হালদায় ডিম সংগ্রহে রেকর্ড

করোনার দুর্যোগ ছাপিয়ে পিকেএসএফ’র হালদা-উপ-প্রকল্পের সফলতা

মে ২৩ ২০২০, ০৬:৩২

Spread the love

করোনার দুরযোগ ছাপিয়ে পিকেএসএফ-এর হালদা-উপ-প্রকল্পের সর্বোচ্চ সফলতা: 

Islam Akond

আপনারা জানেন বাংলাদেশের হালদা বিশ্বের এক অনন্য নদী। এটি বিশ্বের একমাত্র জোয়ার ভাটা সমৃদ্ধ রুই জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র। এছাড়া এ নদীতে রয়েছে বিপন্ন প্রজাতীর ডলফিনসহ বহু জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের বসবাস। এক সময় মৌসুমে এ নদীতে রুই জাতীয় মাছেরা প্রচুর পরিমানে ডিম পাড়তো। ১৯৪৫ সালে ১,৩৬,০০০ কেজি, ১৯৫০ সালে ৯০,০০০ কেজি , ২০০৭ সালে ২২,০০০ কেজি এবং এ ভাবে কমতে কমতে ২০১৬ সালে এখানে মাত্র ১২ কেজি নমুনা ডিম পাওয়া যায়। মনুষ্যসৃষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতা (যেমন-নির্বিচারে মা মাছ শিকার, নদী তীরে ইটের ভাটা চালানো, নদী থেকে বালু উত্তোলন,নদীর বাঁক কর্তন, স্ল ইজ গেট নির্মাণ, বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণ, কলকারখানার বর্জ্য নিসরণ ইত্যাদি)–এর কারণে হালদা নদীর উৎপাদনশীলতা দিন দিন উপরোক্তভাবে কমতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান-ইফাদের সহায়তাপুষ্ট PACE প্রকল্পের অর্থায়নে বিগত ১০ই এপ্রিল, ২০১৬ তারিখ হতে পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থা ‘ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ)’-এর মাধ্যমে পিকেএসএফ “হালদা নদীতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়ন” শীর্ষক ভ্যালু চেইন উপ-প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের বাস্তবায়নের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে রুই জাতীয় মাছের ডিম প্রাপ্তির সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিগত ২০১৭ সালে হালদা নদীতে ১,৬৮০ কেজি, ২০১৮ সালে ২২,৬৮০ কেজি এবং ২০১৯ সালে ৭,০০০কেজি ডিম পাওয়া গেছে (ভাটার সময় ডিম পাড়ায় ডিম ভেসে যাওয়ায় সবটা গণনা সম্ভব হয় নি)। আর এবারে ১৪ বছরের রেকরড ভঙ্গ করে ২৫,৫৩৬ কেজি ডিম পাওয়া যায় এখানে।

এ সফলতার পিছনে সরকারী-বেসরকারী অনেক প্রতিষ্ঠানের অবদান থাকলেও পিকেএসএফ ও এর সহযোগী সংস্থা আইডিএফ-এর কর্মকাণ্ডের অবদান বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। পিকেএসএফ-এর এ প্রকল্পের আওতায় গৃহীত নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে প্রাকৃতিক প্রজনন নিবিড় করার লক্ষ্যে হালদা নদীতে পাহারার ব্যবস্থা করা; স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় নদীতে অবৈধ জাল/ইঞ্জিন চালিত নৌকা/ড্রেজার ব্যবহার রোধে টহল পরিচালনা; সামাজিক আন্দোলনের গড়ে তোলার মাধ্যমে নদী পাড়ের কলকারখানাগুলোতে পরিবেশসম্মত কর্মকাণ্ড ফিরিয়ে আনা; নদী পাড়ের স্কুল-মাদ্রাসায় সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক ক্যাম্পেইন; উজানে তামাক চাষ বন্ধ করে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা; মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে নদীর মা মাছ শিকার বন্ধে কর্মকাণ্ড পরিচালনা; পলিসি ডায়লোগ/অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে ক্ষতিকর উন্নয়ন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনয়ন; বিভিন্ন অংশীজন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকারের বিভিন্ন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নদীকেন্দ্রিক সচেতনতা বৃদ্ধি; বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারগরি পরামশক কমিটি গঠন; হালদা বিশেষঞ্জ ড. মঞ্জরুল কিবরিয়ার তত্ত্বাবধানে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হালদা নদী গবেষণা কেন্দ্র (যা বাংলাদেশের একমাত্র একক নদী গবেষণা কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা করা উল্লেখযোগ্য। সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে-সকল পর্যায়ে কাযর্করী সচেতনতা বৃদ্ধি, বিশেষত:এ প্রকল্পরে মাধ্যমে উর্দ্ধতন মহলের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চ পযায়ের টাস্ক ফোর্স গঠিত হওয়ায় সফলতা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। যে যে মন্ত্রণালয় হালদার সাথে জড়িত তাদের সকলকে নিয়ে টাস্ক ফোর্স গঠিত হয়েছে। এতে স্থানীয় বেসরকারী সংস্থা থেকে শুরু করে পুলিশ বিভাগ পযর্ন্ত অন্তভুর্ক্ত রয়েছে। উল্লেখ্য, এ করোনার মধ্যেও অবৈধ মৎস্য শিকারীদের জাল পোড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকায় অদ্যকার এ সুফল। সরকারের উচ্চ মহলের পরিদর্শনোত্তর পরামর্শও এ সফলতা আনয়নে কাজ করেছে। একটি সুসংবাদ হচ্ছে-এ নদীর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে। আরও সুসংবাদ হচ্ছে- প্রকল্প মেয়াদ ২০২২ পযর্ন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আমাদের পিকেএসএফ-এর চেয়ারম্যান মহোদয় (ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ স্যার) প্রকল্পের কর্মকাণ্ডগুলো প্রকল্প-মেয়াদান্তে পিকেএসএফ-এর মূল স্রোত কর্মসূচীর আওতায় অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, পিকেএসএফ-এর উপ-ব্যবস্থপনা পরিচালক জনাব ফজলুল কাদের মহোদয়ের নিবিড় তত্ত্বাবধানে আমরা সুচারুরূপে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারছি তাই তাকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।ভবিষ্যতে এটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পাক এ আশা ব্যক্ত করে এবং হালদার এ মৎস্য প্রজনন সফলতায় জড়িত আমার পিকেএসএফ-এর সহকর্মীবৃন্দ, আইডিএফ-এর কমর্কতা-কমীগণ, আমাদের অভিভাবক মন্ত্রনালয় (অর্থ মন্ত্রণালয়ের আথির্ক প্রতিষ্ঠান বিভাগ-যাদের সহায়তায় প্রকল্প গ্রহণ সম্ভব হয়েছে)সহ সরকারী-বেসরকারী সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, মৎস্যজীবী, বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এ লেখা শেষ করছি ।

 


Translate »