সংসদে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

আমলাতন্ত্রের রোষানলে বেসরকারি শিক্ষকরা

জুলাই ০৫ ২০২০, ২৩:২০

Spread the love

আমলাতন্ত্রের রোষানলে বেসরকারি শিক্ষকরা

বৃটিশ উপনেবেশিক শাসনামল থেকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের উদ্ভাবন। রাষ্ট্র পরিচালনায় কৌশল নির্মিত হয় রাজনীতিবিদদের হাতে, আর তা বাস্তবায়ন করে আমলারা। সাধারণত আমলা বলতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বোঝায়। পাকিস্তান আমলে সিএসপি ও ইপিসিএস বর্তমানে বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা আমলা শ্রেণিভুক্ত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এসব কর্মকর্তারাই রাষ্ট্রের ভালোমন্দ দেখা শুনা করেন। রাজনীতিবিদরা নীতির বাস্তবায়নে আমলাদের ওপরই নির্ভরশীল থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রভুত্ববাদী মানসিকতায় আমলারা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন বলেই জনগণের দুঃখকষ্ট ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। জাতির দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার পর থেকে দেশের আমলাতন্ত্র অতিমাত্রায় প্রভুত্ববাদী চেতনায় বিকশিত হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলাদের উদ্দেশ্যে দেয়া সে-ই ঐতিহাসিক বক্তব্যের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

২০১০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সদিচ্ছায় জাতীয় শিক্ষানীতি’২০১০ মহান সংসদে অনুমোদিত হয়। দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭.৫৪% পরিচালিত হয় বেসরকারি ব‍্যবস্থাপনায়। সরকারি বেসরকারি পাঠ‍্যপুস্তক, কর্মঘন্টা, পাঠ‍্যক্রম, সিলেবাস, পরিক্ষা পদ্ধতি এক ও অভিন্ন। এতদসত্ত্বেও সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বেতন-ভাতা সুযোগ সুবিধার বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব বৈষম্য সৃষ্টির পেছনে আমলাদের প্রভুত্ববাদী মানসিকতা, অনিহা ও রোষানলে পড়ে শিক্ষকরা সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নিম্নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শিক্ষকদের বঞ্চনা ও বৈষম্য সৃষ্টির খন্ড চিত্র তুলে ধরা হলো।

এক।
জাতীয় শিক্ষানীতি’ ২০১০ এর ২৫ অধ‍্যয়ে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় সতন্ত্র বেতন স্কেল দেওয়া হবে। আমলাদের প্রবল বিরোধিতার কারণে দীর্ঘ দশ বছরেও সতন্ত্র স্কেল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। আমলাদের ভয় বেসরকারি শিক্ষকদেরকে সতন্ত্র স্কেল দেওয়া হলে ক‍্যাডার ও শিক্ষকদের মধ্যে পদ মর্যাদার ভারসাম্য রক্ষায় বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে।

দুই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিও নীতিমালা এবং জনবল কাঠামো’২০১৮ প্রকাশ করেছে। এই নীতিমালা মূলত আমলাদের তৈরিকৃত শিক্ষকদেরৎকে বঞ্চিত ও বৈষম্য সৃষ্টির অভিপ্রায়ে বিতর্কিত একটি নীতিমালা। এতে শিক্ষকদের টাইমস্কেল পূর্বের ৮ বছরের স্থলে ১০ বছর ও ১২ বছরের অভিজ্ঞতার স্থলে ১৬ বছর করা হয়েছে। অন্যকোন পেশায় অভিজ্ঞতার সীমারেখা ১০ বছর আছে কিনা আমাদের জানা নেই।
প্রভাষকদের ১০ বছর পর একটি টাইমস্কেল প্রাপ্ত হবেন যা মাত্র এক হাজার টাকার ব্যবধান। বিতর্কিত অনুপাত প্রথায় সহকারী অধ্যাপকের ৫:২ বিধান রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে অধিকাংশ প্রভাষকরা আজীবন প্রভাষক হিসেবেই অবসরে যেতে বাধ্য হবেন। অনুপাত প্রথার কারণে একই শিক্ষাগত যোগ্যতায় একজন সহকারী অধ্যাপক অন্যজন আজীবন প্রভাষক এটি মেনে নেয়া সত্যি কষ্টকর। অনুপাত প্রথার বিলুপ্তি ও ৮ বছর পূর্তিতে প্রভাষকদের ৭ম গ্রেডে পদোন্নতি দেয়া প্রয়োজন।

তিন।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে সবচেয়ে মেধাবী এই শ্রেণীটির উপর বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার দায়ভার ন্যস্ত ছিলো। কিন্তু আমলাদের প্রভুত্ববাদী মানসিকতার কারণে শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নে আশানুরূপ অবদান রাখতে পারেনি কখনোই। দেশের বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে মূলত আমলারা বিরোধী পক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন বলে দৃশ্যমান হচ্ছে।

চার।
সরকারের প্রবল সদিচ্ছা থাকার পরও আমলাদের রোষানলে পড়ে বিগত ১০ বছরে জাতীয় শিক্ষানীতির ৩০% সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও আমলাদের সদিচ্ছার অভাবে আজো একটি শিক্ষা আইন তৈরি করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বরঞ্চ আওয়ামী সরকারের ১১ বছরের শাসনামলে আমলাদের রোষানলে ও চাতুরিপনায় শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যপক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে এতে শিক্ষকদের মধ্যে ব্যপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পাঁচ।
সকল পর্যায়ের চাকরিজীবীরা নির্দিষ্ট সময়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেয়া হলেও আমলাদের কারসাজিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের দুই বছর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বঞ্চিত করা হলো। এখানেও ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বঞ্চিত শিক্ষকরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।

ছয়।
২০১৮ এমপিও নীতিমালা ও জনবল কাঠামোতে বেসরকারি শিক্ষকদের বদলীর নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। অথচ বদলীর নীতিমালা বাস্তবায়নে আমলাদের আন্তরিকতার প্রচুর অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সাত।
বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য আমলাদের প্রহসনের বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা পাঁচ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এক হাজার টাকা বাড়িভাড়া ও পাঁচ শ’ টাকা চিকিৎসা ভাতা বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি আমলাদের নির্মম তামাশার-ই বহিঃপ্রকাশ।

আট।
বেসরকারি শিক্ষকদের ১৬ বছর ধরে উৎসবভাতা ২৫% যা অত্যন্ত অমর্যাদাকর এবং সামাজিক বাস্তবতায় অসামঞ্জস্য। দেশের পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানালেও আমলারা নির্বিকার চিত্তে আছেন। অদ্যাবধী কার্যকর কোন উদ্যোগ বাঁ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

নয়।
অনৈতিক ভাবে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর কল্যাণ ট্রাস্টে বাড়তি সুবিধা না দিয়ে অতিরিক্ত কর্তনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রতিবাদে শিক্ষকরা দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। তাতে কর্ণপাত না করে ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে অতিরিক্ত ৪% কর্তনের প্রজ্ঞাপন বহাল ও বেতন কর্তন করে আমলারা প্রমাণ করেছে বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি তারা কতটা ক্ষুব্ধ, কতটা রুষ্ট।

দশ
দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি শিক্ষকরা ৮ বছর ও ১২ বছরের দুটি টাইম স্কেল পেয়ে আসছিল, অথচ কোন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে শিক্ষকদের টাইমস্কেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখানেও আমলাদের প্রভুত্বশালী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

একাদশ
২০১৫ সালের জাতীয় পেস্কেল নির্ধারণের পর কোন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষকদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান সহঃ প্রধানদের একধাপ নিচে স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানেও বেসরকারি শিক্ষকরা বৈষম্য আমলাদের রোষের শিকার হয়েছেন।

দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ৯৭% দায়িত্বে নিয়োজিত বেসরকারি শিক্ষকদের বঞ্চনা, বৈষম্য ও অভুক্ত উদরে রেখে মানসম্মত শিক্ষার ধারণা অমূলক। শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বভার রাষ্ট্রকেই পালন করতে হবে। দেশের আমলারা মেধাবী এবং উচ্চশিক্ষিত অথচ তাদের দ্বারা জাতির কতটা কল্যাণ হয়েছে তা পরিসংখ্যানের বিষয়। এ যাবৎকালে ভালো হোক, মন্দ হোক জাতীয় কল‍্যাণ যতটুকু অর্জিত হয়েছে, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারাই হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আমলাতান্ত্রিক নির্ভরশীলতা দূর করা উচিত। আমলাতন্ত্রের রোষানল থেকে শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরণ এবং মানোন্নয়নে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়রণের লক্ষ্যে সংসদে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক নেতাদের কে। সেই প্রত্যাশায়-

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম

আমাদের ফেসবুক পাতা

প্রয়োজনে কল করুন 01740665545

আমাদের ফেসবুক দলে যোগ দিন


Translate »