লেখক মোঃ জহিরুল ইসলাম
জীবনের সবচেয়ে বড় নেশা : আড্ডা !!
জানুয়ারি ১৩ ২০২৬, ০৯:৪৪
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নেশা : আড্ডা
—নেই সেই আড্ডা, দিন শেষে একা থাকার বাস্তবতা
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নেশা ছিল আড্ডা দেওয়া। এই নেশা কোনো ক্ষতিকর দ্রব্যের নয়, বরং মানুষের—মানুষের কথা, হাসি, তর্ক, চা-সিগারেটের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে জীবনের গল্প ভাগ করে নেওয়ার এক অপার্থিব টান। আড্ডা ছিল আমার জীবনের অক্সিজেন। ক্লান্তি, দুঃখ, ব্যর্থতা—সবকিছু ভুলে থাকার এক অদ্ভুত আশ্রয়। কিন্তু আজ সেই আড্ডা আর নেই। দিন শেষে সবকিছু ভুলে থাকার বদলে আমাকে মুখোমুখি হতে হয় একা থাকার কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে।
এক সময় আড্ডা ছিল নিত্যদিনের রুটিন। কাজ শেষে কিংবা ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে বসে পড়া—কখনো চায়ের দোকানে, কখনো নদীর পাড়ে, কখনো কারও বাসার ছাদে। বিষয়বস্তু ছিল সীমাহীন—রাজনীতি, প্রেম, চাকরি, সমাজ, গান, কবিতা, কিংবা নিছক হাস্যরস। আড্ডায় সময়ের কোনো হিসাব থাকত না। ঘড়ির কাঁটা থেমে যেত, বাস্তবতা ঝাপসা হয়ে আসত। মনে হতো, এই মানুষগুলো থাকলে জীবনটা বেশ সহনীয়।
আড্ডা আমাকে শিখিয়েছে কথা বলতে, শুনতে, ভিন্নমত মানতে। অনেক সময় আড্ডাই ছিল আমার থেরাপি। যখন কোনো ব্যর্থতা গ্রাস করত, বন্ধুর একটি বাক্য, একটি হাসি সব ভার হালকা করে দিত। আড্ডার মধ্যেই জন্ম নিয়েছে বহু স্বপ্ন, বহু পরিকল্পনা, বহু প্রতিবাদ। আড্ডা শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম ছিল না; আড্ডা ছিল সম্পর্ক গড়ার কারখানা।
কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষ বদলেছে। জীবন নামের যুদ্ধে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজের মতো করে টিকে থাকার চেষ্টায়। কেউ চাকরির চাপে, কেউ সংসারের দায়ে, কেউ বিদেশের টানে, কেউ বা নিঃশব্দে নিজের ভেতরেই হারিয়ে গেছে। একে একে আড্ডার মানুষগুলো সরে গেছে। আর আড্ডা? সে যেন নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছে—কোনো ঘোষণা ছাড়াই।
এখন আর কেউ বলে না, “চল বসি।” কেউ ফোন করে না শুধু গল্প করার জন্য। সবাই এখন ‘ব্যস্ত’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য বন্ধু থাকলেও, বাস্তব জীবনে আড্ডার সেই উষ্ণতা আর নেই। ভার্চুয়াল কথোপকথনে হাসি আছে, কিন্তু স্পর্শ নেই; শব্দ আছে, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা নেই।
দিন শেষে যখন ঘরে ফিরি, তখন চারপাশে নিস্তব্ধতা। এই নিস্তব্ধতা কখনো শান্তির, আবার কখনো প্রচণ্ড ভারী। আগে দিন শেষে আড্ডা ছিল দিনের সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার জায়গা। এখন দিন শেষে আমাকে একাই নিজের সঙ্গে বসতে হয়। নিজের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। পালিয়ে থাকার সুযোগ নেই।
একাকিত্ব তখন ধীরে ধীরে বাস্তব হয়ে ওঠে। বোঝা যায়, মানুষ যতই ভিড়ে থাকুক, শেষ পর্যন্ত সে একাই। এই সত্যটা মানতে কষ্ট হয়। কারণ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল—কথার ওপর, মানুষের ওপর, সম্পর্কের ওপর। আড্ডা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই নির্ভরতার জায়গাটাও ফাঁকা হয়ে যায়।
তবু এই একাকিত্ব আমাকে কিছু শিখিয়েছে। শিখিয়েছে নিজের সঙ্গে কথা বলতে। আগে যে সময়টা আড্ডায় কাটত, এখন সেই সময়টায় নিজের ভাবনার সঙ্গে বসি। নিজের ভুল, নিজের চাওয়া-পাওয়া, নিজের সীমাবদ্ধতা—সবকিছু নতুন করে বুঝতে চেষ্টা করি। একাকিত্ব আমাকে আত্মমুখী করেছে, হয়তো কিছুটা কঠোরও।
তবে আমি অস্বীকার করতে পারি না—আমি এখনো আড্ডাকে মিস করি। গভীরভাবে মিস করি। সেই নির্ভার হাসি, অকারণ তর্ক, গভীর রাতের গল্প—সবকিছু। মাঝে মাঝে কোনো পুরোনো জায়গায় গেলে মনে হয়, এখানেই তো বসতাম আমরা। সেই জায়গাগুলো আজও আছে, মানুষ নেই।
আড্ডা না থাকলেও স্মৃতি থাকে। স্মৃতির ভেতরেই বেঁচে থাকে সেই সময়গুলো। আর হয়তো এই স্মৃতিগুলোই আমাকে ভেতরে ভেতরে শক্ত করে তোলে। কারণ আমি জানি, একসময় আমি একা ছিলাম না। আমি জানি, আমি মানুষের সঙ্গে থাকতে পেরেছি, হাসতে পেরেছি, ভাগ করে নিতে পেরেছি।
আজকের বাস্তবতা একা থাকার। এই একাকিত্ব অস্বীকার করে লাভ নেই। বরং একে মেনে নিয়েই সামনে এগোতে হয়। হয়তো আবার কোনো নতুন আড্ডা আসবে, হয়তো আসবে না। কিন্তু জীবনের এই অধ্যায় আমাকে শিখিয়েছে—সব নেশাই একদিন ফুরায়, শুধু বাস্তবতাই থেকে যায়।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নেশা ছিল আড্ডা। সেই আড্ডা আর নেই। তবু জীবন থেমে নেই। দিন শেষে একা বসে আমি এটুকুই বুঝি—আড্ডা ছিল জীবনের রঙ, আর একাকিত্ব জীবনের সত্য। দুটো মিলিয়েই জীবন।
গানোর কথা, সুর ও শিল্পী: মোঃ জহিরুল ইসলাম
বেতারের সুরকার/প্রযোজক হলেন জহিরুল ইসলাম
https://www.youtube.com/watch?v=KY9ZFJoF1_w&list=RDKY9ZFJoF1_w&start_radio=1



























































































