প্রয়োজন কার্যকর সহ-ব্যবস্থাপনা
ইলিশ সংরক্ষণে অকার্যকর নিষেধাজ্ঞা নয়
অক্টোবর ২০ ২০২৬, ১০:৪১
ইলিশ সংরক্ষণে অকার্যকর নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন কার্যকর সহ–ব্যবস্থাপনা
প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে জেলেদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণই হতে পারে টেকসই সমাধান
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ, আমাদের ঐতিহ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের বিপুলসংখ্যক মৎস্যজীবীর জীবিকা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই ইলিশের প্রজনন, বংশবৃদ্ধি ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইলিশ সংরক্ষণের জন্য যে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার পদ্ধতি কতটা কার্যকর, ব্যয় কতটা যৌক্তিক এবং এর সুফল কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে?
আমরা বারবার বলে আসছি, ইলিশ সংরক্ষণে শুধু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা, নদীতে অভিযান পরিচালনা, জাল জব্দ বা ধ্বংস করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করতে পারবে না। বরং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে একটি অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
বিপুল ব্যয়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল কোথায়?
ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও বাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। নদীতে অভিযান পরিচালনা, নৌযান ব্যবহার, জনবল নিয়োগ, জাল জব্দ, পাহারা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়।
কিন্তু এত আয়োজন ও ব্যয়ের বিপরীতে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, কতসংখ্যক জেলে প্রকৃতপক্ষে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন, কতসংখ্যক অবৈধ জাল ও নৌযান নিয়ন্ত্রণে আসছে এবং ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনে কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
নদীতে অভিযান পরিচালনা করা মানেই নিষেধাজ্ঞা শতভাগ কার্যকর হওয়া নয়। একইভাবে, বিপুলসংখ্যক জাল জব্দ করাও এককভাবে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির সুরক্ষা, অবৈধ মাছ ধরা হ্রাস, জেলেদের আইন মানার প্রবণতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতার উন্নতির মাধ্যমে।
অতএব, বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। যে পদ্ধতিতে সরকারি অর্থ ও জনবলের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে, অথচ কাঙ্ক্ষিত ফল কতটা অর্জিত হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়, সেই পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে আলোচনা এখন সময়ের দাবি।
জেলেদের প্রতিপক্ষ নয়, সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে
ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলেন মৎস্যজীবীরা। নদীর গতিপ্রকৃতি, মাছের বিচরণক্ষেত্র, স্থানীয় জলপ্রবাহ এবং মাছ ধরার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় জেলেদের প্রধানত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। জেলেদের সম্পৃক্ততা ছাড়া নদীভিত্তিক একটি বিস্তৃত সংরক্ষণ কার্যক্রম কার্যকর করা কঠিন। কারণ নদী ও খাল বিস্তৃত, জনবল সীমিত এবং সব এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা ব্যয়সাপেক্ষ।
অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার সময় একজন প্রকৃত জেলে মাছ ধরতে না পারলে তাঁর পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকট দেখা দিতে পারে। বিকল্প জীবিকা ও পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার অভাবে কোনো কোনো জেলে বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তাই জেলেদের জীবিকা ও ইলিশ সংরক্ষণকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে না দেখে একই ব্যবস্থাপনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জেলেদের ন্যায্য সহায়তা নিশ্চিত করে তাঁদেরই নদী রক্ষার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ইলিশ সংরক্ষণে সাতটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব
১. অংশগ্রহণমূলক সহ–ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন
ইলিশ সংরক্ষণে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সহ-ব্যবস্থাপনা বা কো-ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এই কমিটিতে মৎস্যজীবীদের প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, মৎস্য অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় এনজিওর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠানও যুক্ত থাকবে।
কমিটির দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি সুস্পষ্ট হতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের অংশগ্রহণ, নারী সদস্যদের পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত নিশ্চিত করতে হবে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটবে এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমের প্রতি মানুষের মালিকানাবোধ তৈরি হবে।
২. বাস্তবতা ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ
নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণে মৎস্য গবেষণা, ইলিশের প্রজননচক্র, নদীর পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি জেলে ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, প্রস্তুতি এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
তবে আইনগতভাবে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞার সময় কোনো স্থানীয় কমিটি এককভাবে পরিবর্তন করতে পারবে না। সময়সূচি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত গ্রহণ করে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় উপস্থাপন করতে হবে। চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত সময়সূচি বাস্তবায়নে সরকার, জেলে প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো লিখিত অঙ্গীকারের মাধ্যমে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে।
৩. নিষেধাজ্ঞাকালে জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জামের নিরাপদ সংরক্ষণ
নিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য নির্ধারিত সরঞ্জাম স্থানীয় সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির তত্ত্বাবধানে নিরাপদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে জালের মালিকের নাম, পরিচয়, নিবন্ধন নম্বর, জালের ধরন ও সংখ্যা উল্লেখ করে তালিকা তৈরি করতে হবে।
জাল জমা ও ফেরত দেওয়ার সময় লিখিত রসিদ, সংরক্ষণ রেজিস্টার এবং স্বচ্ছ যাচাইব্যবস্থা রাখতে হবে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে আইনসম্মতভাবে জালগুলো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
এই ব্যবস্থা চালুর আগে জেলেদের মতামত, নিরাপত্তা, সংরক্ষণ ব্যয় এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। কমিটির কাছে জাল জমা দেওয়ার পদ্ধতি যেন কোনোভাবেই জেলেদের বৈধ সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণ্ন না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
৪. নৌকা ও ঘাট ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় নজরদারি
নিষেধাজ্ঞাকালে মাছ ধরার নৌকাগুলো নির্ধারিত নিরাপদ ঘাট বা খালের উপযুক্ত স্থানে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে স্থানীয় পরিবেশ ও নৌযান চলাচলের পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাঁশের বেড়া বা অন্য উপযুক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে নৌকা রাখার স্থান নির্বাচনে নৌযান চলাচল, নৌপথের নিরাপত্তা, জোয়ার-ভাটা, বন্যা এবং জরুরি চলাচলের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। সব নৌকা একই স্থানে রাখা সম্ভব না হলে নির্ধারিত কয়েকটি নিরাপদ ঘাটে ভাগ করে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
নৌকার তালিকা তৈরি, ঘাটের নিরাপত্তা এবং নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির অধীনে বণ্টন করা যেতে পারে। এতে নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার সুযোগ কমানোর পাশাপাশি সরকারি নজরদারির ওপর নির্ভরশীলতাও কমতে পারে।
৫. প্রকৃত জেলে শনাক্তকরণ ও পারিবারিক সামাজিক সুরক্ষা
ইলিশ সংরক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো প্রকৃত মৎস্যজীবীদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা। নিবন্ধিত জেলেদের তালিকা নিয়মিত যাচাই করে দেখতে হবে, কারা বাস্তবে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত, কারা নিষেধাজ্ঞার কারণে আয় হারাচ্ছেন এবং কারা সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য।
এ জন্য মৎস্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, উপজেলা প্রশাসন ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন বা অ্যাসেসমেন্ট পরিচালনা করা প্রয়োজন। তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত জেলেরা বাদ না পড়েন এবং অযোগ্য কেউ সুবিধা গ্রহণ করতে না পারেন।
নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিশুদের শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি সহায়তা সময়মতো ও যথাযথ ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা গেলে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার সক্ষমতা বাড়বে।
৬. বিকল্প আয়, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা
নিষেধাজ্ঞার সময় শুধু আর্থিক সহায়তা প্রদান নয়, বরং জেলেদের বিকল্প আয় সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। স্থানীয় এনজিও, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার যৌথভাবে এ সময়ে উপযোগী প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
প্রশিক্ষণের বিষয় হিসেবে হাঁস-মুরগি পালন, গবাদিপশু পালন, সবজি চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, জাল মেরামত, নৌযান মেরামত, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং স্থানীয় বাজারে চাহিদাসম্পন্ন অন্যান্য কাজ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তবে প্রশিক্ষণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে জেলেদের আগ্রহ, দক্ষতা, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং স্থানীয় বাজারের বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে।
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি আয়মূলক কাজ, উপযুক্ত আর্থিক সহায়তা এবং বাজারসংযোগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। নিষেধাজ্ঞাকালে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যে ভাতা বা খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়, তা যথাসময়ে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন ও সামর্থ্য বিবেচনায় বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা গেলে জেলেরা মাছ ধরা থেকে বিরত থেকেও তাঁদের পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে পারবেন।
৭. স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে সামাজিক প্রতিরোধ ও আইন প্রয়োগে সহযোগিতা
নিষেধাজ্ঞাকালে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অবৈধভাবে নদীতে মাছ ধরতে গেলে সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রথমে সচেতনতা সৃষ্টি, তথ্য আদান-প্রদান এবং সামাজিকভাবে প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে পারে। কমিটির সদস্যরা নদীতে সন্দেহজনক কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন।
তবে কাউকে জোরপূর্বক আটক, শাস্তি প্রদান, জাল বা নৌকা বাজেয়াপ্ত কিংবা অন্য কোনো বলপ্রয়োগমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা কমিটির থাকবে না, যদি না প্রচলিত আইন অনুযায়ী সেই ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অর্পিত থাকে। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষই পালন করবে।
এভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নজরদারি, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতাকে একত্র করা গেলে অবৈধ মাছ ধরার বিরুদ্ধে আরও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
সরকারি ব্যয় কমিয়ে কার্যকারিতা বাড়ানোর সুযোগ
সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা হলো, এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে সব দায়িত্ব কেবল সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল থাকে না।
অবশ্য সহ-ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার জন্যও প্রশিক্ষণ, সমন্বয়, নিরাপদ সংরক্ষণব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষায় অর্থের প্রয়োজন হবে। তাই এ পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ ব্যয়হীন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিদ্যমান ব্যয়ের সঙ্গে নতুন ব্যবস্থার সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনা করে দেখতে হবে, কোন পদ্ধতিতে কম খরচে অধিক কার্যকর ফল পাওয়া যায়।
এ জন্য কয়েকটি নদী বা উপযুক্ত এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে সহ-ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা পালনের হার, অবৈধ মাছ ধরা, ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য, জেলেদের আয়, সরকারি ব্যয় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সন্তুষ্টি পরিমাপ করতে হবে। ফলাফল স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করে সফল মডেল পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকায় সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
ইলিশ রক্ষায় প্রয়োজন রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত অঙ্গীকার
ইলিশ সংরক্ষণ শুধু মৎস্য অধিদপ্তর বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্র, মৎস্যজীবী, স্থানীয় সরকার, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত দায়িত্ব। শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়; নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার উপযোগী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন জেলে যখন নদীতে মাছ ধরতে যান, তখন তিনি শুধু নিজের জীবিকা নির্বাহ করেন না; দেশের খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনীতিতেও অবদান রাখেন। তাই তাঁর জীবিকা সুরক্ষিত রেখে ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় নীতি।
আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে জেলেরা নিষেধাজ্ঞাকে শাস্তি হিসেবে দেখবেন না; বরং ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং নিজেদের জীবিকা টিকিয়ে রাখার যৌথ উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করবেন। যে ব্যবস্থায় সরকারি ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে, অবৈধ মাছ ধরা কমবে এবং ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন সুরক্ষিত থাকবে।
অতএব, ইলিশ সংরক্ষণে প্রচলিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে জেলেকেন্দ্রিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক সহ–ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। নিষেধাজ্ঞা থাকবে, আইনও কার্যকর হবে; তবে তার সঙ্গে যুক্ত হবে জেলেদের অংশীদারত্ব, বিকল্প জীবিকা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জবাবদিহিমূলক অংশগ্রহণ। ইলিশ রক্ষার টেকসই পথ হতে পারে এভাবেই—নদী বাঁচবে, ইলিশ বাঁচবে, জেলেদের জীবনও সুরক্ষিত থাকবে।
শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, জেলেদের নিরাপদ ও টেকসই বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করুন
জেলেদের চাল দেয়া একমাত্র সমাধান নয়
লেখক: মোঃ জহিরুল ইসলাম (রাজু)
শিল্পী, গবেষক, আইনজীবী।। সাবেক প্রকল্প সমন্বয়কারী-ইকোফিশ
https://www.youtube.com/watch?v=kmcBhMz6MWc&list=RDMMkmcBhMz6MWc&start_radio=1


























































































