বোরো মৌসুমে হাওড় অঞ্চলে একটা উভয় সংকটের সৃষ্টি হয়

হাওড় অঞ্চলে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয়জনিত কথিকা

জুন ০৭ ২০২০, ১৪:২৪

Spread the love

হাওড় অঞ্চলে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয়জনিত কথিকা

প্র্রাণিবিদ . আকন্দ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

একটা বিষয় লক্ষ্য করুন। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশে বোরো মৌসুমে হাওড় অঞ্চলে একটা উভয় সংকটের সৃষ্টি হয়। বন্যা আসবে আগে, না ধান উঠবে আগে? এ টানাপোড়েনে বিদ্যমান শ্রমিক সংকট আরও সংকটতর হয়। বিপাকে পড়েন কৃষকরা। বিগত বছর (২০১৯ সাল) স্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যেও হাওড় অঞ্চলে ধান কাটার মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছিল । আর এবার (২০২০)-এ “দুর্বৃত্ত কোভিড-১৯”-এর আক্রমণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সংকট আরো তীব্রতর হয়েছে। তবে আল্লাহর ইচ্ছায় সরকারের দূরদৃষ্টির ফলে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকে কাজে লাগিয়ে কোন মতে সংকট মোকাবিলা করা গেছে বলে ধারণা করা যায়। তবে এগুলো কোন স্থায়ী সমাধান নয়।

কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওড় অধুষ্যিত এলাকাগুলো শ্রমিক সংকট এলাকা হিসেবে পরিচিত । অন্য জেলাগুরোর তুলনায় এ সব জেলার আর একটা ঋণাত্মাক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বোরোধান ঘরে তোলার প্রাক্কালে হাওড়ে পানি ওঠা। তাই এ সব জেলায় প্রয়াশঃই দ্রুত বোরো ধান কাটা দরকার হয়। এ দ্রুততার সমর্থনে সব সময় পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যায় না।

উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁও, যশোর, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর, দিনাজপুর, নওগাঁ, নাটোর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, মেহেরপুর, কুড়িগ্রাম ও সাতক্ষীরা এ জেলাগুলোতে দেশের সবচেয়ে বেশী উদ্বৃত্ত শ্রমিক রয়েছে। তাই প্রতি বছর এ সময়ে এ জেলাগুলো থেকে হাওড় অঞ্চলে গিয়ে ধান কাটার কাজে যোগ দেন কৃষি শ্রমিকরা। হাওড় অঞ্চলের জমির ধান কর্তনের জন্য পনের লাখের অধিক শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে বলে জানা যায়। তাই এ ঘাটতি পূরণে বণির্ত জেলা গুলো হতে শ্রমিকদেরকে হাওড় অঞ্চলে যেতে হয় বা নিতে হয়। দূর-দূরান্ত থেকে কৃষি শ্রমিকদের হাওড় অঞ্চলে যাতায়াত সব সময়ই একটা অনিশ্চয়তার বার্তা বহন করে। গণপরিবহন বন্ধ থাকা/ধর্মঘট/প্রাকৃতিক দুর্যোগ/মহামারী/সাধারণ অসুস্থতা/রাজনৈতিক অস্থিরতা/সান্ধ্য আইন জারী হলে যে কোন বছর কৃষকরা বিপাকে পড়তে পারেন।

তাই শ্রমিক সংকট মেটানোর স্থায়ী সমাধানের কথা ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি যন্ত্র কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে হচ্ছে। বিশষতঃ হাওড়ে বন্যা আশংকায় দ্রুত বোরো ধান কাটার বাধ্যবাধকতা থাকায় প্রত্যেক কৃষকের ঘরে-ঘরে ছোট আকারের কম দক্ষতা সম্পন্ন কম দামী রিপার/হারভেস্টার (ধান কাটার যন্ত্র)সাধারণ ঋণের আওতায় এবং “কমন সার্ভিস” হিসেবে ব্যবহারের জন্য অধিক দক্ষতাসম্পন্ন অধিক দামী হারভেস্টার নেতৃস্থানীয় কৃষকদেরকে(lead farmers)/ স্থানীয় বেকার যুব-সম্প্রদায়কে সাধারণ ঋণের আওতায়, বা লীজে বা স্টার্ট-আপ ঋণের আওতায় সরবরাহ করা যেতে পারে। এবিষয়ে প্রশিক্ষণ/ওরিয়েন্টেশন দিয়ে এমনভাবে কৃষকদের মাথায় ঢুকিয়ে যন্ত্রের ব্যবহারে অভ্যস্থ করতে হবে যাতে জীবনে আর শ্রমিক সমস্যার কারণে ধান নষ্ট না হয়। একদিনে যেখানে হাওড়ের তিন হেক্টর জমির ধান কাটতে  একশত তিরাশি জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, সেখানে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন হারভেস্টার দিয়ে মাত্র চুয়ান্ন জন শ্রমিককে কাজে লাগিয়ে উক্ত ধান কাটা সম্ভব।

ফলে এ হিসেবে  প্রতি তিন হেক্টর জমির ধান কাটতে একশত ঊণত্রিশ জন শ্রমিককে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে যাতায়াত ভাড়ার যোগানসহ ঝক্কি পোহায়ে আনার ব্যয়বহুল সংকট থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। বতর্মানে শিক্ষিত যুব সম্প্রদায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কৃষি কাজে আগ্রহী হয়ে উঠছে, যে আগ্রহ কাজে লাগিয়ে হাওড়ের স্থানীয় যুব সম্প্রদায়কে প্রশিক্ষণসহ “কমন সার্ভিস” জনিত লীজ/স্টার্ট-আপ-ঋণের আওতায় কৃষিযন্ত্রপাতি সরবাহরে মাধ্যমে তাদের কমর্সংস্থানের পাশাপাশি হাওড়ের বোরো ধান দ্রুত কাটার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা যেতে পারে।

তবে কৃষি যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সাবধানী হওয়ারও আবশ্যকতা রয়েছে। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে দীর্ঘ মেয়াদে জমি আঁটসাঁট হয়ে অন্তমৃত্তিকার রন্ধ্র কিছুটা বন্ধ হতে পারে।  তাই যতটা সম্ভব পেট্রল চালিত হালকা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। পেট্রল চালিত হালকা কৃষি যন্ত্র তুলনামূলকভাবে বেশী মৃত্তিকা বান্ধব ও  পরিবেশসম্মত হয়। আর ডিজেল চালিত মেশিনকে পেট্রল চালিত মেশিনে রূপান্তরিত করলেও পরিবেশ দূষণ কম হবে, তার কারণ, পেট্রল চালিত মেশিন ডিজেল চালিত মেশিন অপেক্ষা বায়ুমন্ডলে কম কাবনডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করে। এ ছাড়া, একই জমিতে যাতে প্রতি বছর মেশিন ব্যবহার করতে না হয় সে জন্য শস্য  চক্র (crop rotation) –এর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে পর্যায়ক্রমিকভাবে এক বছর পর পর ভারী মেশিন ব্যবহার যোগ্য ফসল এবং ভারী মেশিন ব্যবহার বহিভূর্ত ফসল ফলানো সম্ভব হয়।

প্রসঙ্গত: এবারের এ করোনা-সংকট সময়ে দাতা সংস্থা, ক্ষুদ্র অথার্য়নকারী প্রতিষ্ঠান ও কৃষক এ ধরণের যন্ত্রের প্রয়োগের বিষয়ে কাজ করতে আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। আগামী মৌসুমে যাতে এ সমস্যা না থাকে সে জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে বিশেষতঃ ক্ষুদ্র অথার্য়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করছি। আর আমি নিজেও এ কাজে শীঘ্রই জড়িত হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করে এ লেখা শেষ করছি।

আমাদের ফেসবুক পাতা

প্রয়োজনে কল করুন 01740665545

আমাদের ফেসবুক দলে যোগ দিন


Translate »