যেতে পারে।

দাদনদার (যেমন- আড়ৎদার কাম মহাজন) সাধারণত মাছ ধরার মৌসুম শুরুর আগেই ঋণ দেয় যা জেলেদের কাজের মূলধন হিসেবে ব্যবহৃত হয় (যেমন- নৌকা মেরামত, জনবল সংগ্রহ, জাল ক্রয়, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ ইত্যাদি)। এর ফলে জেলেরা শুধুমাত্র দাদনদারের কাছেই তাদের মাছ বিক্রি করতে পারে যে কিনা জেলেদের বাজার দামের চেয়ে ২০-৪০% কম দাম দেয়। এনজিওগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি দেশের নির্দিষ্ট এলাকাসমূহে চিরাচরিত ঋণ দাতাদের দিকে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে এবং যা সুদের হার কমানোতে বিশেষ ভ’মিকা পালন করেছে (যেমন-ভোলা জেলায়)। যার ফলে এখানে কমিশনের হার মাসিক ৫-১০%, অন্যদিকে দুর্গম এলাক সমূহ যেখানে এনজিওগুলোর উপস্থিতি কম সেখানে এই হার ১০-২০% (যেমন-নিঝুম দ্বীপ, হাতিয়া)। এনজিওগুলোর সাথে প্রতিযোগীতাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করেছে।

প্রশিক্ষণ সুবিধা
দেখা গেছে কিছু সংখ্যক জেলে যাদের বিভিন্ন এনজিও এবং সরকারী প্রকল্পের সাথে স¤পৃক্ততা আছে তারা কিছু বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছে। জরিপে দেখা গেছে শুধু মাত্র ২৫% জেলেরা এক বা একাধিক সংশিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছে, ৭৫% জেলেদের কোন ধরণের প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা নেই (এস আফরোজ-২০১৪)।

বিরোধ নিরসন/ব্যবস্থাপনা
স্থানীয়া গ্রাম্য নেতারাই অধিকাংশ পারিবারিক দ্বন্দ কিংবা বিরোধ নি¯পত্তি করেন, যদিও অনেক সময় স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যেমন-ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, চেয়ারম্যান তারাও বিরোধ নি¯পত্তি করে থাকেন। পুরুষের তুলনায় নারীরা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই কম স্বাধীনতা ভোগ করেন।

ভিজিএফ (ঝুঁকিপ্রবন জনগোষ্ঠীর খাদ্য ব্যবস্থাপনা) সুবিধা
দরিদ্রতা প্রশমন এবং জীবিকার মানোন্নয়নে এই এলাকায় এ বছর খুব সীমিত পরিসরে সরকারী কিছু কার্যক্রমের সন্ধান পাওয়া গেছে। সম্প্রতি সরকার অমৌসুমে (ফেব্রুয়ারী-মে) জেলেদের মাঝে কিছু ভিজিএফ কার্ড বিতরণ করেছে। এক জরিপে দেখা গেছে যে, শুধুমাত্র ২৫-৪০% জেলেরা এই ভিজিএফ কার্ড পেয়েছে এবং বাকি ৬০% মানুষ জেলে হওয়া সত্ত্বেও ভিজিএফ কার্ড পায়নি। ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেক জেলে পরিবারের চার মাস ব্যাপি মাসিক ৪০ কেজি করে চাল পাবার কথা ছিল, যদিও কার্ড গ্রহণকারী জেলেরা দাবি করেছে যে সরকার বরাদ্দকৃত নির্ধারিত পরিমাণে চাল তাদেরকে দেয়া হয়নি। তারা শুধু মাত্র ৩০-৩৫ কেজি চাল পেয়েছে এবং বাকি ৫-১০ কেজি চাল বিতরণই করা হয়নি।

বিভিন্ন মৌসুমে জেলেদের জীবিকার কৌশল
সকল জেলেদের জীবিকার কৌশল কম বেশি একই ধরণের। অধিকাংশই মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোন ধরণের আয় বর্ধক কাজ জানে না। অতয়েব, বছর জুড়েই তারা নদীতে মাছ ধরার চেষ্টা চালায়। ভরা মৌসুমে তারা কাছাকাছি নদী এবং মেঘনার গভীরে ইলিশ ধরে। এছড়াও তারা বছর ব্যাপি তারা অন্যান্য প্রজাতির মাছ যেমন- চাওয়া, পোয়া, বেলে, আইড়, বোয়াল, পাঙ্গাস, রিঠা, তাপসী, পুঁটি, বাঁচা, হোলা, চিংড়ি ইত্যাদিও ধরে থাকে। যখন মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে তখন অধিকাংশ জেলে পরিবার কর্মহীন থাকে এবং দাদনদারের কাছ থেকে ঋণ এবং দাদন নিয়ে সংসার চালায়। এই সময় ১০% জেলেরা দিন মজুরী কাজ কিংবা মাছের আড়ৎদারের কাজ করে।

দাদনদারের কাছ থেকে ঋণ এবং দাদন নিয়ে সংসার চালায়। এই সময় ১০% জেলেরা দিন মজুরী কাজ কিংবা মাছের আড়ৎদারের কাজ করে।

জেলে পরিবারের সাথে স¤পৃক্ত এনজিও এবং তাদের কার্যক্রম
বিভিন্ন এনজিও যেমন র্ব্যাক, আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, দিশা এই এলাকায় কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের কাজের মধ্যে রয়েছে জেলেদের ঋণ সহায়তা প্রদান যার বিপরিতে তারা ১২% সুদ আদায় করে এবং এই ঋণ উপর্যুপরি ৪৪ কিস্তিতে শোধ করতে হয়। জেলে পাড়াগুলোতে র্ব্যাক গভীর নলক’প স্থাপন, প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনার মত কিছু জীবিকা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই সমগ্র উপক’লীয় অঞ্চলের জেলেদের সাথে বিশেষ করে ভোলা জেলার জেলেদের ক্ষমতায়নের জন্য তাদের জীবিকার মানোন্নয়ন, এবং তাদের অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাবার ক্ষেত্রে কোস্ট ট্রাস্টের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।

ঝুঁকি এবং দুর্যোগ পরিস্থিতি/উপলব্ধি
অন্যান্য জীবিকার মতই মাছ ধরা পেশা ভোলা জেলায় নানাবিধ ঝুঁকি দ্বারা পরিবেষ্ট। যেকোন পেশার ক্ষেত্রেই যদি ঝুকি মোকাবেলায় যথাযথ কৌশল গ্রহণ করা না হয় তাহলে তা সেই জীবিকার স্থায়ীত্বকে অরক্ষিত করে দিতে পারে। পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেবার সক্ষমতা কিংবা পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেবার অক্ষমতার কারণে জেলে সমাজের পক্ষে মাছ ধরার ক্ষেত্রে বিরাজমান ঝুঁকি সমূহ চিহ্নিত করা কঠিন। যদিও সঠিক স্থানে যথাযথ নীতিমালা প্রনয়ণ এবং এর সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে এসব ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস এবং সহনীয় করে তোলা যায়। অধিক আয়ের প্রত্যাশার কারণে উপক’লীয় এলাকায় মাছ ধরা পেশা সব সময়েই মানুষকে আকৃষ্ট করে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা হল সমপর্যায়ের অন্যান্য অনেক খাত কিংবা উপখাতের তুলনায় বেশি আয় করলেও জেলেরা সব সময়ে দরিদ্রই থেকে যায়।

১. জেলেরা এমন একটি কঠিন পরিবেশে কাজ করে যেখানে প্রচুর সহজাত ঝুঁকি বিরাজমান এবং কোন পূর্বানুমানই সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় না কারণ, পরিবেশের সমন্বিত বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মাছের ভ্রমনস্থল, জৈবাবস্থা এবং প্রজনন স্থানের পরিবর্তনের কারনে প্রতিনিয়তই মাছের উৎপাদন কমছে। নদী দুষণ, আবাসস্থল ধ্বংস, বর্ধিত হারে জলবায়ু পরিবর্তন, উজানের পানির প্রবাহ হ্রাস এবং নদীর নব্যতা হ্রাসের কারণে জেলেদের মাছের উৎপাদন ও সংগ্রহ কমে যাচ্ছে। এবং যদি আয় কমে যায় তাহলে জেলে পরিবারগুলো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে এবং জীবিকার অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় থেকে বঞ্চিত হবে।

২. তারা নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়, বন্যা এবং জোয়ারের ঢেউ ইত্যাদির কাছে অসহায়। ঝড় এবং বন্যার পাশাপাশি প্রায় প্রতিবছর ভয়াবহ সাইক্লোন (উঁচু পানির ঢেউ সহ) আঘাত হানে এবং জেলেদের জীবন এবং জীবিকার মারাতœক ক্ষতি সাধন করে। বঙ্গপোসাগরের খুব কাছেই অবস্থানের কারণে ভৌগলিক ভাবে ভোলা জেলা নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে। অধিকাংশ জেলে পাড়াগুলো সাধারণত নদীর তীরবর্তি বাঁধের উপরে এবং বাঁধ সংলগ্ন ঢালে অবস্থিত। এর ফলে সাগর থেকে সৃষ্ট যেকোন ঝড়, সাইক্লোণ কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রথম আঘাত জেলে পাড়ার উপরেই আসে এবং প্রতি ক্ষেত্রেই অনেক জেলে জীবন হারায় এবং তাদের অন্যান্য স¤পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
৩. বস্তুগত স¤পদের পাশাপাশি উপক’লীয় অঞ্চলের জেলেরা যেকোন প্রাক্রিতিক দুর্যোগ যেমন ঝড় কিংবা সাইক্লোণের সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণ বয়ে থাকে। উপক’লীয় অঞ্চলের জেলেরা প্রায়শই কাছাকাছি সাগরে ৩-৪ দিনের জন্য মাছ ধরতে যায়। এরফলে যখন কোন সাইক্লোনের পূর্ভাবাস দেয়া হয় তখন প্রতি বারই অনেক জেলে নির্ধারিত সময়ে নিরাপদ স্থানে ফেরত আসতে পারে না। এর ফলে, জেলেরা তাদের কষ্টে অর্জিত নৌকা, জাল, এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিকই শুধু হারায় না, সাথে তাদেও প্রাণটাও যায়। হতাহতের এই সংখ্যা অনেক বেশি কিন্তু আমরা খুব অল্প সংখ্যকের খবরই জানি।

৪. উপরের ঝুঁকিগুলো ছাড়াও আরও একটি ঝুঁকি রয়েছে যা হল সমুদ্রে ডাকাতি যা দরিদ্র জেলেদের জীবিকাকে মারাতœকভাবে প্রভাবিত করে। পূর্বের তুলনায় মাছ ধরা এবং মাছের বেচাকেনা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্রে ডাকাতির পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, কক্সবাজার থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত সমগ্র উপক’লজুড়ে জলদস্যুদের প্রভাব খুব বেশি এবং প্রায় প্রতিদিনই এই সমগ্র উপক’লজুড়ে জেলেরা দাকাতদের হাতে তাদের মাছ ধরার সরঞ্জাম এবং ধৃত মাছ হারাচ্ছে। এছাড়াও, প্রতি মৌসুমের শুরুতে সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমতি পাবার জন্য প্রতিটি নৌকার বিপরীতে আড়ালে থাকা গড ফাদারকে ৩০,০০০-৫০,০০০ টাকা প্রদান করতে হয়।

দুরবস্থা পরিস্থিতি/উপলব্ধিঃ
দুরবস্থা মূলত কোন ঝুঁকি কিংবা দুর্যোগের কাছে উচ্চ মাত্রার বহিঃপ্রকাশের সরাসরি ফলাফল যা জীবিকার সংবেদনশীলতাকে প্রকটভাবে প্রভাবিত করে। অতি দুরবস্থা জেলেদের সঞ্চয় এবং ভবিষ্যত বিনিয়োগের সক্ষমতা হ্রাস করে। প্রাপ্ত সেকেন্ডারি ডাটার সত্যতা এফজিডি এবং ইন্ডিভিজুয়াল

ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে যাচাই করার পরে চরফ্যাশন এবং ভোলা উপজেলায় নিন্মেক্ত দুরবস্থার কারণগুলো প্রতীয়মান হয়েছে। এসব দুরবস্থার উতপত্তি যদিও মাছ শিকারের বাইরের বিষয় এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের সাথে স¤পৃক্ত।

খাদ্য নিরাপত্তাঃ
প্রতি বছর জেলে পাড়াগুলো ৩-৪ মাসের জন্য খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। অমৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার কারণে এই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এপ্রিল-জুলাই মাসে খাদ্যের অভাব প্রকট আকার ধারণ করে। শুধু মাত্র অল্প কিছু জেলে যাদের কৃষি জমি আছে কেবল তারাই বছর জুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

আয়ে অনিশ্চিয়তাঃ
সকল জেলেরাই আয়ের ব্যাপারে তাদের ভাগ্যের উপরে নির্ভর করে। আজকাল এমন কোন নিশ্চয়তা নেই যে, তারা প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে মাছ ধরতে পারবে যা তাদের জীবিকার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাবে। যেহেতু তাদের প্রায় সকলেরই ঋণ রয়েছে তাই আগামী দিনের পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর মত কোন সঞ্চয় তাদের হাতে নেই। মাছ সংরক্ষণ প্রচারাভিযান পরিচালনার ফলে এই অনিশ্চয়তা কয়েক গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছ ধরার ভরা মৌসুমে (বর্ষাকালে) অনেক জেলেই তাদের প্রতিদিনের অভিযানে পর্যাপ্ত পরিমাণ মাছ ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করেন যে, ওই সময়ে তাদের প্রচুর জ্বালানী, আনুষঙ্গিক অন্যান্য স¤পদ এবং শ্রমের অপচয় হয়। এই অবস্থা উপক’লীয় অঞ্চলে বসবাসরত দরিদ্রদের জীবিকায় সু¯পষ্ট প্রভাব বিস্তার করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবঃ
বর্ষা মৌসুম (জুন-সেপ্টেম্বর) মাছ ধরার জন্য খুবই উপযোগী সময় যখন নদীর মোহনা এবং সাগর উভয় স্থানেই প্রচুর পরিমাণে মাছ থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিগত প্রায় এক যুগ ধরে সমুদ্রে মাঝে মধ্যেই নিুচাপের সৃষ্টি হয় যা কখনও কখনও ২-৩ সপ্তাহ স্থায়ী হয়। নি¤œচাপের সময়ে জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারেনা এবং নদীর মোহনা এবং সমুদ্রে অশান্ত অবস্থা এবং উঁচু ঢেউয়ের কারণে উপক’লে অলস সময় কাটায়। উপরন্তু, নি¤œচাপের প্রখরতা বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে। এই অবস্থা জেলেদের বছরের বেশ খানিকটা সময় মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে, আগে যেখানে শুধু নিষেধাজ্ঞার সময়টাতেই তারা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকত। বলাই বাহুল্য, এর ফলে জেলেরা নি¤œ আয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে যা তাদের জীবিকাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।

অধিকার এবং ন্যায় বিচার প্রাপ্তির সীবাবদ্ধতাঃ

প্রান্তিক জেলেরা অধিকাংশ সময়েই উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়ে থাকে, এর কারণ হল, হয় তারা ভাসমান (এদের অধিকাংশই তাদের মূল ভুখন্ড থেকে নদী ভাঙ্গণের কারণে বিতাড়িত হয়েছিল এবং বর্তমানে সরকারী স¤পত্তি নদী রক্ষা বাঁধের উপরে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে), প্রান্তিক এবং দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী, স্থানীয় পর্যায়ে তাদের কোন প্রতিষ্ঠান নেই, এদের অনেকেই ভোটার নয় এবং কর্তৃপক্ষের কাছে জেলেদের স¤পর্কে কোন ডাটাবেইস নেই অথবা জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের ভ’মিকা এবং অবদান স্বল্প পরিসরে জ্ঞাত এবং অবমূল্যায়িত। এসব কারণে হয়ত তারা সরকার,এনজিও এবং দাতা সংস্থা সমূহ থেকে দুরবস্থা কাটানোর জন্য এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করণ এবং সেবা প্রাপ্তিতে তেমন কোন সহায়তা পাচ্ছে না।

সার্বিক পরিস্থিতি হল এই যে, চলমান দুরবস্থা এবং সামাজিক অবহেলার কারণে সকল জেলে পাড়াগুলোই উন্নত জীবিকা নিশ্চিতে নিজেদের অধিকার এবং ন্যায়বিচার দাবি করার উদ্দীপনা এবং সক্ষমতার অভাবে ভোগে। এমনকি তারা সঞ্চয় করতে এবং মাছ ধরার উপ অতি নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্য কোন বিকল্প ক্ষেত্রে তাদের আয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্দীপনা এবং সক্ষমতার অভাবে ভোগে। এমনকি, যখন অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন হয়ত অন্য কোন শক্তিশালী বিষয়ের কারণে তারা সেগুলো রক্ষা করতে পারেনা।



আমাদের ফেসবুক পাতা

প্রয়োজনে কল করুন 01740665545

আমাদের ফেসবুক দলে যোগ দিন




Translate »