আমৃত্য ভালোবাসি তোকে
৭ বছর পর বাড়ি ফিরছে খান বংশের বড় ছেলে সাজ্জাদুল খান ইমন। বাড়ি ফিরছে বললে ভুল হবে বিদেশ থেকে দেশে ফিরছে আবির। এই ৭ বছরে খান বাড়িতে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা যার সাথে স্ব শরীরে যুক্ত নেই আবির, তবে আত্মিকভাবে প্রতিটা ঘটনায় জরিয়ে আছে সে৷
আবিরের বাবা চাচা তিনজন, আবিরের বাবা সবার বড় নাম,’আলী আহমদ খান’
তানভীরের বাবা মেজো নাম, ‘মোজাম্মেল খান’
ছোট চাচ্চুর নাম ‘ ইকবাল খান’
আবির তার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে৷
মেজো চাচা মানে মোজাম্মেল খানের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলের নাম তানভির খান মেয়ের নাম মাহদিব মেঘ
ছোট চাচার এক মেয়ে এক ছেলে মীম আর আদি। এখনো তারা এলাকার যৌথ পরিবারগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বাড়ির সকলের প্রাণ যেনো এক সুতোয় বাঁধা ।
৫ ভাইবোনের মধ্যে আবির সকলের চোখের মনি। আবিরের জন্মের পর তার বাবা মা দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ায় চিন্তায় করেন নি। HSC পর্যন্ত সে বাড়িতেই ছিল সবার নয়নের মনি৷ আবিরের চাঞ্চল্যে মেতে থাকতো খান বাড়ি৷ আচমকা যেনো পরিবেশটা পাল্টে গিয়েছিল। ১৮ বছর বয়সে আবিরের হঠাৎ করে স্কলারশিপে বিদেশে পড়তে যাওয়া, বাড়ির সকলের সাথে শারীরিক ভাবে যেমন দূরত্ব বেড়েছিল৷ তেমনি দূরত্ব বেড়েছে মানসিকতার৷
৭ বছর পূর্বের আবিরের সাথে বর্তমান আবিরের আকাশ পাতাল পার্থক্য। দেখেও যেনো চেনার উপায় নেই। ৬ ফুট লম্বা ছেলেটা গায়ের রঙ শ্যামলা, গাল ভর্তি ছাপ দাঁড়ি, চুলের স্টাইল কোনো নায়কের থেকে কম না তার ফ্যাশন আর লুকে যেকোনো মেয়ে এক দেখাতেই প্রেমে পরতে বাধ্য৷
প্লেনে বসে আবির অবলীলায় ভেবে যাচ্ছে অতীতে ফেলে আসা স্মৃতি গুলো।
সেই চাঞ্চল্যকর মুহুর্তগুলো এখন শুধুই স্মৃতির পাতায়। মা কে রেখে এসেছিল সেই যৌবনের প্রথম দিকে যখন তার বয়স ছিল ১৮ ৷ সেই সময়ে মা ই ছিল তার একমাত্র বন্ধু৷ আজ সে ২৪ বছরের যুবক। এতগুলো বছরের একটা দিনও বাদ যায় নি যে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলে নি সে। বাড়ির সকলের সাথেই মোটামুটি কথা বলার চেষ্টা করেছে৷ ছোটবেলার স্মৃতি গুলো ভাবতে ভাবতে নিজের দেশে পৌছে গিয়েছে আবির৷
এয়ারপোর্টে আবিরের বাবা ‘আলী আহমদ খান’ আর তানভীর দাঁড়িয়ে আছে। তানভীর সম্পর্কে তার চাচাতো ভাই আর বয়সে ২ বছরের ছোট কিন্তু দুজন দুজনের বেস্ট ফ্রেন্ড আর কলিজার বন্ধু । তানভীর আবিরকে দেখেই দৌড়ে এসে জরিয়ে ধরলো। এই ৭ বছরে একবারের জন্য ও বাড়ি ফেরেনি আবির। তবে প্রতিনিয়ত কথা হয় আবির তানভীরের।
আবির তার আব্বুকে সালাম করে জরিয়ে ধরে। তারপর বাড়ি ফিরে তিনজন। বাড়িতে যেনো হৈহৈ রৈরৈ ব্যাপার । হবে নাই বা কেন
বাড়ির বড় ছেলে এত বছর পর বাড়ি ফিরছে। রান্নাঘরে বাহারি রকমের রান্নার ধুম পরেছেন মা চাচিদের। হঠাৎ দরজায় আবিরকে দেখে সবার মধ্যে হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। আবিরের আম্মু দৌড়ে এসে জরিয়ে ধরলেন ছেলেকে। আবেগাপ্লুত হয়ে মাকে জরিয়ে ধরলো আবির।
মমতাময়ী মাকে সেই ৭ বছর আগে ছুঁয়েছিল আজ এত বছর পর মায়ের ছোঁয়া পেলো আবির। মা চাচিদের সালাম করলো। সোফায় বসিয়ে ছেলেকে একের পর এক শরবত নাস্তা দিতে ব্যস্ত সবাই। এরিমধ্যে উদয় হলো মীম আর আদির৷ মিমের বয়স ১৪ বছর। তার ছোটভাই আদির বয়স মাত্র ১০ বছর। আদিই এই বাড়ির সবচেয়ে ছোট । আবির যখন দেশ ছেড়ে ছিল তখন আদির ৩ বছর হয়েছে মাত্র৷ ভিডিও কলে দেখতে দেখতে ভাইকে সে একটু একটু চিনে৷ দৌড়ে এসে জরিয়ে ধরেছে ভাই কে। আবিরও জরিয়ে ধরেছে আদিকে। মীম ও আবিরের পাশে বসেছে৷ খোঁশগল্প করছে সবাই মিলে৷
আদি জিজ্ঞেস করছে
‘ভাইয়া, আমার জন্য কি এনেছো? ‘
আবির যেইনা উঠতে যাবে মা চাচিরা উঠতে দিচ্ছে না। আগে শরবত খাবি তারপর উঠবি। আবির তানভিরের দিকে তাকিয়ে বললো
‘ঐ লাগেজ টা নিয়ে আয় তো ‘
তানভির একটা লাগেজ টান দিতে যাবে আবির আচমকা বসা থেকে দাঁড়িয়ে
‘ঐটা তে ছুঁবি না ‘
তানভির সহ বাড়ির সকলেই যেনো অবাক হয়ে গেলো।
আবির আবার ঠান্ডা মাথায় বললো পাশের লাগেজ টা নিয়ে আয়….
তানভিরও তার কথা মতো লাগেজ নিয়ে আসলো৷ লাগেজ খুলে যে যার মতো জিনিস বের করছে আর জিজ্ঞেস করছে এটা কার,ঐটা কার। আবির শরবত খেতে খেতে উত্তর করছে।
আদির জন্য বিদেশি দামি দামি খেলনা, মীমের জন্য ড্রেস,কসমেটিকস বক্স, মা কাকিদের জন্য অনেক গিফট। তানভীরের জন্য মোবাইল, একটা ল্যাপটপ অন্যান্য গিফট৷ আলাদা আরেকটা ল্যাপটপ আছে।
মীম জিজ্ঞেস করছে, ‘ভাইয়া এই ল্যাপটপ টা কি তোমার? ‘
আবির উত্তর দেয়, ‘না এটা মেঘের’
মেঘের মা ‘ হালিমা খান’ জিজ্ঞেস করলেন মেঘের ল্যাপটপ কি দরকার বাবা?
আবিরঃ ওর তো HSC পরীক্ষা শেষ৷ সামনে Admission Test আছে। অনেক কিছু জানার বা পড়ার দরকার আছে৷ মোবাইল দেখে পড়ার থেকে ল্যাপটপে সুবিধা হবে তাই নিয়ে আসলাম।
মীমঃ আমার জন্যও নিয়ে আসতা একটা..!!
আবির অবলীলায় হেসে উত্তর দেয়,
‘তোর ১৮ বছর বয়স হলে তোকেও কিনে দিব। চিন্তা করিস না। ‘
মীম খুশিতে গদগদ হয়ে বলে,
‘ধন্যবাদ, ভাইয়া।’
বাড়ির হৈচৈ শুনে ঘর থেকে বের হলেন ছোট চাচা ইকবাল খান। আবির চাচ্চুকে দেখেই সালাম করতে যায়, চাচ্চু বাঁধা দিয়ে জরিয়ে ধরেন ভাতিজা কে। ইকবাল খান বাড়ির সকলের দিকে এক পলক তাকিয়ে নরম স্বরে বলেন,
‘এতদিনে এই বাড়িটা পরিপূর্ণ হলো৷’
ইকবাল খানের জন্য আনা উপহার আবির নিজের হাতেই চাচ্চুকে দিলো। বাকিদের জিনিস গুলোও একটা একটা করে দিলো আবির। মেজো চাচ্চু মানে মোজাম্মেল খান বাসায় নেই। তাই ওনার জন্য আনা গিফট যত্ন করে রেখে দিলো আবির৷ লাগেজে পরে আছে একটা বক্স যেটা রেপিং পেপারে মুড়ানো আর একটা শপিং ব্যাগ।
আদি জিজ্ঞেস করল,
‘ভাইয়া ঐটা কার?’
আবির ল্যাপটপের পাশে বক্স আর শপিং ব্যাগ টা রেখে উত্তর করল,
‘এগুলো মেঘকে দিয়ে দিও। আমি রুমে যাচ্ছি। ‘
ইকবাল খান এক পলক সবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘মেঘ কোথায়?’
হালিমা খান উত্তর দিলেন,
‘ও তো কোচিং এ গেছে, এতক্ষণে তো চলে আসার কথা। ‘
আবির বাকি ২টা লাগেজ নিয়ে উঠতে চাচ্ছিলো, হঠাৎ পিছন ফিরে মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
‘আমি কোন রুমে থাকবো?’
ছেলের এমন প্রশ্নের জন্য মা ‘মালিহা খান’ হতভম্ব হয়ে পরলেন,তৎক্ষনাৎ স্বাভাবিক হয়ে উত্তর করলেন,
‘তোর রুম তোরই আছে ৷ আজ সকালেই পরিষ্কার করা হয়েছে৷’
আবির কোনো কথা না বলে দুই লাগেজ নিয়ে উঠতে গেলে তানভির এগিয়ে আসে৷ আমায় দাও আমি নিয়ে যাচ্ছি। আবির একটা লাগেজ তানভিরের দিকে এগিয়ে দেয়৷ নিজে আরেকটা লাগেজ সযত্নে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে৷
ততক্ষণে দরজায় এসে উপস্থিত হয় এই বাড়ির বড় মেয়ে মাহদিবা খান মেঘ
মীম মেঘকে দেখে দৌড়ে এসে বলে,
‘আপু আপু, আবির ভাইয়া এসেছে’
মেঘ সিঁড়ি দিকে তাকায়, লম্বা স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ দেহি একজন হাতে লাগেজ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। শুধু পিছন টা দেখা যাচ্ছে। মেঘ ভিতরে ঢুকে সবার হাতে গিফট দেখে এদিক সেদিক তাকায়। ততক্ষণে আবির নিজের রুমে চলে গিয়েছে। মেঘের মা ‘হালিমা খান’ মেয়ের দিকে এগিয়ে এসে বলেন,
‘ তোর জন্য গিফট এনেছে।’
মেঘ তাকিয়ে বলে,
‘কি গিফট?’
হালিমা খান চোখে ইশারা দিলেন,সোফায় রাখা ল্যাপটপের দিকে চোখ পরে মেঘের। ছুটে যায় ল্যাপটপের কাছে। জিজ্ঞেস করে,
‘এটা কি আমার?’
মীম বলে,
‘হ্যাঁ আপু এটা তোমার, বক্সটা আর শপিং ব্যাগটাও তোমার ।’
ল্যাপটপ টা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে মেঘ, যেন আকাশকুসুম কিছু পেয়ে গেছে৷ তারপর শপিং ব্যাগ টা একটু খুলে দেখল ২ টা ড্রেস মনে হচ্ছে৷ সে ল্যাপটপ আর বক্স গুলো নিয়ে রুমের দিকে চলে যাচ্ছে।
চলবে………
এতবছর পর নিজের রুমটা আশ্চর্যান্বিত নয়নে দেখছে আবির। সেই পরিচিত ঘ্রাণ যেখানে সে নিজের জীবনের ১২ টা বছর কাটিয়েছিলো। যেই রুমটা ছিল তার একান্ত ব্যক্তিগত, আজও তাই আছে। একটা জিনিসও এদিক সেদিক হতে দেন নি আবিরের মা ‘মালিহা খান’। এমনকি রুমে বছরের পর বছর তালা দিয়ে রেখেছেন তিনি৷ যখন ই ছেলের কথা মনে হতো ছেলের রুমে এসে নিরবে কেঁদে যেতেন যেনো কেউ বুঝতে না পারে৷
আবির রুমে ঢুকে লাগেজ খুলে নিজের পরনের টিশার্ট হাতে শাওয়ার নিতে চলে যায়। শাওয়ার শেষে বের হলেন একটা কফি কালার টিশার্ট আর একটা টাওজার পরে হাতে টাওয়েল নিয়ে মাথার চুল মুছতে মুছতে। খাটে বসে আছে তানভির। লাগেজ নিয়ে এসে রুমেই বসে আছে সে৷
তানভির কে দেখে আবির জিজ্ঞেস করছে,
‘কি হলো, কিছু বলবি?’
তানভির মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করছে
‘আচ্ছা ভাইয়া ঐ লাগেজটা ধরতে দিলে না কেন? কি আছে ঐটাতে?’
আবিরের চক্ষুদ্বয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট, চোয়াল শক্ত করে উত্তর দিল,
‘ঐটাতে আমার পার্সোনাল কিছু জিনিস আছে৷’
তানভির হাসতে হাসতে উত্তর দেই,
‘ সেই পার্সোনাল জিনিস গুলো দেখতে চাচ্ছে আমার অবুঝ মন, কি করবো বলো?’
স্বভাবসুলভ গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলো আবির
‘কাউকে দেখানোর জিনিস আশা করি পার্সোনাল হবে না?’
তানভির ভাইয়ের আপত্তিস্বর বুঝতে পেরে এই বিষয়ে আর কিছু বলে নি৷
শুধু জিজ্ঞেস করে,
“বিকালে কি বের হবে?”
আবির উপর নিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানায়৷
তানভির কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বিদায় নেয় রুম থেকে৷
আবির খাটের এক কোণায় বসে মোবাইল হাতে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চেক করতে ব্যস্ত হয়ে পরে।
★★★
মেঘ নিজের রুমে ঢুকে শপিং ব্যাগ খুলে ৩ টা ড্রেস বের করলো। ৩ টা জামা ই অসাধারণ সুন্দর। ২ টা গাউন ড্রেস আর একটা গর্জিয়াছ কাজের থ্রিপিস। ল্যাপটপ টাও খুলে দেখে, তার প্রয়োজনীয় সকল এপ ব্রাউজার অলরেডি ল্যাপটপে সেট করা আছে।
মেঘের দৃষ্টি যায় রেপিং পেপারে মোড়ানো বক্সের দিকে। রেপিং পেপার খুলতেই চোখে পরে ৩ টা উপন্যাসের বই যেগুলোর উপরে ছোট একটা চিরকুটে লিখা ‘এডমিশনের পরে পড়বি’৷ তারসাথে একটা ছোট বক্স যেখানে একবক্স রঙিন পাথর। মেঘের এই পাথর গুলো ছোটবেলায় খুব পছন্দ ছিল। তার সাথে একটা iPhone 13 pro max মোবাইলের বক্স। ফোন দেখে মেঘের চক্ষু চরখগাছ। অনেকদিন যাবৎ মনের কোণে সুপ্ত ইচ্ছে ছিল একটা আইফোন কেনার৷ কিন্তু কাউকে বলার মতো সাহস হয় নি তার। এগুলো দেখে খুশিতে গদগদ হয়ে পরেছে মেঘ৷
ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়াকালীন মেঘের যখন কলেজ, প্রাইভেট, কোচিং সব মিলিয়ে ব্যস্ততায় দিন কাটছিলো, তখন তানভির তার পুরোনো একটা ফোন দিয়েছিল মেঘকে। সীমটাও ছিল তানভিরের, বাসার মানুষের বাহিরে শুধু ৩-৪ জন বান্ধবীর নাম্বার ছিল সেই ফোনে। এমনকি স্যারদের কেও নাম্বার দিতে নি*ষেধ করেছিল ক*ড়া ভাষায়।। তানভির বরাবর ই বোনের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস৷ ভাইরা বোনকে শা*সন করে ঠিক আছে কিন্তু তানভীর মেঘকে একটু বেশিই শা*সনে রেখেছে এত বছর৷ HSC পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে তানভিরকে খুব সা*হস করে বলেছিলো,
‘ভাইয়া পরীক্ষা শেষ করে আমায় একটা নতুন ফোন কিনে দিবা?’
অ*গ্নিদৃ*ষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তানভির, যেনো মস্ত বড়ো অ*ন্যায় করে ফেলেছে। তারপর মেঘ নতুন ফোনের আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছিল। আজ সে না চাইতেই আইফোন পেয়ে গেছে, ল্যাপটপ পেয়ে গেছে৷ এ যেনো মেঘ না চাইতেই জল৷ আনমনে ভাবছে, মনে হয় তানভির ভাইয়া বলেছে ফোন আনতে আর ল্যাপটপ আনতে নাহলে ওনি কিভাবে জানবে আমার ফোন নেই।
এদিকে ১ ঘন্টা যাবৎ ফোনে মনোযোগ দিয়ে কি যেনো কাজ করছে আবির। হঠাৎ আদি দৌড়ে এসে দাঁড়ায় দরজায়,
আদিঃ ভাইয়া তোমায় খেতে ডাকছে।
আবিরঃ যা, আসছি।
১০ মিনিটের মধ্যে সাদা শার্ট পরে রেডি হয়ে নিচে নামলো আবির।
অসময়ে তেমন কেউ নেই নিচে৷ বিকাল ৪ টা বাজে৷ সবার খাওয়া শেষ অনেক আগেই। মালিহা খান বসে ছিলেন ছেলের জন্য। ছেলের ফিটফাট হয়ে রেডি হওয়া দেখে মালিহা খান জিজ্ঞেস করছেন,
‘কোথাও যাবি?’
আবির বলল,
‘ হ্যাঁ,একটু কাজ আছে!’
আবির চুপচাপ খাবার খাচ্ছে। ছোটবেলা যা যা সে পছন্দ করতো সব রান্না হয়েছে আজ। সব খেতে পারে নি যতটুকু সম্ভব খেয়ে উঠে পরেছে। এরমধ্যে তানভির হাজির হয়েছে। শান্ত কন্ঠে বলল,
‘ভাইয়া রেডি আমি, এখন যাবে নাকি লেইট হবে?’
‘এখনই বের হবো’
মালিহা খান রান্নাঘর থেকে ডেকে বলছেন,
‘গাড়ি নিয়ে বের হবি না? চাবি নিয়ে যা..’
‘গাড়ি লাগবে না আম্মু’
দুই ভাই বের হয়ে গেল।
★
যৌথ পরিবারগুলোর সবচেয়ে আনন্দময় সময় হলো সন্ধ্যাবেলা। বাড়ির সকলে মিলে হৈচৈ করে বিকালের নাস্তা খাওয়া,একটু টিভি দেখা, খেলাধুলা করা,আড্ডা দেয়া৷ সমস্যা শুধু বড় ভাই। তানভির সবসময় মেঘকে চোখে চোখে রাখে৷ কি করছে,কি না করছে, কখন খাচ্ছে, পড়াশোনা করছে কি না এসবকিছু দেখায় যেনো তার একমাত্র কাজ। কিন্তু মীম আর আদিকে কোনোদিন একটা ধ*মক পর্যন্ত দেয় নি তানভির। এ কেমন দুমুখো ব্যবহার। তানভির যতক্ষণ বাসার বাহিরে থাকে মেঘ ততক্ষণ মুক্ত,স্বাধীন । তানভির বাসায় না থাকায় তিনভাই বোন মিলে ছোটাছুটি করছে। মেঘ যা বলে ছোট ২ টা তাই করে। মেঘ আর আবিরের এখনও দেখা হয় নি। মেঘ কোচিং থেকে এসে রুমে যে ঢুকেছিল। তার গিফট নিয়ে ব্যস্ততার কারণে সবে মাত্র রুম থেকে নিচে এসেছে। অন্যদিকে আবির বাসা থেকে চলে গেছে আরও ২ ঘন্টা আগে৷ মেঘ,মীম আর আদির ছোটাছুটি শেষ হয় বড়ো আব্বু ‘জনাব আলী আহমদ খানের’ বাসায় প্রবেশ দেখে৷ আলী আহমদ খান বাসায় ঢুকতে ঢুকতে নিজের স্ত্রী মালিহা খানকে জিজ্ঞেস করলেন,
‘আবির কোথায়?’
মালিহা খান উত্তরে বললেন,
‘ও তো তানভিরকে নিয়ে বের হলো বললো কি কাজ আছে’
আলী আহমদ খান সোফায় বসতে বসতে মেঘের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
‘পড়াশোনার কি অবস্থা, আম্মু?’
মেঘ শান্তস্বরে উত্তর করল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো বড় আব্বু। তবে.. ”
‘তবে কি?’
প্রশ্ন করলেন আলী আহমদ খান
‘আমার ফিজিক্স আর ম্যাথে একটু সমস্যা, কোচিং এর সাথে কুলাতে পারছি না। প্রাইভেটগুলোতেও অনেকটা এগিয়ে গেছে।’
আলী আহমদ খান বললেন,
‘ ঠিক আছে তোমার জন্য প্রাইভেট টিউটর নিয়ে আসবো। কাল বা পরশুর মধ্যেই ম্যানেজ করতেছি , তুমি চিন্তা করো না মন দিয়ে পড়াশোনা করো আম্মু৷ তোমার ভাই তানভির তো আমার কোনো কথা শুনে না আর না শুনে তোমার আব্বুর কথা। কোথা থেকে মাথায় ভূত চেপেছে রাজনীতি করবে৷ পড়াশোনায় গুরুত্ব না দিয়ে রাজনীতিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। তুমি পড়াশোনা করো ভালো করে, মেডিকেলে অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেনো চান্স টা হয়ে যায়।’
‘জ্বি বড়ো আব্বু, চেষ্টা করবো।’
‘খেয়েছো কিছু তোমরা?’
আলী আহমদ খান জিজ্ঞেস করলেন
এবার উত্তর টা মীম দিল,
‘হ্যাঁ বড় আব্বু খেয়েছি আমরা’
‘ঠিক আছে, এখন রুমে গিয়ে পড়তে বসো।’
৩ ভাই বোন কোনো কথা না বলে তিনদিকে যার যার রুমে চলে যাচ্ছে।
★★★★
রাত ৯ টায় বাড়িতে ঢুকে আবির আর তানভির। খাবার টেবিলে খেতে বসেছেন ৩ ভাই আর আদি। মীম, মেঘ কেউ নেই। রান্নাঘরে তিন জা খাবার রেডি করছেন। বিকেলে আবির সাদা শার্ট পরে বেরিয়েছিল। সাদা শার্টের ২-৩ জায়গায় একটু একটু রক্ত লেগে আছে আর আবিরের হাতে ৩ টা ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজ লাগানো, নজরে পরে ইকবাল খানের।
‘কিরে আবির,তোর হাতে কি হয়েছে? শার্টেই বা দাগ কিসের?’
এই কথা শুনে ছুটে আসেন মালিহা খান,
‘কি হয়েছে আবির?’
বুকের ভেতর ছ্যাত করে উঠেছে, একমাত্র ছেলের শরীরে একটা আচড় ও মা সহ্য করতে পারেন না।
আবিরঃ তেমন কিছু না, হাতে একটু লেগেছিল । ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা করো না।
আর কথা না বাড়িয়ে সিঁড়ির কাছে চলে যায় আবির।
আলী আহমদ খান ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘খাবে না?’
‘না আব্বু। বিকেলে খেয়েছি খিদে নেই। ‘
এই বলে রুমের দিকে চলে যায় আবির। আবিরের কন্ঠ শুনে মেঘ রুম থেকে বের হয় তাড়াতাড়ি, এতগুলো গিফট দিলো অবশ্যই ধন্যবাদ জানানো উচিত, ৭ বছরে ভাইয়ের মুখটাও দেখে নি সে৷ কিন্তু মেঘ রুম থেকে বের হতে হতে আবির রুমে ঢুকে পরেছে। মেঘের চোখ মুখে নিরবতা, নিচে গিয়ে সবার সাথে খেতে বসে, তানভিরও খেতে বসেছে হাতমুখ ধুয়ে।
ইকবাল খান তানভিরের উদ্দেশ্যে বলে,
‘তুই তো ছিলি আবিরের সাথে, কি হয়েছে বল?’
তানভির: চাচ্চু আমি তো ভাইয়ার সাথে বের হয়েছিলাম কিন্তু পরে আমি পার্টি অফিসে চলে গিয়েছিলাম৷ তাই সঠিক জানি না৷
মেঘ যেনো কিছুই বুঝতে পারছে না। বাড়িতে এসেছে ৭-৮ ঘন্টা হয়ে গেছে মানুষটার, অথচ সে এখনও দেখেই নি তাকে তারমধ্যে আবার কি অঘটন ঘটিয়েও ফেলেছে। সে শুধু চাচ্চু আর ভাইয়ার মুখের দিকে তাকাচ্ছে বার বার৷ আহমদ আলী খান গম্ভীর স্বরে তানভিরকে বললেন,
‘সে তো তোমার ভাই কম বন্ধু বেশি৷ তাকে বলে দিও কোনো প্রকার মা*রপি*ট আর রা*জ নী*তিতে যেনো না জরায়। আর এটাও বলে দিও তাকে, তার বয়সটা কিন্তু আমি পার করে এসেছি৷ তাকে দেশে এনেছি মা*রপি*ট করার জন্য না, আমাদের ব্যবসার হাল ধরার জন্য । ‘
তানভির: আসলে বড় আব্বু সামান্য হাত কেটেছে ভাইয়ার৷
আলী আহমদ খান: থাক আমায় কিছু বুঝাতে হবে না। কোনটা মা*রপি*টের কা*টা আর কোনটা কেটে যাওয়া আমি তা বুঝি৷ তুমি তো নিজের রাস্তা বেছেই নিয়েছো অন্তত তাকে বুঝাও এসবে যেনো না জরায়
তানভিরঃ জি, বড়ো আব্বু৷
মেঘ আচমকা প্রশ্ন করে বসে,
‘কি হয়েছে? ‘
তানভির মেঘের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলে,
‘তুই চুপচাপ খা’
ইকবাল খান বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘আবির কেনো মা*রামা*রি করবে,এতবছর বাহিরে ছিল ছেলেটা, এখানে ওর কে এমন শ*ত্রু আছে?’
বাড়ির সবার মধ্যে নিরবতা, কেউ কোনো কথা বলছে না।
মেঘ মনে মনে ভাবছে,
”আবির ভাইয়া মা*র*পি*ট করেছে? কিন্তু কেনো? এত বছর ভাবতাম আমার ভাই ই পঁ*চা, রা*জনী*তি করে, আমায় শা*সন করে।৷ কিন্তু আবির ভাই তো দেখা যাচ্ছে পুরাই হি**ট*লা*র’।
চলবে…….
০৩)
কোন এক আশঙ্কায় আবিরের মাথায় চিনচিন ব্য*থা অনুভব হয়, ভী*তিতে রু*দ্ধ হয় তার শ্বাস। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আনমনে কি যেনো ভেবে যাচ্ছে আবির। দূরে ঐ চাঁদটার দিকে তাকিয়ে আছে চ*ক্ষুযূ*গল এক মুহুর্তের জন্যও সরছে না, পল্লব ও পড়ছে না একটিবার, তার দুর্বো*ধ্য দৃষ্টি।
হঠাৎ কারো অস্তি*ত্ব বুঝতে পেরে সাবলীল ভঙ্গিতে নড়েচড়ে দাঁড়ায় দৃষ্টি সরিয়ে নেয় চাঁদ থেকে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেয় মানুষটাকে তারপর, ধীরস্থির কন্ঠে জানতে চাই,
‘কিছু হয়েছে?’
তানভির সরলমনে বলে,
‘বড় আব্বু বুঝতে পেরে গেছে তুমি মা*রপি*ট করেছো, তাই তোমাকে সাব*ধান করতে বলেছে যেনো মা*রপি*ট আর রা*জনী*তিতে না জরাও।’
‘আরকিছু?’ অবহেলায় প্রশ্ন টা করলো আবির
‘না, তেমন কিছু না ব্যবসার হাল ধরতে বললো৷ ‘ তানভির উত্তর দিলো।
আবির: আচ্ছা ঠিক আছে৷ আর কিছু বলবি?
তানভির: ভাইয়া, মাথা ঠা*ন্ডা করো তুমি। বাদ দাও প্লিজ৷ আমি তোমাকে শুধু জানিয়েছিলাম বিষয়টা। তুমি যে এভাবে দেশে চলে আসবে আর এইভাবে ঝামেলা হবে এটা আমি ভাবতে পারি নি৷ বু*ঝতে পারলে আমি আ*গেই ব্যা*পার টা স*লভ করে ফেলতাম৷
আবির: তুই আমায় বাদ দিতে বলছিস? বাহ।
তানভির: আমি ঐভাবে কিছু বলি নি ভাইয়া। যা হবার তো হয়েছে৷৷ তুমি যা করেছো এরপর আশা করি আর কিছু হবে না। তাই বলছিলাম ঐসব চি*ন্তা বাদ দিয়ে একটু রেস্ট নাও। অনেকটা জা*র্নি করে এসেছো।
আবির: আচ্ছা তুই এখন যা, এরপর থেকে আমার ব্যাপারে তোকে যেনো কেউ কিছু না বলে, এটা সবাইকে বলে দিস। এতবছর বাহিরে ছিলাম। এখন তো আমি বাড়িতে আছি, যার যা কথা সব যেনো আমায় বলে সরাসরি। আর আগামীকাল ১২ টার আগে কেউ যেনো ডাকতে না আসে আমায়।
তানভির: আচ্ছা৷ আসছি আমি৷
এতক্ষণে মেঘে ঢেকে গেছে চাঁদ। অসীম দূরত্বে তাকিয়ে কি যেনো ভাবছে ছেলেটা৷ তারপর রুমে ঢুকে দরজা আটকে ব্যাগ থেকে একটা সিগারেট বের করে, বারান্দায় বসে সি*গা*রেট জ্বা*লিয়ে ঠোঁ*টে ধরে…
দৃষ্টি পরে দূরে গাছের পাতার ফাঁকে ল্যামপোস্টের ক্ষুদ্র আলোর দিকে, তারনিচে ২-৩ টা কুকুর আপন মনে চিল্লাচিল্লি করছে।
সি*গারে*ট খাওয়াটা আবিরের নি*ত্যদিনের অভ্যাস না, যখন সে খুব রা*গান্বি*ত বা চি*ন্তিত থাকে, বা যখন নিজেকে ক*ন্ট্রোল করার সব শ*ক্তি হারিয়ে ফেলে তখন সিগারেটের ধোঁ*য়ার মধ্যে নিজের ক*ষ্ট, রা*গ,চি*ন্তা আর অ*ভিমান গুলোকে উড়িয়ে দেয়।
সি*গারে*টে কয়েকটা টান দিয়ে সি*গা*রেট টা ফেলে দেয়। তারপর টানটান হয়ে শুয়ে পরলো নিজের বিছানায়। মাথার নিচে দুহাত রেখে চোখ বুজলো।
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
মেঘ খাবার খেয়ে রুমে এসে ২-৩ ঘন্টা টানা পড়াশোনা করলো।। HSC পরীক্ষা শেষ হলো এক মাস ও হয় নি কিন্তু পড়াশোনা যেনো ৩ গুণ বেড়ে গেছে। এডমিশন একটা মস্তবড় যুদ্ধ যার একমাত্র অস্ত্র হলো পড়াশোনা তার সাথে অঙ্গাঅঙ্গী ভাবে জরিয়ে আছে ভাগ্য। HSC র রেজাল্ট কবে দিবে ঠিক নেই, পাশ করবে কিনা তাও জানা নেই৷ কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি আগেভাগেই নিতে হচ্ছে। বয়সের তুলনায় মেয়েটা পড়াশোনায় একটু বেশিই এগিয়ে গেছে। ১৮ বছর বয়সে পা দিলো সবেমাত্র ২ মাস হয়েছে। তারমধ্যে HSC পরীক্ষা শেষ । কয়েকমাস পরে সে স্নাতক শিক্ষার্থী হতে চলেছে ভাবতেই কেমন যেনো নিজেকে বড় বড় মনে হয় মেঘের।
পড়াশোনা শেষ করে নিজের বিছানায় শুয়েছে হাতে তার নতুন মোবাইল। কিন্তু করবে কি সে, না আছে ফেসবুক আর না আছে অন্য কোনো একাউন্ট। ইউ*টিউবে ঢুকে কয়েকটা ভিডিও দেখে মোবাইল রেখে দেয়।
শুয়ে ভাবতে লাগে আবির ভাইয়াকে ধন্যবাদ জানানো দরকার কিন্তু সে তো ভ*য়ে দাঁড়াতেই পারবে না আবিরের সামনে.. পু*রোনো স্মৃতিগুলো ভাবতে থাকে…
মেঘ সবেমাত্র ৫ম শ্রেণিতে উঠেছিল । বয়সের গন্ডি ৯-১০ এর মাঝামাঝি । তখন মেঘের একটা বন্ধু হয়েছিল নাম জয়৷ ছেলেটা স্কুলে নতুন এসেই বন্ধত্ব করেছিল মেঘের সাথে। ছোটবেলা পিচ্চিদের বন্ধুত্ব যেমন ছিল, চকলেট শেয়ার করা,টিফিন শেয়ার করা,একসাথে খেলাধুলা করা। ১ টা সপ্তাহ ও হয়নি তাদের বন্ধুত্বের। ৭ দিনের মাথায় আবির স্কুলে গিয়ে মেঘকে আর জয়কে একসাথে খেলতে দেখে। স্কুলের সবার মাঝখানে মেঘের গালে কয়েকটা থা*প্প*ড় বসিয়ে দিয়েছিল আর রা*গা*ন্বিত স্বরে বলেছিল, “তোকে যদি আর কোনোদিন কোনো ছেলের সাথে কথা বলতে বা খেলতে দেখি তাহলে তোর খবর আছে। ”
তারপর বোনকে টানতে টানতে বাড়িতে নিয়ে আসে, একটাবার বোনের দিকে তাকিয়েও দেখে নি। দুগালে আবিরের ৫ আঙুলের দাগ বসে গেছিলো।
সেইযে থা*প্পড় দিয়েছিল মেঘ এক সপ্তাহ জ্ব*রে পরে ছিল। মেঘ ছোট বেলা থেকেই খুব অ*ভিমা*নী ছিল। ছোট্ট মেয়েটা এই থা*প্পড়ের ভ*য়ে আর আ*তঙ্কে আর কখনো আবিরের দিকে চো*খ তুলে তাকায় নি, কথা বলা তো দূরের বিষয়, আবির বাসায় থাকাকালীন রুম থেকে বের ই হয় নি মেঘবালিকা । আবির ও কখনো খোঁজ নেয় নি মেয়েটার। ছোট্ট মেঘের মনে তখনই জন্ম নেয় আবির ভাই এর প্রতি অ*ভিমা*ন, সীমাহীন অভি*যোগ, কষ্ট আর বি*তৃষ্ণা। ২ বছর পর দেশ ছাড়ে আবির। এই সময়ের মাঝে মেঘ আবিরের সাথে এক টেবিলে খেতেও বসতো না। আবিরকে দেখলেই যেনো ছুটে পালাতো মেঘ৷ আবির বিদেশ চলে যাওয়ার পর মেঘ আবিরের ভয় থেকে নিজেকে সাবলীল করে আপন মনে রাজত্ব করতে থাকে খান বাড়িতে৷ আবিরের পাশের রুমটায় তার দখলে চলে আসে আবির থাকলে হয়তো কখনোই সে এই রুমে আসতো না।
বিদেশ যাওয়ার পর আবির সবার সাথে ভিডিও কলে কথা বলেছে কিন্তু কথা হয় নি মেঘের সাথে, ২-১ বার মেঘের কথা জিজ্ঞেস করেছিল ঠিকই কিন্তু মেঘ আত*ঙ্কে কথা বলতে চাই নি। এর পর থেকে আবিরও কখনো মেঘের কথা জিজ্ঞেস করে নি।।
এতবছর পর ভাই বাড়ি এসেছেন, এখনও দেখা হয় নি তারসাথে। এরিমধ্যে মা*রপি*ট করে ফেলেছেন৷ ছোটবেলায় অনুভূতি প্রকাশ না করতে পারলেও আজ আবিরের ক*র্মকা*ণ্ডের কথা শুনে মেঘের মনে একটা নাম ই ঘুরপাক খাচ্ছে সেটা হলো ‘হি*ট*লা*র’। হি*ট*লা*রে*র সাথে আবিরের কতটা মিল বা বেমিল তা বিবেচনা করার বিন্দুপরিমাণ ইচ্ছে নেই তার ।। মাথায় একটা চিন্তায় ঘুরছে ধন্যবাদ জানানো উচিত কিন্তু সে কি আদোঃ কথা বলতে পারবে হি*ট*লা*রে*র সাথে..??
এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরলো সে
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
ভোর বেলা থেকেই বাড়িতে রান্নার ধুম পরে যায়। তিনভাই সকাল সকাল খেয়ে অফিসে চলে যায়। মীম আর আদিও স্কুলে চলে যায়। মেঘ ঘুম থেকে উঠে ৮ টায়, রাত জাগার কারণে সকালে উঠতে পারে না সে। মাঝে মাঝে গোসল করে খেয়ে বের হয় মাঝে মাঝে এমনিতেই চলে যায়।। ১০-২টা পর্যন্ত বাহিরে কোচিং,তারপর টিউশন শেষ করে বাড়ি ফিরে, ফ্রেশ হয়ে খেয়ে একটু ঘুমাই। বিকালে একটু হৈ-হুল্লোড় করে তারপর পড়াশোনা করে। এই তার বর্তমান জীবন। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।। খেয়ে কোচিং এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরেছে, বাসার গাড়িই তাকে দিয়ে আসে আবার কল দিলে গিয়ে নিয়ে আসে।
ঠিকঠিক ১২ টায় ঘর থেকে বের হয় আবির ধীরগতিতে নিচে আসে , চি*ন্তিত মুখ দেখে মা মালিহা খান ভীতস্বরে ছেলেকে জিজ্ঞেস করেন,
‘কিছু হয়েছে তোর বাবা.?’
আবির মুখের ভা*রিভা*ব বজায় রেখে উত্তর দিলেন…
‘কিছু হয় নি, খেতে দাও’
ছোটবেলার চঞ্চলতার ছি*টেফোঁ*টাও নেই ছেলেটার মধ্যে এটা ভেবেই বারবার হতাশ হচ্ছেন মালিহা খান। হঠাৎ চোখ পরে ছেলের হাতে ব্যা*ন্ডে*জের দিকে, হাতটাও ফুলে গেছে অনেকটা।৷
আবির খাবার খাচ্ছে আর তার মা শা*ন্তস্বরে ছেলেকে বুঝাচ্ছেন, এটা করো না, সেটা করো না, মনে হচ্ছে ৫ বছরের শিশু সে, আ*গুন- পানি চিনে না।। যদিও বাবা মায়ের কাছে সন্তানরা সারাজীবন শিশুই থাকে। খাওয়া শেষে মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যায় আবির৷
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
মেঘ বাড়ি ফিরেছে ১ ঘন্টা হবে, শাওয়ার নিয়ে নিচে এসেছে খেতে। খাওয়া শেষ।
তানভির রুম থেকে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করে,
‘বড় আম্মু, ভাইয়া কোথায়?’
আঁতকে উঠেন মালিহা খান,
‘ও তো ২-৩ ঘন্টা আগেই খেয়ে বের হয়েছে, কেন?’
‘ইশ,মিস করে ফেললাম’
মালিহা খানঃ কি হয়েছে বাবা?
মেঘ নিরবে তাকিয়ে, ভাই আর বড় আম্মুর কথোপকথন শুনছে আর বুঝার চেষ্টা করছে ঘটনা টা কি৷
তানভির ভাইকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
‘কোথায় আছো?’
আবির কি যেনো বললো শুনা যায় নি… তানভিরের চোখে মুখে উ*ত্তে*জনা স্প*ষ্ট।
বড় আম্মু,আম্মু, কাকিমনি বাহিরে চলো
কেউ প্রশ্ন করার আগেই তানভির ছোটে গেলো বাহিরে, তার পিছন পিছন মীম,আদি,মা কাকিরা সবাই দরজা পর্যন্ত গেলো,সবার পিছনে মেঘও গেলো সেখানে৷
এরিমধ্যে বাইকে বাড়ি ঢুকলো আবির, নীল রঙের চকচকে একটা সুন্দর বাইক,হেলমেট টাও নীল।
হেলমেট খুলতে খুলতে তাকায় বাড়ির মানুষের দিকে…. মেঘ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
সেই কবে দেখেছিলো আবিরকে সেই আবিরের সাথে এই আবিরের চেহারার কোনো মিল নেই। হেলমেট খুলাতে চুল গুলো এলোমেলো হয়ে গেছে আবিরের, চোখে সানগ্লাস, নেভিব্লু রঙের শার্ট কালো প্যান্টের সাথে ইন করে পরেছে, হাতে কালো ফিতার একটা ঘড়ি, পায়ে শো জুতা। আপাদমস্তক দেখলো আবিরের, হৃ*দপি*ণ্ডের চা*রপ্রকো*ষ্ঠ ছটপট করতে লাগলো মেঘের। আবিরের দিকে বি*ভোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে৷
আবির বাড়ির সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
‘বাইক টা কিনেছি,কেমন হয়েছে?’
আবিরের কন্ঠ মেঘের মনের গহীনে ধাক্কা খায় এতে হুঁশ ফিরে তার। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না সে। একদৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা আটকে শুয়ে পরে মেঘ ।।
মীম আর আদি হৈ-হুল্লোড় করছে, আবির ভাইয়ার কাছে আবদার করছে ওদের বাইকে নিয়ে ঘুরার জন্য ।
মালিহা খান ছেলের পানে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘বাসায় ২-৩ টা গাড়ি থাকার পরও বাইক কেনো কিনলে?’
‘আমার গাড়িতে চলাচল ভালো লাগে না’,অবলীলায় উত্তর দিলো আবির।
পিচ্চিরা খুশি হলেও খুশি হতে পারেন নি মালিহা খান, হালিমা খান আর আকলিমা খান। কারণ এই বাড়িতে বাইক ব্যবহার নিষেধ করেছিলেন স্বয়ং আলী আহমদ খান নিজেই। তিনি কোনো এক বয়সে বাইকে এক্সি*ডেন্ট করেছিলেন সেই থেকে বাইক কিনা বা বাইকে চলাচল নি*ষিদ্ধ করেছেন। ইকবাল খানের খুব ইচ্ছে ছিল বাইক কেনার কিন্তু বড় ভাইয়ের নিষেধ অমান্য করার সাধ্য নেই তাই কিনতে পারেন নি। তানভির খুব করে চাইছিল বাইক কিনতে, রা*জনীতি*র সুবাদে অনেক জায়গায় চলাচল করতে হয় বাইক থাকলে সুবিধা হয়। বাবা মোজাম্মেল খানকে বলেও ছিল সে, কিন্তু বাবার এক কথা , তোর বড় আব্বু বাইক পছন্দ করে না তোর দরকার পড়লে তুই একটা গাড়ি সবসময় ব্যবহার করিস তারপরও বাইক কিনার নাম মুখে নিস না।
আবির বাড়ি ফিরেছে ২৪ ঘন্টা হবে হয়তো, এরমধ্যে ই বাইক কিনে ফেলছে, এর পরি*ণাম কি হবে তা ভেবেই ভয়ে আঁ*তকে যাচ্ছেন বাড়ির তিন বউ।।
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90
★★★★
অষ্টাদশীর হৃদয় কাঁ*পছে, কেমন জানি অস্থির লাগছে সবকিছু। পরিচ্ছন্ন নয়নে তাকিয়ে আছে রুমের জানালার দিকে, দৃষ্টি তার অসীম দূরত্বে। কি জানি কি ভাবলো কতক্ষণ হঠাৎ ঝলমলিয়ে উঠলো মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোয়াল শক্ত করে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলো,
‘ বাই এনি চান্স আমি কি হি*ট*লা*রটা*র উপর ক্রাশ খেয়েছি……???’
চলবে……
০৪) ( scsalma90)
শ্বা*স ঝেঁ*ড়ে, নিজের মাথায় গা*ট্টা মে*রে মেঘ বলে, ‘ছিঃ মেঘ ছিঃ, কি সব ভাবছিস তুই, কেউ কি তার চাচাতো ভাইয়ের উপর ক্রাশ খায়? ভালো, ভদ্র হলেও মানা যেতো, এমন গু*রুগ*ম্ভীর, ব*দমে*জা*জি আর হি*ট*লা*র স্বভাবের কেউ কি কারো ক্রা*শ হয়..!! যে ছেলে ১০ বছরের মেয়ের গা*য়ে হা*ত তু*লতে পারে সে আর যায় হোক আমার ক্রাশ হতে পারে না। এটা ভাবতেই মেঘের বু*ক ভে*সে আসে ক*ষ্টে।
নিজেকে স্বাভাবিক করতে মোবাইল হাতে নিয়ে কল করে মেঘের সবচেয়ে কাছের বান্ধবী বন্যাকে। প্রথম কল দিতেই রিসিভ হয় কল..
বন্যা- আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছো বেবি?
মেঘ- ওয়ালাইকুম আসসালাম, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, তুই কেমন আছিস?
বন্যা- হঠাৎ আমায় স্বরণ করার কোনো স্পেশাল কারণ আছে? তোর তো আবার ভাঙা ফোন ঠাসঠুস বন্ধ হয়ে যাবে।
মেঘ রা*গান্বিত স্ব*রে একপ্রকার হুং*কার দিয়ে বলে… “তুই আজ কোচিং এ আসিস নি কেন? কি যে একটা জিনিস মিস করছিস…”
বন্যা- কি মিস করেছি বলে ফেলো বান্ধবী
মেঘ- এখন বললে কি আর সেই ফিল টা পাবি নাকি আজব
বন্যা- আরে বেবি বলো তুমি। কাল শুক্রবার কোচিং বন্ধ, আবার দেখা হবে রবিবারে ততদিন সহ্য হবে না। বলে ফেল প্লিজ।
মেঘ- আমার হাতে এখন iPhone 13 pro max
মেঘের কথা বন্যা এক বিন্দুও বিশ্বাস করে নি, হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলছে, এখন বল
‘একটু পর 14 pro max কিনতে যাচ্ছিস,যাকে তার ভাই একটা আধা ভা*ঙা ফোন দিয়েছে ব্যবহারের জন্য, দিনে ১০০ বার বন্ধ হয়ে যায়, তার হাতে নাকি iPhone. তুই কি ঘুম থেকে স্বপ্ন দেখে উঠলি নাকি?’
মেঘের উৎফুল্ল মে*জাজ আচমকাই বি*গড়ে গেলো, অভিমানী স্বরে বললো,
‘কাল আবির ভাই আসছেন বিদেশ থেকে ওনিই নিয়ে আসছেন আমার জন্য।’
বন্যা- তাই বল, নাহয় তোর যে ভাই সে তোকে এই জীবনে ফোন কিনে দিতো না, তোর বাবা দিতে চাইলেও সে আ*ছাড় মে*রে ভে*ঙে ফেলতো। ওয়েট ওয়েট, এই আবির ভাইটা কে রে? যে তোকে ছোট বেলা মে*রেছিল, সে?
মেঘ মুখ কালো করে উত্তর দিলো,
‘হ্যাঁ আমার চাচাতো ভাই।’
বন্যা- তা তোর প্রতি এত মায়া হলো কিভাবে ওনার?
মেঘ- জানিনা। শুন তোকে কি বলি
বন্যা- হ্যাঁ বল
মেঘ- আসলে আজকে বিকালে আবির ভাইয়াকে দেখে ছোটখাটো একটা শ*ক খেয়েছি৷
বন্যা- মানে?
মেঘ- কি সুদ*র্শন চেহারা,দাঁড়ানোর স্টাইল,লুক আর অগোছালো চুলদেখে আমার মনটায় এলোমেলো হয়ে গেছে, আমি মনে হয় ওনার উপর ক্রাশ খেয়েছি.
মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে একটু ধাতস্থ হয়ে গুরুগম্ভীর স্বরে বন্যা বললো,
‘তোর মাথা ঠিক আছে মেঘ?তুই এতবছর যাবৎ বলছিস এই মানুষটা তোর শৈশব নষ্ট করে দিয়েছে, আজ কৈশোরে পা দিতেই এই মানুষটার উপর ক্রা-শ খেয়ে ফেলছিস? মানুষ রঙ বদলায়, কারণে অকারণে বদলায় কথাটা এতদিন শুনেছি কিন্তু আজ তোকে দেখে মনে হচ্ছে এই কথাটা ১০০% সত্যি। না হয় যাকে এত বছর শ*ত্রু ভেবে এসেছিস আজকে তার কথা অবলীলায় বলে যাচ্ছিস, বাহ মেঘ বাহ। ‘
মেঘের নিরবতা বুঝতে পেরে বন্যা আবার বলা শুরু করলো,
‘ এসব কোনো বিষয় না বেবি, হঠাৎ করে দেখেছিস তো তাই আহামরি সুদর্শন লেগেছে, বিষয়টা মাথা থেকে ঝে*ড়ে ফেল দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে, আমরা না দুজন দুজনকে কথা দিয়েছিলাম, একজন বিপথে গেলে আরেকজন সামলাবো । ভুলে গেলি?’
স্পষ্ট বুঝা গেলো মেঘের বদলে যাওয়া অভিব্যক্তি। সহসা নিজেকে সামলে আচমকা প্রশ্ন করে বসলো,
‘আমি কি দেখতে সুন্দর না? আমি কি কারো ক্রাশ হওয়ার যোগ্য না?’
মেঘের আকস্মিক প্রশ্নে বন্যা কিছুটা হতভম্ব হলো এরপর
কয়েকমিনিট শুধু হেসেই গেলো.,স্বাভাবিক স্বরে বললো.. ‘অবশ্যই তুই সুন্দর, ক্রাশ খাওয়ার ও যোগ্য কিন্তু তুই ছেলেদের ক্রাশ হতে পারবি কি না সন্দেহ আছে৷ হতে পারিস রাস্তাঘাটের,গাছগাছালির, রঙচটা দেয়ালের, গরুছাগলের ও হতে পারিস।’
রা*গে ফুঁ*সতে ফুঁ*সতে কল কেটে দিয়েছে মেঘ আর ভাবছে,
‘আজকাল সান্ত্বনা নিতে চাইলেও মানুষ মজা নেয়’
যদিও বন্যার হাসির কারণ টা খুবই স্বাভাবিক । মেঘকে বরাবর ই চোখে চোখে রেখেছে তানভির সহ বাড়ির সকলে, 6-10 পর্যন্ত পড়েছে গার্লস স্কুলে, তারপর গার্লস কলেজ। আহারে জীবন ধূ ধূ মরুভূমির মতো কোথাও কেউ নেই। স্কুল কলেজের সামনেই বাসার গাড়ি থাকতো,বাসা টু স্কুল,স্কুল টু বাসা। কোনো ছেলে না দেখলে ক্রা*শ কিভাবে খাবে! বো*ধশক্তি হওয়ার পর মেঘ মনে হয় ২-৩ টা বিয়ে খেয়েছে কাজিনদের।৷ যাকে বলে নামের বিয়ে খাওয়া। তানভিরের ভয়ে বিয়ে বাড়ির এক কোণে বসে থাকতো মেঘ৷ ভাইয়ের ক*ড়া শাসন ছিল ঘর থেকে বের হতে পারবি না, বরযাত্রী আসলে তো আরও না। ঘরের ভিতরেই তারজন্য খাবার পাঠানো হতো, তানভির নিজেই বোনকে খাওয়াতো ইচ্ছে মতো। তারপর বিয়ে শেষ হলে মা বোনকে নিয়ে চলে আসতো। গায়ে হলুদে নাচা,গান গাওয়া এমনকি মেহেদীও দিতে পারে নি কখনো।। এই কষ্টে এখন আর মেঘ কারো বিয়েতেই যায় না। এতে তানভির মনে হয় হাফ ছেড়ে বেঁচেছে।৷ মেঘের এই সাদাকালো জীবনের কথা শুনলে বন্যা কেনো পৃথিবীর সব মানুষ ই হাসবে। জীবনটা তার তেজপাতা হয়ে গেছে । মাঝে মাঝে ভাবে এই বাড়িতে জন্মানো টা কি খুব দরকার ছিল…!!!
কয়েকবার বন্যা কল ব্যাক করেছে, নিজের জীবনের হতাশার জন্য মেঘ আর কল রিসিভ ই করে নি, বান্ধবীকে রাগ দেখিয়ে কি হবে…! জীবন যেখানে যেমন তা মানতেই হবে।
মেঘের বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে বন্যাকেও। মেঘের সাথে সাথে বন্যাকেও চোখে চোখে রাখে তানভির। কথায় আছে সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে, সঙ্গ খারাপ হলে মেঘও খারাপ হবে তাই সব সময় বন্যার পিছনে লোক লাগিয়ে রাখে। শুধু বন্যাই না আরও ২ জন বান্ধবী আছে মেঘের, একজন পাখি আরেকজন মায়া। ওদেরকেও নজরে রাখে তানভির। বোনকে সব দিক থেকে প্র*টেক্ট করাই যেন তার প্রথম এবং প্রধান কাজ৷
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
আবির বিকাল থেকে ঘুমাচ্ছে। সন্ধ্যা ৭ টায় ঘুম ভাঙে আদির ডাকে। নিচে আবিরের আব্বু আর মেঘের আব্বু বসে আছেন, আবিরের বাইক কেনার কথা শুনেই তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন অফিস থেকে৷ আবির ঘুম থেকে উঠে চোখেমুখে পানি দিয়ে টাওয়েল দিয়ে কোনোরকমে মুখ টা মুছে তৎক্ষনাৎ রুম থেকে বের হয় ৷ সে তার বাবাকে খুব ভালো করে চিনে ডাকার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত না হলে বাড়িতে তা*ন্ডব শুরু করে দিবেন। আবিরের চোখে মুখে ঘুমের প্রভাব স্পষ্ট । ব্যস্তপায়ে হাঁটছে সে, আচমকা এলেমেলো পায়ে ছুটে রুম থেকে বের হয় মেঘ চুলগুলো অগোছালো। আকস্মিক ধা*ক্কা এড়াতে চটজলদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে অ*গ্নিদৃ*ষ্টিতে তাকায় আবির, তৎক্ষনাৎ মোটা ভ্রু*যূগল শিথিল হয়ে যায়,অ*মত্ত চেয়ে রইলো সে
একমুহূর্তের জন্য মস্তিষ্ক থমকে গেছে আবিরের, দৃষ্টি তার প্র*খর, আচ*মকা হাঁটা থামাতে শ্বাস ভা*রি হয় আবিরের, কালো জামা প*রিহিতা এক ললনার দিকে দৃষ্টি পরে, আ*পাদমস্তক দেখলো একবার, কালো জামাতে যাকে অ*প্সরার ন্যায় লাগছে, এলোমেলো চুলগুলো তার কোমড় ছাড়িয়েছে চুল দেখে মনে হয় জীবনানন্দ দাশের বনলতাকে উদ্দেশ্য করে লেখা,
“চুল তার কবেকার অন্ধ*কার বিদিশার নিশা।”
দ্রুতগতি থামাতে গিয়ে মেঘের ছোট দেহ কম্পিত হয়,দৃষ্টি পরে ৬ ফুট লম্বা মানুষটার বু*কে, মেঘ মুখ তুলে তাকায় সেই মানুষটার চেহারার পানে, আবিরের চোখের দিকে বি*স্ময়াভিভূত নয়নে তাকিয়ে আছে মেঘ, পলক ও পরছে না একটিবার, আবিরের চোখে মুখে ছিটানো পানির ঝাপটায় এলোমেলো চুলগুলো থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পরছে যা তার পরনের সাদা টিশার্ট অল্পস্বল্প ভিজিয়ে দিচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই আবিরের,
আবির কয়েক সেকেন্ড স্ত*ব্ধ থেকে হঠাৎ চোখ সরিয়ে পুনরায় রু*দ্রমূর্তি ধারণ করে স*বেগে হাঁ*টা দেয় সিঁড়ির দিকে, পিছন থেকে অষ্টাদশীর কোমল কন্ঠে ডাক শুনে থমকে দাঁড়ায় আবির তবে পিছনে তাকানোর প্রয়োজন মনে করে নি সে,
মেঘ ভ*য়ার্ত কন্ঠে বলে, ‘Thank you Abir Vai’
আবির শুনলো কি না কে জানে, এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে যথারীতি ব্য*স্ত ভঙ্গিতে নিচে নেমে যায়।
মেঘ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে,থরথর করে কাঁপছে মেঘের হাত পা, মেঘের মনে হচ্ছে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে সমগ্র পৃথিবী। কেনো জানি দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না মেয়েটা, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে তাড়াতাড়ি দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছে। এতগুলো বছর পর আবিরের চোখে চোখ রাখলো মেঘ, ভেতর টা ভ*য়ে আঁ*তকে উঠছে বার বার, অন্তরা*ত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে মেঘের৷
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
সোফায় বসে আছেন ২ ভাই,বাড়ির মহিলা রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত থাকলেও নজর তাদের এদিকে, কি হবে কে জানে
আলী আহমদ খান নিজের গা*ম্ভীর্যতা বজার রেখে একপ্রকার হুংকার দিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“তুমি নাকি বাইক কিনেছো?”
এই কথায় হুঁশ ফিরে অষ্টাদশীর, কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে ২ পা সামনে এগিয়ে বারান্দার সাইডে দাঁড়িয়ে নিচে তাকায় মেঘ, নিচে সোফায় বসা আব্বু আর বড় আব্বু, তাদের থেকে কিছুটা দূরে দুহাত ভাজ করে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবির৷
জ্বী’, ভাবলেশহীন ভাবে উত্তর দেয় আবির।
‘কিন্তু কেন?’ পুনরায় হুংকার দেন তার আব্বু।
‘আমার বাইক কেনার ইচ্ছে ছিল তাই কিনেছি,’
‘তুমি জানো না এই বাড়িতে বাইক কেনা বা চালানো নিষেধ?’ এবার প্রশ্ন টা চাচ্চু মোজাম্মেল খান করেছেন।
‘হ্যাঁ জানি, ২০/৩০ বছর আগে কি ঘটে গেছে তা নিয়ে আতঙ্কে থাকার কোনো মানে হয় না, যদি কপালে খারাপ কিছু লিখা থাকে তাহলে সেটা ৭ সমুদ্র পারি দিয়ে হলেও আসবেই। সেটা আমি ঘরে বসে থাকলেও হবে আর গাড়িতে চলাচল করলেও হবে৷ ‘
‘তোমরা ২ ভাই কি নিজেদের মর্জি মতোই চলবে?’ আলী আকবর খান রা*গান্বিত স্বরে প্রশ্ন করলেন।
‘বাইক কিনা যদি নিজের ইচ্ছে মতো চলা হয় তাহলে আমি দুঃখিত আব্বু৷ এই ব্যাপারে আমি নিজের মনের কথায় শুনবো।’
‘আমাদের নিজস্ব ৩ টা গাড়ি আছে, এত গাড়ি কেনো কিনলাম তোমাদের জন্যই তো’ মোজাম্মেল খান কোমল স্বরে বললেন।
‘গাড়িতে চলাচল আপনাদের ইচ্ছে তাই আপনারা গাড়ি কিনেছেন, আমার গাড়িতে চলাচল করতে ভালো লাগে না তাই আমি বাইক কিনেছি এটা নিয়ে এত কথা বাড়ানোর কি আছে চাচ্চু । তোমাদের বাইক সম্পর্কিত জে*রা শেষ হলে আমার তোমাদের কে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা আছে। ‘ আবির আব্বুর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললো।
এতক্ষণ বাড়ির মহিলা রান্নাঘরে থাকলেও এবার আর থাকতে পারলেন না, এক ছুটে সবাই ড্রয়িংরুমে চলে এসেছেন । মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে। এই বাড়িতে এত বছরে কাউকে গলা উঁচু করে মুখের উপর কথা বলতে শুনেনি সে। তানভির ভাইয়া যত মেজাজ দেখিয়েছে সব মেঘের উপর, বড় আব্বু বা নিজের আব্বুর মুখের উপর কথা বলার সাহস হয় নি তার। আবির ভাই ২দিন হলো এসছে,আজই বাবার মুখের উপর নিজের ম*র্জি শুনাচ্ছে, এখন মেঘের মনে হচ্ছে ওনি হি*ট*লা*রের থেকেও বড়মাপের কিছু । মনোযোগ দিয়ে বাকি কথা শুনার চেষ্টা করছে মেঘ.
আবির: আব্বু,চাচ্চু আমি অনেকদিন যাবৎ চিন্তা ভাবনা করেছি নিজে একটা কোম্পানি শুরু করার। তোমরা অনুমতি দিলে কাজ শুরু করবো
মোজাম্মেল খান ও আলী আকবর খান দুজনের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পরেছে। এতবছর ছেলেকে বাহিরে রেখে পড়াশোনা করিয়েছেন, দেশে এসে নিজের ব্য*বসার হাল ধরবে, দেশে পা দিতেই নিজে কোম্পানি খোলার চিন্তা ভাবনা করছে ছেলে৷
মোজাম্মেল খান চিন্তিত কন্ঠে বললেন, আমরা তো ভেবেছিলাম তুমি পারিবারিক ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আবির কিছু বলার আগেই আলী আকবর খান বলে উঠলেন,
‘ঠিক আছে, তুমি পড়াশোনা করে এসেছো, তোমার নিজস্ব মতামতের গুরুত্ব আমরা অবশ্যই দিবো,তোমার নতুন কোম্পানি নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই তবে আমার একটা শর্ত আছে, তুমি আমাদের কোম্পানির CEO হবে, আগামীকাল শুক্রবার অফিস ছুটি তাই তুমি শনিবারে অফিসে যাবে,তোমাকে অফিসিয়াললি CEO পদ দেওয়া হবে। তারপর তুমি আমাদের অফিস সামলে যদি নতুন কোম্পানি শুরু করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারো তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। Best of luck my boy.
আবির যেনো আগে থেকেই জানতো এরকম কিছু হবে তাই তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলো না’
এতটুকু বলে সোফা থেকে উঠে রুমের দিকে হাঁটা শুরু করলেন আবিরের আব্বু, কয়েক কদম এগিয়ে আবার দাঁড়িয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে রু*দ্ধ কন্ঠে বললেন,
‘আমরা কোম্পানি সামলানোর জন্য সারাজীবন থাকবো না তোমাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে, তুমি না পারলে তোমার প্রাণপ্রিয় ভাই তানভিরকে বলো রা*জ*নী*তি ছেড়ে ব্যবসায় আসতে তারপর তুমি তোমার মতো নিজে কোম্পানি খুলতে থাকো।’
আবির চোয়াল শক্ত করে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘তানভির রা*জনী*তিই করবে ওর মাথায় ব্যবসা ঢুকানোর কোনো দরকার নেই, শনিবারেই অফিসে আসবো আমি। আমি একায় সবদিক সামলাতে পারবো। তোমরা দয়া করে তানভিরকে মুক্তি দাও, নিজের মতো করে রাজনীতি টা করতে দাও ওকে। তোমার শ*র্ত যেমন আমি মেনে নিয়েছি তোমাদেরকেও আমার একটা শর্ত মানতে হবে সেটা হলো, আমি আমার মন মতো কাজ করবো, আমার যখন যেখানে প্রয়োজন হবে নিজের কাজ গুছিয়ে আমি চলে যাব তখন আমাকে কোনো প্রকার বাঁ*ধা দিতে পারবে না কেউ। দরকার হলে ২ অফিসের কাজ শেষ করে আমি রাত ১২ টায় বা ২ টায় বাসায় ফিরবো এমনকি নাও ফিরতে পারি এতে তোমাদের যেনো মা*থা*ব্যথা না হয়।’
একদমে কথাগুলো বলে কোনোদিকে না তাকিয়ে দ্রুতপায়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আবির
আলী আহমদ খান কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে কোনো কথা না বলে রুমের দিকে হাঁটা দেন।
পিনপতন নীরবতা বাড়িতে৷ সোফায় বসে আছেন মোজাম্মেল খান, কাছেই তিন ঝা একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছে বারবার, তাদের আবিরের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস আছে কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাহিরের দুনিয়া সামলাতে গিয়ে নিজের প্রতি না যত্নহীন হয়ে পরে ছেলেটা এটায় তাদের চিন্তার বিষয়।
নিচে উপস্থিত মানুষগুলোর মধ্যে চিন্তার ছাপ দেখা গেলেও উপরে দাঁড়িয়ে একপ্রকার বিনোদন উপভোগ করছিল মেঘ৷ যেই বড় আব্বুর কথার উপর কারো কথা চলে না আজ ওনার সাথে টক্কর দেয়ার মানুষ এসেছে৷ বাবা ছেলে কি শ*র্তটায় না দিচ্ছে৷ যেমন বাবা তেমন ছেলে এসব ভেবেই হাসি পাচ্ছে মেঘের। হঠাৎ করেই হাসিটা গা*য়েব হয়ে মুখটা ভা*রি হয়ে গেলো মেয়েটার, আর ফিসফিসিয়ে বলতে শুরু করলো,
” নিজে তো হি*ট*লা*র সাথে আমার ভাইটাকে বড় গু*ন্ডা বানাতে কি সুন্দর উৎসাহ দিচ্ছে । এতবছর ভাইয়ের জ্বা*লায় জীবন তেজপাতা এখন আবার আরেকজনের আবির্ভাব হলো। কপালটায় খারাপ আমার। ”
এখন নিচে যাওয়ার পরিস্থিতি নেই তাই বিড়বিড় করতে করতে রুমে ঢুকতে যাবে হঠাৎ চোখ পরে আবির ভাইয়ার রুমের দিকে এক রাশ হতাশা নিয়ে রুমে ঢুকে যায় মেঘ।
বাবা মা কে ছেড়ে আলাদা রুমে থাকলে খুব স্বাধীনতা পাবে ভেবে নিচতলা থেকে উপর তলায় চলে এসেছিল মেঘ, আবির ভাই বিদেশ যাওয়াতে কোনো চিন্তায় ছিল না। কিন্তু মেঘ আসার ১৫ দিনের মাথায় তানভির ও মেঘের পাশের রুমে চলে আসে জিনিসপত্র নিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে সোজা উঠতেই তানভিরের রুম। বোনকে পাহারা দিতেই মূলত এই রুমে আসা। তানভির যতক্ষণ রুমে থাকে ততক্ষণ নিজের রুমের দরজা টা খুলে রাখে, মেঘ সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে উঠতে গেলেও ভাইয়ের কথা ভেবে আস্তেধীরে উঠানামা করে৷ বর্তমানে মেঘের অবস্থা না*জে*হাল কারণ তার একপাশে আবির ভাই এর রুম,আরেকপাশে তানভির ভাইয়ের৷ তানভির ভাইয়ের পরের রুমটা মীমের জন্য ঠিকঠাক করা হচ্ছে কিছুদিন পর থেকে মীমও উপরে থাকবে কিন্তু তাতে কি! ভাইয়ের ঘর ডিঙিয়ে মীমের রুম পর্যন্ত যেতে পারবে কি না স*ন্দেহ আছে৷
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
রাত ১০ টার উপরে বাজে সবাই খাওয়াদাওয়া শেষ করে যার যার রুমে চলে গেছে। আবির এখনও বাড়ি ফিরে নি। মালিহা খান সোফায় বসে অপেক্ষা করছেন ছেলের জন্য । ১০-১৫ মিনিট পর বাড়িতে ঢুকলেন আবির আর তানভির, মাকে বসে থাকতে দেখে কিছুটা রা*গান্বিত হলো ছেলে।
‘আম্মু তুমি আমার জন্য এভাবে রাত জেগে বসে থেকো না প্লিজ, আমি নিজের মতো করে খেয়ে নিবো।’
‘তোর বউ আসলে আমি আর অপেক্ষা করবো না তোর জন্য,’ সহসা উত্তর দিলেন মালিহা খান।
বড় আম্মুর কথা শুনে স্ব শব্দে হেসে উঠে তানভির । আবির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তানভিরের দিকে সঙ্গে সঙ্গে তানভির হাসি থামিয়ে ফেলে, নিঃশব্দে হাসছে সে।
তানভির বরাবর ই ভী*তু প্রকৃতির, বাহিরে যতই শ*ক্তপো*ক্ত থাকুক না কেন বাবা, চাচা আর ভাইয়ের সামনে সে যেনো ভে*জা বিড়াল। এতদিন যত কাজ ই থাকতো ছেলেটা ৮-৯ টার মধ্যে বাড়ি এসে সবার সাথে খেতে বসতো৷ কিন্তু আবির ফেরাতে টাইম সিডিউলে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে ছেলেটার।
চলবে……
আবির মায়ের উদ্দেশ্যে ঠাট্টার স্বরে বলে উঠলো,
‘এর উল্টোটাও হতে পারে যেমন তোমার বউমা তোমার কোলে ঘুমিয়ে গেলো আর তুমি তাকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে আমার জন্য অপেক্ষা করলে’
ছেলের এরকম ঠাট্টায় ভ্যাবাচেকা খেলেন মালিহা খান৷
‘আবির পুনরায় শান্ত অথচ ক*ড়া বলে উঠলো, ‘কাল থেকে তোমায় যেন বসে থাকতে না দেখি। আমার কিছু লাগলে চেয়ে নিবো আর খাবার টেবিলে রেখে দিও আমি খেয়ে নিব। ‘
এই কথার কোনো উত্তর বা দিয়ে,মালিহা খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
‘তানভির, মেঘ এখনও খায় নি, একটু ডেকে আসবি? এখন খাবে কি না!’
তানভির ঠিক আছে বলে উপরে গেলো, আবিরও নিজের রুমে গেলো৷ ৫ মিনিটে ড্রেস পাল্টে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামছে।
এতক্ষণে মেঘ খাবার টেবিলে চলে এসেছে৷ ভেবেছিল ভাই ফ্রেশ হয়ে নামার আগে তাড়াতাড়ি খেয়ে পালাবে৷
খাওয়া অর্ধেক হতেই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় সিঁড়ির পানে, কালো টিশার্ট আর টাওজার পরে হাতে মোবাইল নিয়ে আপন মনে নামছে আবির, মেঘ সরু চোখে নিরীক্ষণ করছে আবিরকে৷ মানুষটাকে দেখে হৃৎস্পন্দন বাড়তে লাগলো মেঘের৷ এখন সে স্পষ্ট অনুভব করছে। তার বুকের ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে । কিন্তু বোধগম্য হলো না কি হচ্ছে। নিজের অজান্তেই বুকের বা পাশে হাত রাখলো মেঘ। অনুভব করলো কিছু একটা অনবরত নৃত্য করছে বুকের ভেতর৷
আবিরের চেয়ার টেনে বসার শব্দে ঘোর কাটলো মেঘের, স্ব বেগে হাত নামিয়ে আনলো বুক থেকে, আবির মেঘের ঠিক বিপরীত চেয়ারটায় বসেছে।
মেঘের ছোট্ট বুকটা অনবরত কেঁপেই যাচ্ছে, চোখ তুলে তাকাতে পারছে না মেয়েটা। শরীর কাঁ*পা কাঁ*পি আর হৃদপিণ্ডের লাফা- লা*ফিতে সে বিদ্বিষ্ট, দিশেহারা অবস্থা অষ্টাদশীর। ইচ্ছে করছে ছুটে পালিয়ে যেতে আবিরের সামনে থেকে৷ কিন্তু পারছে না মনে হচ্ছে পায়ে শিকল দিয়ে বাঁধা।
মালিহা খান, হঠাৎ মেঘের হাতে হালকা ধাক্কা দিলেন, ‘কিরে কি হলো তোর?’
দ্বিতীয় বার বার ঘোর কাটলো মেঘের, তৎক্ষণাৎ স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো, কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, ‘কিছু না!’
এই বলে পুনরায় খাওয়ার চেষ্টা করলো,কিন্তু এবার আর গলার দিয়ে খাবার নামছে না মেঘের৷ গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কাঁ*পা কাঁ*পা হাতে গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে অর্ধেক গ্লাস পানি নিমিষেই শেষ করে ফেললো মেঘ।
আবির আপন মনে খাচ্ছে, ‘সামনে বা আশেপাশে কি হচ্ছে এসব দেখার প্রয়োজনই মনে করলো না সে। এই জগতের সবকিছু তার আগ্রহ সৃষ্টি করতে অক্ষম। ‘
আবিরের গা ছাড়া ভাব দেখে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে খাওয়া শুরু করে মেঘ৷ মাঝখানে এক পলকের জন্য তাকিয়েছিল আবিরের দিকে, ‘কালো টিশার্টে মুখ টা কত মায়াবী লাগছিল, এলোমেলো চুল, খাওয়ার স্টাইল দেখে দ্বিতীয় বারের মতো ক্রাশ খেলো অষ্টাদশী।
কে বলতে পারে, দুইদিন আগে পর্যন্ত আবিরের কোনো স্মৃতি ছিল না মেঘের মন, মস্তিষ্ক জোড়ে। হঠাৎ মনে পরলেও শুধু ওকে মেরেছিল এই স্মৃতিটায় মনে হতো আর রাগে কটমট করতো মেঘ। আর আজ বিকাল থেকে যতবার আবিরকে দেখছে ততবার মেঘের শীর্ণ বক্ষ ধরফড়িয়ে ওঠছে। ছোট বেলা যে ভ*য়টা ভাইয়ের প্রতি বোনের ছিল সেটা আজ বদলে গেছে। আবিরের দৃষ্টি তাকে বরফের ন্যায় জমিয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত৷ এই দৃষ্টিতে সূ*চালো কিংবা ধা*রালো অ*স্ত্র আছে যা এক কিশোরীর বক্ষপিঞ্জর এফোঁ*ড় ওফোঁ*ড় করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে৷
আবিরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাবিজাবি চিন্তা করছিল মেঘ।
আবির চোখ তুলে তাকাতেই, মেঘের মনোযোগ ঘুরে গেলো, আবিরের ত*প্ত দৃষ্টি মনে হচ্ছে ফা*লা ফা*লা করে দিচ্ছে হৃদপিণ্ডটা, দৃষ্টি সংযত করে চিবুক নামিয়ে নিলো গলায়, সহসা মুখবিবর চুপসে গেছে আমস*ত্ত্বের ন্যায়।
দ্বিতীয়বার আবিরের দিকে তাকানোর স্পর্ধা টুকু হয় নি অষ্টাদশীর।
এরমধ্যে মালিহা খান ছেলে আবিরের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,
‘তোর নতুন কোম্পানি টা কি না খুললে হয় না? তোর বাবা বিষয়টা ভালোভাবে নিচ্ছেন না। কেনো বাবাকে রাগিয়ে দিচ্ছিস..!! তোর বাবা তোকে অনেক ভালোবাসে। ‘
শাণিত স্বরে মায়ের দিকে তাকিয়ে আবির বলা শুরু করলো,
“ছেলেরা সারাজীবন বাবাদের প্রিয় থাকতে পারে না।
নিজের স্বপ্ন,ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দূরত্ব বেড়ে যায় বাবা ছেলের।
এটা অস্বাভাবিক কিছুনা। যদি বাবার স্বপ্ন বা ইচ্ছের হাল প্রতিটা ছেলে ধরতো তাহলে পৃথিবী এতটা এগিয়ে যেতো না, আমাকেও দেশ ছেড়ে এত বছর বাহিরে পড়ে থাকতে হতো না। আব্বু নিজে এই কোম্পানি শুরু করেছিল, ওনি যদি ওনার বাবার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতেন তাহলে আজ এতদূর পৌছাতেন না । তাছাড়া আমি তো বলি নি বাবার স্বপ্ন বাদ দিয়ে আমি আমার স্বপ্নকে প্রাধান্য দিবো। আমার স্ব*প্ন একান্তই আমার। আমি দুদিক ই সামলাবো তুমি এসব নিয়ে অযথা চি*ন্তা করে নিজের শরীর খারাপ করো না।’
মালিহা খান চিন্তিত স্বরে বলে উঠলেন, ‘এত চাপ আর দৌড়াদৌড়ি করে তো নিজে অসুস্থ হয়ে পরবি বাবা।’
আবির গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো, “তোমাকে তো বললাম আমার জন্য দুশ্চি*ন্তা করতে হবে না।”
তানভির মাঝখান থেকে বলে উঠলো, “ভাইয়ার জন্য চি*ন্তা করার মানুষ আছে বড় আম্মু, তুমি রিলা*ক্সে থাকতে পারো।”
মেঘ এতক্ষণ নিরবে খেলেও এই কথা শুনামাত্রই ছোট দেহ কম্পিত হয় তার, আত*ঙ্কিত হয়ে তাকালো আবিরের দিকে,
আবির তৎক্ষণাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো তানভিরের দিকে, ওমনি মুখটা চুপসে গেলো তানভিরের৷
করুন স্বরে বললো, ‘সরি ভাই’
পিনপতন নীরবতা খাবার টেবিলে। কেউ কোনো কথা বলছে না। মেঘের মনটা সহসা খারাপ হয়ে গেলো৷
“তানভির আবিরের একনিষ্ঠ ভক্ত । এক কথায় দুজন দুজনের বেস্ট ফ্রেন্ড। আবির গুরুগম্ভীর স্বভাবের, রাগী, কথা কম বলে কিন্তু দিনশেষে আবিরের অপ্রকাশিত আবেগগুলো তানভিরকেই শেয়ার করে এসেছে এতবছর,এমনকি এখনও। আবিরের থেকেও বেশি তানভির ভালোবাসে আবিরকে। আবির যদি বলে সারারাত এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকবি, তানভির তাই করবে।
অবশ্য করবে নাই বা কেনো, সেই কলেজ লাইফ থেকে রাজ*নীতি করার ইচ্ছে তানভিরের, পড়াশোনাতে তার বিশেষ আগ্রহ ছিল না । বড় আব্বু এবং আব্বুকেও বলেছে কয়েকবার তাদের কড়া জবাব, রাজ*নীতি আমাদের পছন্দ না. এই বাড়ির কেউ রাজ*নীতি করবে না।
একদিন বাধ্য হয়ে ভাইকে কল করেছে তানভির, ভালোমন্দ কথা শেষ করে তানভির ভয়ে ভয়ে বললো,
‘ভাইয়া তোমার সাথে আমার একটু কথা ছিল!’
আবির সাবলীল ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিল সেদিন,
‘রাজ*নীতি করতে চাস তাই তো?’
তানভির নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, আবির এত স্বাভাবিক ভাবে কথাটা বলছে’
আবির: ‘তুই রাজ*নীতি কর সমস্যা নাই। কিন্তু কিছু বিষয় মাথায় রাখবি, বিষয় টা দেখতে যতটা সহজ ততটাও সহজ না। একনিষ্ঠ এবং সৎ থাকতে হবে তোকে । দল,মত নির্বিশেষে তোকে সত্যের পথে চলতে হবে পা চা*টা স্বভাব যেনো না হয়। ‘
তানভির ভয়ে ভয়ে বললো, ‘বড় আব্বু আর আব্বু তো রাজি হচ্ছে না’
আবির হেসে উত্তর দিয়েছিল, ‘ঐসব আমি সামলে নিবে, তুই আমায় কথা দে তুই তোর জায়গায় সৎ থাকবি, আর যেকোনো সমস্যা আমায় শেয়ার করবি’
সেদিন খুশিতে তানভিরের চোখ টলমল করছিল, আবির সামনে থাকলে হয়তো জরিয়ে ধরে কেঁ*দে দিতো ছেলেটা, সেদিনই ভাইকে কথা দিয়েছে, ‘
‘সে সারাজীবন সৎ থাকবে এবং একনিষ্ঠ ভাবে রাজ*নীতি করবে। ‘
এরপর থেকে রাজ*নীতি সম্পর্কিত যত ঝামেলা আছে, কি করা দরকার, কোনটা করলে ভালো হবে সবই ভাইয়ের সাথে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তানভির ।
আজ সে ছাত্রলী*গের সহ-সভাপতি। সবটুকু ক্রেডিট আবিরের। আগামীবছর মে*য়র নির্বাচনের পরে নতুন করে সভাপতি করা হবে। তাই তানভির চেষ্টা করছে যেন এইবার সভাপতি হতে পারে৷ ‘
তানভিরের রাজ*নীতির জন্য বাবা-চাচার সাথে আবিরের কথা-কাটাকাটি সেই শুরু থেকেই। কিন্তু আবিরের এক কথা, তানভির রাজ*নীতিই করবে। আজ সন্ধ্যায় ও বাবা-চাচার মুখের উপর বলেছিল তানভিরকে কোনো প্রকার বাঁধা যেনো না দেয়া হয়।
তানভিরের জীবনে আবির গাছের ন্যায়, যার ছায়ায় তানভিরের অবস্থান। ভাই ছাড়া তানভির অসহায় ।
★★★
খাওয়া শেষ করে আবির নিজের রুমে চলে গেছে, তানভির ও চলে গেছে। কিন্তু বসে আছে মেঘ, সে খাবার টেবিলে সবার আগে এসেছিল, ভেবেছিল ভাইয়ের আগে খেয়ে পালাবে কিন্তু তা আর হলো কই আবিরের জীবনে কেউ আছে এই কথাটায় মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অষ্টাদশীর, ভাতের প্লেটে আঙুল ঘুরাচ্ছে আর ভাবছে,
‘আমার ছোট্ট মন টা এভাবে ভেঙে গেলো, প্রেমে পরার আগেই ব্রেকাপ হয়ে গেলো, ছিঃ’ তৎক্ষনাৎ নিজের মনকে নিজেই সান্ত্বনা দিচ্ছে, থাক মন খারাপ করিস না, ছেলেটা ভালো না,মনে নেই তোকে ছোট বেলা মেরেছিল, আস্ত হিট*লার, তোর জীবনে রাজপুত্র আসবে যার জীবনে রাজ করবি শুধু তুই,’
মালিহা খান মেঘের হাতে পুনরায় ধাক্কা দিয়ে বললো, থাক তোর আর খেতে হবে না, এতে হুঁশ ফিরে মেঘের৷
মেঘ কিছু বলার আগেই খাবারের প্লেট সামনে থেকে নিয়ে যান ওনি। বড় আম্মুর এসব কর্মকাণ্ডে আহাম্মক বনে যায় মেঘ।
মালিহা খান বলে উঠেন: এভাবে ১৪ ঘন্টা ভাত নিয়ে বসে থাকলে বি*ষ হয়ে যাবে খাবার।
মেঘেরও খাবার খাওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই আর। সে তো নিজেকে সা*ন্ত্বনা দিতে ব্যস্ত। হাত টা ধৌয়ে রুমের দিকে যাচ্ছে। মালিহা খান মেঘকে ডেকে আবার বললেন তোর কি পেট ভরেছে নাকি নতুন করে খাবার দিব তোকে,
আর খাবো না’ এটুকু বলে রুমে চলে আসে মেঘ । পড়তেও ইচ্ছে করছে না মেয়েটার, চুপচাপ শুয়ে আছে।
চোখ বন্ধ করতেই ভেসে উঠে, ‘আবিরের হাসি, বাইক এনে যখন হাসি মুখে বলছিল কথা গুলো কানে ভেসে আসছে, কি সুন্দর করে কথা বলে মানুষ টা, তাকানোর ধরন, রাগলে কুঁচকে ফেলা ঘন ভ্রু দুলো সবই যেনো চোখের সামনে ভাসছে মেঘের। ‘
সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলে মেঘ, বুক ভে*ঙে আসে কষ্টে৷ এই লোক আমার ভাবনায় কেনো আসছে বার বার, এই লোক তো অন্য কারো৷ এই বলে অভিমানে ঘুমিয়ে পরে মেঘ।
★★★
আজ শুক্রবার সকালে থেকে বাড়িতে হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। মীম, আদি আর মেঘ দুষ্টামি, আড্ডায় মাতিয়ে তুলেছে ড্রয়িংরুম।
তিন ঝা রান্নায় ব্যস্ত। আবির বাড়ি ফিরেছে বলে আবিরের দুই মামা, দুই খালা তাদের বাচ্চারা সবাই দেখতে আসবে, মীম আর মেঘের মামা,খালাদের বাড়ি থেকেও বেড়াতে আসবে মানুষ। বেশিরভাগ মানুষ ই চাকরিজীবী যার ফলে শুক্রবার ছাড়া কারও সময় নেই। ইকবাল খান ব্যস্ত বাজার করা নিয়ে৷ যখন যা লাগছে ওনি ছুটছেন আনার জন্য।
তানভিরের সকাল থেকে কোনো খোঁজ নেই, সকালে নাস্তা করে বেরিয়েছে, পার্টি অফিসে কাজ আছে, বিকালে ফিরবে বলে চলে গেছে। এজন্য মেঘের কোনো ভয় ডর নেই। আপন মনে আড্ডায় মগ্ন মেয়েটা।
হঠাৎ উপরে করিডোর থেকে আবির ডাক দিলো মাকে, ‘আম্মু একটু কফি দিতে পারবে’
এই বলে রুমে চলে গেলো পুনরায়,
“উত্তর শুনারও প্রয়োজন মনে করে নি সে । ”
মালিহা খান কফি করে মেঘকে ডাক দিলেন, ‘কফি টা আবিরকে দিয়ে আয় তো মা!’
তৎক্ষনাৎ মেঘের মনে পরে গেলো গতরাতে কথা, সহসা বলে উঠলো, আমি কেনো মীম দিয়ে আসুক৷
মালিহা খান কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললো, ওরা নিলে ফেলে দিবে, তখন আরেক মুসিবতে পড়বো, বাড়িতে একটু পর মেহমান আসবে যা না মা।
মেঘ আর কথা না বাড়িয়ে ধীর পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আবিরের দরজা পর্যন্ত আসলো। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে মেঘের, বুকের ভেতরের ধুকপুক টা বেড়ে যাচ্ছে , হাত- পা কাঁপছে। আস্তে আস্তে দরজায় টুকা দিলো মেঘ
আবির: দরজা খুলা আছে
কাঁ*পা কাঁ*পা হাতে দরজা ধাক্কা দিলো মেঘ।
আবির ল্যাপটপে কি যেনো করছে। তাকিয়েও দেখলো না কে এসেছে।
আবির: এখানে রেখে যা
মেঘ হাঁটতে পারছে না, হাত আরও বেশি কাঁপছে এখন, পায়ে একটুকু জোর পাচ্ছে না। ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আগের জায়গায়
আবির ল্যাপটপ টেবিলে রেখে মেঘের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, হাত থেকে কফির কাপ টা নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে রাখে, মেঘের সেদিকে কোনো মনোযোগ নেই, তার মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরন ছুটছে এদিক সেদিক। বডিস্প্রের তীব্র ঘ্রাণে হুঁশে ফেরে মেঘ, তার থেকে এক ফুটের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে আবির,
আচমকা এইভাবে এসে দাঁড়ানোয় একটু ভ্যাবাচেকা খেলো মেয়েটা। মেঘ ত্রস্ত ঘুরে গেলো নিজের উপর জোর খাটিশে পা বাড়ায় দরজার দিকে।
সবেগে,সুদূর হস্তে মেঘের কনুই চেপে ধরলো আবির, কড়া কন্ঠে বললো,
‘এদিকে তাকা’
অনিচ্ছা স্বত্তেও ঘুরে দাঁড়ালো মেঘ। চিবুক নেমে গলায় আটকালো, সারা শরীর কাঁপছে, শীতল স্বরের হুমকিতে কানের লতি গরম হয়ে যাচ্ছে সাথে আবিরের শরীরের আর বডিস্প্রের তীব্র গন্ধ নাকে লাগছে মেঘের।
আবির পুরু কন্ঠে বলল, ‘কফিটা টেবিলে দিয়ে আসতে বলেছিলাম কথা কানে যায় না?’
এতটুকু বলতেই মেঘ হেলেদুলে পড়ে যেতে নেয়,
টালমাটাল মেয়েটার বাহু ধরে সোজা দাঁড় করিয়ে দিলো আবির, জ্ঞান হারাতে হারাতেও যেন হারায় নি মেঘ,
আবিরের চাউনীতে তীক্ষ্ণতা গম্ভীর কন্ঠে বললো, ‘তুই কি পুষ্টিহীনতায় ভুগছিস? অবশ্য ভুগবি নাই বা কেন, খাবার প্লেটে আঙুল ঘুরালে কি আর শরীরে পুষ্টি হবে!’
প্রথমে গম্ভীর কন্ঠে বললেও শেষটা যেনো মজার ছলেই বললো।।
মেঘের শরীর ঘামছে, কে বুঝাবে এই লোকটাকে, যাকে দেখলে অষ্টাদশীর সব শক্তি নিমিষেই মিলিয়ে যায় কোথায় যেন, যার দৃষ্টি কেঁ*ড়ে নেয় তার সমস্ত ধ্যান-জ্যান,মনোনিবেশ।
আবির সাবলীল ভঙ্গিতে বলে উঠলো, ‘যেতে পারবি নাকি দিয়ে আসবো?’
নিজেকে সামলে মেঘ বললো,’পারবো৷ তারপর গুটিগুটি পায়ে রুম থেকে বের হয়ে যায় মেঘ!’
আবির তাকিয়ে আছে অষ্টাদশীর হাঁটার পানে।
মেঘ কোনোরকমে নিজের রুম পর্যন্ত এসেছে,এক দৌড়ে এসে খাটে শুয়েছে, মন মস্তিষ্ক অস্বাভাবিকভাবে লাফালাফি করছে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খোঁজে পেলো না। সেন্স হারিয়ে পরে আছে বিছানায়।
★★★
১১ টার পর থেকে মেহমান আসা শুরু হয়েছে। বাড়িঘর ভরে গেছে আত্মীয় স্বজনে। মীম, আদি গোসল করে সেজেগুজে গল্প করছে সবার সাথে, আবির একেবারে নামাজের সময় ঘর থেকে বের হয়েছে। টুপি, পাঞ্জাবি পড়ায় অন্যান্য দিনের থেকেও অনেক সুন্দর লাগছে ছেলেটাকে।
সবাইকে সালাম দিয়ে টুকটাক কথা বলে মামাদের সাথে বেরিয়ে যায় নামাজ পরতে।।
মেঘের দেহ এখনও বিছানায় লেপ্টে আছে। বোনকে খোঁজতে মীম উপরে গিয়ে দেখে মেঘ ঘুমাচ্ছে। ডাকতে ডাকতে মেঘের ঘুম ভাঙে,
মীম: আপু, ও আপু উঠো। এখন ঘুমাচ্ছো কেনো? বাড়িতে মেহমান চলে আসছে। আজান পরে গেছে অনেকক্ষণ আগে উঠো, নামাজ পরে রেডি হও আম্মু আমায় পাঠাইছে তোমায় ডাকছে।
কিছুক্ষণ পর মেঘের জ্ঞান ফেরে, পাশের দেয়ালে টানানো দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায় ১.১৫ বাজে। তৎক্ষনাৎ শুয়া থেকে উঠে বসে। আবিরকে কফি দিতে গেছিলো ৮.৩০-৯ টার মধ্যে। ৪ ঘন্টার উপরে তার জ্ঞান ছিল না। ৫ মিনিট বসে তারপর গোসলে চলে যায়।
নামাজ পরে আবিরের দেয়া একটা জামা পরে নিলো মেঘ, বেগুনি রঙের গাউন, মোটামুটি গর্জিয়াস । চুল গুলো খোঁপা করে নিলো, এত লম্বা চুল ছেড়ে রাখলে কিছুই করতে পারবে না সে। মুখে হালকা ফেসপাউডার দিয়ে, গোলাপি রঙের লিপস্টিক দিলো হালকা করে।
রুম থেকে বের হলো প্রায় ৩ টার দিকে। মামা খালারা সবাই খেতে বসেছে৷ ছোটদের খাওয়া শেষ। রুম থেকে বের হয়ে করিডোর দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করছে সে। বাড়িতে এত হৈ-হুল্লোড়ের শব্দে মাথা ধরে ফেলছে মেঘের।
নজর পরে সোফার দিকে, আবিরকে ঘেরাও করে বসে আছে সব মামালো খালাতো ভাই বোনরা, তারমধ্যে একজনের দিকে নজর পরে স্পেশাল একজন, মালা আপুর দিকে, মালা আপু অনার্স ৩য় বর্ষে পড়তেছে এখন, আবির ভাইয়ার মামাতো বোন, মালা আপুর একটা বড় আপুও আছে ওনি মাইশা৷ ওনার পড়াশোনা শেষ, জব করতেছেন এখন। দুই বোন ই এসেছেন। কিন্তু মালা আপুর দৃষ্টি কেমন জানি, আবির ভাইয়ার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেনো চোখ দিয়েই গিলে খাবে আবির ভাই কে। বিষয়টা দেখেই মেঘের মেজাজ গরম হয়ে গেছে
তৎক্ষনাৎ মনে পরে গেলো রাতের কথা, তানভির ভাইয়া তে বলেছিল আবির ভাই এর জীবনে কেউ আছে। মালা আপুই কি সেই কেউ টা। ভাবতেই বুক ভরে উঠে কষ্টে।
আবিরের সমবয়সী একটা ভাইয়া আছে নাম সাকিব।। ওনি আবির ভাইয়ার দ্বিতীয় বেস্ট ফ্রেন্ড বলা চলে। আরও কয়েকটা ছোট ভাই আবির ভাইকে এটা সেটা অনেক কথা জিজ্ঞেস করছে, বিদেশে কেমন লাগে, পড়াশোনা কেমন, কিভাবে থাকতে হয় এসবই।
মেঘ ধীরস্থির পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে, আবির এক পলক তাকায় সেদিকে পুনরায় ভাইদের কথায় মনোযোগ দেয়।
মেঘকে দেখে ২-৪ জন ডাক শুরু করে, এই মেঘ কেমন আছিস, এদিকে আয়।
মীম ছুটে আসে মেঘের দিকে, ‘আপু তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে মাশাআল্লাহ নজর না লাগে কারো!’
মেঘ মুচকি হাসলো
মীম মেঘকে টেনে নিয়ে সোফায় বসালো, সবার সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ দৃষ্টি পরে আবির ভাইয়ার দিকে, উপর থেকে সে শুধু মালা আপুর নজর টায় দেখেছে। এখন সে আবিরকে দেখছে, নীল পাঞ্জাবি, সাদা প্যান্ট, মাথায় টুপি আহা কত মায়াবী লাগছে । আবিরের হাস্যোজ্জল মুখটা দেখে প্রেমে পরে গেছে মেঘ। যত্রতত্র দৃষ্টি সরিয়ে বাকিদের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হলো।
বড়দের খাওয়া শেষ। মেঘ উঠে সবাইলে সালাম দিয়ে খুশগল্প করতে লাগে, খালামনি দের অনেক দিন পর দেখছে। আগে বিয়েতে গেলে টুকটাক দেখা হতো কিন্তু তানভিরের অত্যাচারে মেয়েটা বিয়ে বাড়িতে যাওয়া ছেড়ে দিছে তাই মামি আর খালাদের সাথে দেখায় হয় না। মামা অবশ্য মাঝে মাঝে দেখতে আসে, এটা সেটা নিয়ে আসে।
সারাদিনের ঘুরাঘুরি শেষে সবাই নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। থাকার জন্য বলেছে সবাই কিন্তু চাকরিজীবীদের কাছে বেড়ানো মানেই কয়েক ঘন্টা ।
বিদায় বেলায় মালা আপুর আচরণে মাথায় রক্ত উঠে যায় মেঘের, ভালো করে বললেই হয় বেড়াতে যাবেন’ গায়ে ঢলে পরার কি আছে আশ্চর্য, মালার এরকম আচরণে আবির ভাই তৎক্ষনাৎ সরে না গেলে তো উপরে পরে যেতো এই মেয়ে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মেঘ নিজের রুমে চলে যায়।
মেহমানদের বিদায় দিয়ে আবিরও বাইক নিয়ে বেরিয়ে পরে কোথায় যেনো।মাঝখানে তানভির একবার এসেছিল সবার সাথে দেখা করে আবার বেরিয়ে গেছে। পার্টি অফিসে কি নিয়ে ঝামেলা চলছে তাই বসার সময় হয় নি তার।
মেঘ নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে কাঁদতে লাগলো৷ কিন্তু কেনো কাঁদছে সে নিজেও জানে না । অতিরিক্ত রাগে কান্না আসে মেয়েটার।
চলবে……..
পর্ব-৬
মেঘ বরাবর ই খুব অভিমানি। অল্পতেই কান্না করে দেয়।। রাত ১০ টা বেজে গেছে এখনও মুখ ফুলিয়ে রুমে বসে আছে মেয়েটা৷ সারাদিন খাওয়া নেই।
তড়িঘড়ি করে তানভির বাড়িতে ঢুকে৷ এসেই মাকে জিজ্ঞেস করে, “মেঘ খেয়েছে?”
হালিমা খান সহসা উত্তর দিলেন, ” সন্ধ্যার পর থেকে এত ডাকছি দরজায় তো খোলছে না।”
তানভির আর কথা বাড়ালো না তড়িৎগতিতে ছুটে গেলো বোনের দরজার সামনে, প্রথমে আস্তে করে ডাকলো৷ মেঘের সারা নেই, আচমকা চোয়াল শক্ত করে একপ্রকার চিৎকার দিলো,
‘মেঘ তুই এই মুহুর্তে দরজা না খুললে তোর কপালে শ*নি আছে বলে দিলাম।’
মেঘ শুয়া থেকে এক লাফে উঠে বসলো। কয়েক সেকেন্ডে দৌড়ে গিয়ে দরজা টা খুললো। চোখ তুলে তাকানোর সাহস নেই ভাইয়ের দিকে। আজ পর্যন্ত তানভির মেঘের গায়ে হাত তুলে নি শুধু ধ*মক ই দেয়৷
কিন্তু ভাইকে এক বিন্দু বিশ্বাস করে না মেঘ। কখন আবির ভাইয়ের মতো নাক মুখে মারবে থা*প্পড় বিশ্বাস নেই।
দরজা খুলতেই নরম স্বরে তানভির বললো, ‘খেতে যা’
“মেঘ তানভিরের এত নরম স্বর কোনোদিন শুনে নি,ভাবতেই পারছে ভাইয়া তাকে এত ভালোবেসে খেতে বলছে।”
তানভির: খাওয়া শেষ হলে তোর ফোন টা দিস, তোকে একটা ফেসবুক আইডি খুলে দিব।
তানভিরের এমন কথায় মেঘ আহাম্মক বনে গেলো । তানভির ভাই বরাবর ই এরকম। নিজেই ঝাড়বে তারপর নিজেই আদর করবে, এটা সেটা কিনে আনবে মেঘের জন্য। কিন্তু আজকের বিষয় টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এত নরম স্বর কখনো শুনেনি এর আগে।
নিমিষেই মনটা খুশিতে ভরে গেলো মেঘের।
খাবার টেবিলে বসে আপন মনে খাচ্ছে মেঘ, আজকে তার পছন্দের অনেক রেসিপি আছে, একটু একটু করে সব চেক করছে। কিন্তু রাগে ফুঁসফুস করছে মেঘের আম্মু হালিমা খান।
হালিমা খান: “সন্ধ্যা থেকে যে তোকে এতবার ডাকতে গেলাম বের হলি না কেন? ঠিক ই ভাইয়ের ভয়ে বের হয়ে আসলি। আমাকে কেনো কষ্ট দেস। তোকে কে কি বলে দুই দিন পর পর না খেয়ে পরে থাকিস। কিছুদিন পরে যে এডমিশন৷ না খেলে পড়বি কিভাবে, আর না পড়লে ভর্তি হবি কিভাবে।
তুই ও তোর ভাইয়ের মতো হচ্ছিস, সে সারাদিন ভন্ডের মতো টুইটুই করে ঘুরে আর তুই ও এখন তার ভাব নিচ্ছিস। খেয়ে না খেয়ে রুমে পরে থাকিস।
আর শুন মেয়ে মানুষের এত রাগ জেদ ভালো না, তোর এই রাগ জেদ সামলানোর জন্য আমরা সারাজীবন তোর পাশে থাকবো না । ”
এতটুকু বলতেই চোখ পরে ড্রয়িং রুমে দাঁড়ানো আবিরের দিকে।
আবিরের চাউনিতে পরিষ্কার রু*ষ্টতা, শ্যামবর্ণের মুখমন্ডল কালো দেখাচ্ছে, ক*ড়া কন্ঠে মামনির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
“কি হয়েছে?”
পুরুষালি কন্ঠে আঁতকে উঠে মেঘ।
হালিমা খান গলা নামিয়ে উত্তর দিলো, “খায় না ঠিক মতো, পড়াশোনা করে না কি করবো ওকে নিয়ে”
আবির পূর্বের অভিব্যক্তি বজায় রেখে উত্তর দিলো,
“ওকে কিছু বলো না, কাল থেকে মেঘ টাইম টু টাইম খাবে, একটু এদিক সেদিক হলে সেটা আমি দেখবো।”
আবিরের কথায় খুশি হয়ে গেলো হালিমা খান।।
কিন্তু মেঘ খুশি হবে নাকি ভয় পাবে তা বুঝে উঠতে পারলো না৷ এতবছরে অভিমান করে মাঝে মাঝে না খেয়ে থাকলে তানভির এসে ধমকে বা বুঝিয়ে খাওয়াতো এখন সেই দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে আরও একজন। ২ জন মিলে মেঘ কে শাসন করবে ভাবতেই মেঘের বুক কেঁপে উঠে আবার মনের মধ্যে অন্য রকম প্রশান্তিও কাজ করে মেঘের।। আবির ভাই এর মূল্যবান সময়ের মধ্যে ৫ মিনিট সময় যে মেঘ কে নিয়ে ভাববে এতেই খুশি খুশি লাগছে মেঘের।
তৎক্ষণাৎ মনে হয়ে গেলো তানভির ভাইয়া বলেছে ফেসবুক আইডি খুলে দিবে, তাড়াতাড়ি খেয়ে রুমের দিকে ছুটলো মেঘ৷
রুম থেকে ফোন নিয়ে ছুটে গেলো তানভির ভাইয়ার রুমে কিন্তু তানভির ভাইয়া রুমে নেই।। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো কিন্তু কোথাও নেই।
মোবাইল নিয়ে নিজের রুমে ঢুকতে যাবে হঠাৎ শুনতে পেলো তানভিরের কন্ঠ। কিন্তু কোথায় আছে
বাধ্য হয়ে মেঘ জোরে ডাক দিলো, “ভাইয়া!”
তানভির পাশের রুম থেকে উত্তর দিলো, “আবির ভাইয়ার রুমে আমি, আয়।”
আবির ভাই নাম টা শুনেই মেঘের বুকটা হুহু করে উঠে চিন্তায়, নিজেকে নিজে সাহস দেয়ার চেষ্টা করলো । তারপর গুটিগুটি পায়ে হেঁটে দরজায় দাঁড়ালো।
তানভির: ভেতরে আয়
মেঘ: মেবাইল টা দিয়ে যায়, তুমি কাজ করো।
তানভির: আরে ভেতরে আয়। বস তুই, তোকেও দরকার লাগবে।
মেঘ আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খাটের কর্ণারে বসলো।
আবির নেই রুমে, ওয়াশরুমে আছে মনে হয়৷
তানভির ফোন নিয়ে কি যেনো করছে, তখন ই ওয়াশরুম থেকে বের হলো আবির
মেঘের দৃষ্টি পরে সেদিকে,
একটা ছাই রঙের টিশার্ট আর একটা ব্ল্যাক টাওজার, ভেজা চুল গুলো থেকে টপটপ করে পানি পরছে। শরীরের টিশার্ট টা অনেকটায় ভিজে গেছে।৷
মেঘ টেনে হিঁচড়ে দৃষ্টি নামিয়ে আনলো, মনে মনে ভাবছে,
একটা মানুষ এত কিউট কিভাবে হয়,যদি পারতাম আমার পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখতাম, সারাদিন পড়তাম আর দেখতাম। তাহলে আমার মন কখনোই খারাপ হতো না!লোকটা ফর্সা নন, শ্যামলা গায়ের রঙ কিন্তু দেখতে মারা*ত্মক সুন্দর। সবচেয়ে মারা*ত্মক ওনার লুক, তাকানোর স্টাইল।
উফ,যতবার দেখছি ততবার ই নতুন করে ক্রাশ খাচ্ছি!
আবির ভাই খাটের অপর পাশে মোবাইল হাতে নিয়ে বসেছেন।
তানভির ভাইয়া মোবাইলে ফেসবুক অপশনে ক্রিয়েট নিউ একাউন্ট এ ঢুকতেই তানভির ভাইয়ার ফোনে কল আসে। দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করে কথা বলা শুরু করে। ওমনি মেঘের মেবাইলটা আবিরের হাতে দিয়ে বলে ভাইয়া তুমি ওরে একাউন্ট টা খুলে দাও আমার গুরুত্বপূর্ণ কল আসছে। এই বলে মোবাইল রেখে রুম থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন।
মেঘ বসে আছে চুপচাপ, মুখ তুলে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না। বুকটা এখনও ধুকপুক করছে।
আবির মেঘের মোবাইলে নিজের মতো করে ফেসবুক একাউন্ট খুলছে, জন্মতারিখ, সাল,নাম কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করছে না ওনি। সবকাজ শেষ করে ফোনটা এগিয়ে দিলেন মেঘের দিকে৷
তখনি রুমে ঢুকলো তানভির।
সহসা বলে উঠলো, শেষ?
এই বলে ফোন টা নিজের হাতে নিলো।।
ফেসবুকে ঢুকে তানভিরের আইডি টা খোঁজে রিকুয়েষ্ট পাঠালো,
আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো, ” ভাইয়া তোমাকে রিকুয়েষ্ট দেয়, এক্সেপ্ট করো নাকি!”
আবির গম্ভীর কন্ঠে বললো, “আমায় রিকুয়েষ্ট দিতে হবে না। ”
তানভির কথায় পাত্তা না দিয়ে কয়েক সেকেন্ড পর বললো, “ভাইয়া তোমায় রিকুয়েষ্ট পাঠিয়েছি। Accept করে নিও৷ না হলে আমার ছোট্ট বোনটা কষ্ট পাবে।”
আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তানভিরের দিকে।
মেঘ মনে মনে খুশিই হলো ভাইয়ের কথায়, মেঘের তো কখনো সাহস ই হতো না আবির ভাই কে রিকু*য়েষ্ট দেয়ার বা এক্সে*প্ট করার কথা বলার।
তানভির সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে, মেঘের হাতে ফোন দিয়ে বললো, তুই এখন যা, আমি আর ভাইয়া এক্সেপ্ট করে নিবো। তুই কি করিস না করিস সব নজরে রাখবো কিন্তু।
মেঘ কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করেই রুমে চলে আসলো মোবাইল নিয়ে।
মেঘ রুমে এসে বিছানায় শুয়ে ফেসবুকে ঢুকতেই নজরে পরলো,
‘Sazzadul Khan Abir’ Accept your friend request.
মেঘ শুয়া থেকে উঠে বসে, মেঘের খুশি দেখে কে, Friendlist এ একমাত্র ফ্রেন্ড সেটায় আবির ভাই। তার একটা স্ক্রিনশট রেখে দিল মেঘ।
তার ৫ মিনিট পর এক্সে*প্ট করলো তানভির ভাই।
আবির ভাইয়ার আইডিতে ঢুকলো, প্রোফাইল পিকটা নতুন কেনা বাইকে বসা, “একদম ওয়াও।”
কভার ফটো সবুজ ঘাসের মাঝে বাইক টা রাখা তার সামনে বাইকে হেলান দিয়ে বসা আবির ভাই, ছবিটা “ওহ মাই গড, ওয়াও!”
সবগুলো ছবি দেখে দেখে ডাউনলোড করছে মেঘ। যত দেখছে ততই পাগ*ল হয়ে যাচ্ছে মেয়ে টা।মনে হয় পাবনা যেতে বেশিদিন লাগবে না। তারপর মোবাইল রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করলো, চোখ বন্ধ করতেই চোখের সামনে ভেসে আসছে একটার পর একটা স্টাই*লিশ ছবি। কখন যেনো ঘুমিয়ে পরেছে মেয়েটা।
★★★
আজ শনিবার, আবিরের অফিসে যাওয়ার দিন। সকাল সকাল উঠে শাওয়ার নিয়ে ফিটফাট হয়ে রেডি হয়ে পরেছে আবির। ৭.৩০ বাজে মাত্র ।
নিজের রুম থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে দ্রুত হাঁটছে হঠাৎ মেঘের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে দরজায় ডাক দেয়,
২ বার ডাকতেই ঘুমন্ত মেঘ, ঘুমে টলতে টলতে দরজা খুলে, সামনে দাড়িয়ে আছে আবির ভাই। নিজের চোখকে যেনো বিশ্বাস ই করতে পারছে না, প্রথমে ভেবেছে এটা স্বপ্ন, তারপর এদিক সেদিক তাকিয়ে বুঝলো এটা বাস্তব। আচমকা এইভাবে আবিরকে দাঁড়ানো দেখে ভ্যাবাচেকা খেল মেয়েটা। মেঘের চেহারায় নিদ্রিত ভাবটা লেপ্টে আছে এখনও। আবির পূর্ণ দৃষ্টিতে পরখ করলো অষ্টাদশী রাঙা মুখবিবর তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে বললো,
” ৫ মিনিটের মধ্যে খেতে আয় ”
পুনরায় দ্রুতগতিতে হাঁটা দিলো।
আবিরের অযাচিত উপস্থিতি নাড়িয়ে দিয়েছে মেঘের মস্তিষ্ক। হঠাৎ মনে পরে গেলো ৫ মিনিটে নিচে যেতে হবে। তৎক্ষনাৎ ছুটলো ওয়াশরুমে।৷ ৫ মিনিটের মধ্যে নিচে উপস্থিত হলো মেঘ৷
এই সময় মেঘকে খাবার টেবিলে দেখে অবাক হলো সকলে, ২ বছর যাবৎ মেয়েটা সকালে সবার সাথে খায় না, প্রাইভেট থাকলে আগে খায় না হয় সবাই অফিস বা স্কুলে চলে গেলে তারপর খেয়ে কলেজে যায়।
হালিমা খান ছুটে আসলেন মেয়ের দিকে,” আয় আয় বস মা, কি খাবি বল!”
টেবিলের কাছে আসতেই দেখলো একটা চেয়ার ই ফাঁকা আছে সেটা আবার আবির ভাইয়ের বিপরীতে। কিন্তু এখানে বসার বিন্দু পরিমাণ ইচ্ছে নেই তার। কারণ আবিরের আশেপাশে থাকলে মেঘ কেমন একটা ঘোরে থাকে। মন,মস্তিষ্ক সব যেনো আবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু কিছু করার নেই। বাধ্য হয়ে বসতে হলো এই চেয়ারে।
আবির মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে, মেঘ তখন ঘুমে টলতে টলতে আবির কে দেখেছিল রাজপুত্রের মতো, কিন্তু এখন আর সে তাকাতে পারছে না। শীর্ণ বক্ষ ধরফর করছে মেঘের, মনে মনে খুব করে চাচ্ছে একটু তাকিয়ে আবিরকে দেখতে। কিন্তু মনে হচ্ছে কিছু একটা মাথায় চেপে বসে আছে, মুখ টায় তুলতে পারছে না।
আলী আহমদ খান হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘মেঘ মা আজ থেকে তোমার নতুন টিউটর আসবে। সারাদিন তে তুমি বাহিরে থাকবে তাই তাকে সন্ধ্যার পর আসতে বলেছি। ”
মেঘ চুপচাপ খাবার খাওয়ার চেষ্টা করছে, বুকের ভেতর যে ঝড় তুফান চলছে তা যেনো কেউ বুঝতে না পারে।
আবির সবার আগে খাবার শেষ করে বাসা থেকে বের হয়ে গেলে। আবিরের পেছন পেছন আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান ও ইকবাল খান ও চলে গেলেন।
ইকবাল খান আগেই অফিসে জানিয়ে দিয়েছে অফিস যেনো সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে,
আবির অফিসের সামনে এসে বাইক পার্ক করে অফিসে ঢুকতে গেলে সিকিউ*রিটি গা*র্ড বলে উঠেন, স্যার আপনার একটু বসতে হবে, বড় স্যাররা না আসলে আপনি ভেতরে যেতে পারবেন না।
আবিরের পায়ের র*ক্ত মাথায় উঠে যাচ্ছে। রা*গে কটমট করতে করতে ওয়েটিং রুমে বসে আছে সে।
১০ মিনিটের মধ্যেই অফিসে ঢুকলেন তিন ভাই। আবির তখনও বসেই আছে।
কিছুক্ষণ পর সিকিউ*রিটি গা*র্ড এসে ডাকলেন,
“স্যার আপনাকে ভেতরে যেতে বলেছে!”
আবির নি*র্ভীক ভঙ্গিতে হেটে ভেতরে চলে গেলো।
অফিসের ভেতরে ফুল দিয়ে সাজানো, ঢুকতেই সবাই হাততালি দিয়ে কংগ্রাচুলেশন জানচ্ছে আবিরকে। দুএকজন ছবি তুলায় ব্যস্ত।
বাবা – চাচা তিন জন আর আবির মিলে একটা কেক ও কাটলো। তিন ভাইয়ের তো আজকে খুশির দিন। বংশের বড় ছেলে তাদের কোম্পানির হাল ধরতে যাচ্ছে। এর থেকে বড় পাওয়া আর কি আছে। তানভিরের মতে আবির যদি মুখের উপর বলে দিতো আমি ব্যবসা সামলাবো না তখন তো কিছুই করার ছিল না। আবির যেহেতু মেনে নিয়েছে এতেই হবে।
ঘন্টাখানেক হলো আবির অফিসে এসেছে। এরমধ্যে চাচ্চু ইকবাল খান ভাতিজাকে সব কাজ কর্ম বুঝিয়ে দিতে ব্যস্ত। অন্যদিকে আলী আহমদ খান এবং মোজাম্মেল খান আজ আড্ডায় মগ্ন।। তাদের মাথা থেকে সব চাপ চলে গেছে। দুই ভাই মিলে চা খাচ্ছে, খুনশুটি করছে। এত বছরের ব্যবসায়িক জীবনের অবসানের সময় এসেছে এবার।
সারাদিন আবিরের ব্যস্ততায় কাটে, প্রথম দিনের অফিস, দায়িত্ব বুঝে নেওয়া বিশাল চাপ। মাঝখানে একবার সময় করে বাবা চাচাদের সাথে তুলা একটা ছবি ফেস*বুকে শেয়ার ও করেছিল। ৬ টায় বাসায় ফিরেছে আবির। এসেই সোজা রুমে চলে গেছে, শাওয়ার নিয়ে রেস্ট নিচ্ছে। হয়তো ঘুমিয়ে পরেছিল।দূর স্বপ্নই দেখলো কি না আচমকা উঠে বসলো বিছানায়।
আবিরের চোখে-মুখে উদ্বেগ স্পষ্ট। তড়িঘড়ি করে রুম থেকে বের হয়ে নিচে আসলো।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক, মালিহা খান এবং হালিমা খান কাজে ব্যস্ত। আদির আম্মু আদিকে নিয়ে পড়াতে বসেছেন। মীম ও হয়তো পড়ছে নিজের রুমে । কয়েক মুহুর্ত সোফায় বসে আবার উঠে রান্নাঘরের দিকে গেলো।
হালিমা খানের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, “মেঘ কোথায় মামনি?”
মেঘের টিউটর এসেছে, পড়ার ঘরে পড়াচ্ছে।
আবিরঃ ওহ আচ্ছা। আমায় একটু কফি করে দিতে পারবে?
হালিমা খান: একটু অপেক্ষা করো বাবা এখনি দিচ্ছি।
আবির ছোট বেলা থেকেই নিজের মা মালিহা খানকে আম্মু, তানভিরের আম্মুকে মামনি আর আদির আম্মু কে কাকিয়া ডেকে অভ্যস্ত। এত বছরেও তার ডাকে পূর্বের ন্যায় মিষ্টতা মিশে আছে।
সোফায় বসে কফি খাচ্ছে আর মোবাইল ঘাটাঘাটি করছে। ২০ মিনিট পর পড়ার রুম থেকে বের হলো একটা ছেলে বয়স হয়তো ২২-২৩ হবে। ৫.৭-৮ হবে লম্বা, চোখে চশমা। হালিমা খানকে বললো,
“আন্টি আজ আসি আবার কাল আসবো”
হালিমা খান ও হাসি মুখে বললেন, “আচ্ছা ঠিক আছে।”
এদিকে আবিরের কোমলতা পাল্টে গেলো, চটে গেল ভীষণ, সবেগে ঘু*ষি বসাল সোফার পাশের দেয়ালে, আবিরের চোখ আগুনের মতো লাল হয়ে গেছে। একমুহূর্ত বসলে না, সোজা উঠে ধপধপ করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজের রুমে চলে গেলো।
চলবে……
পেইজ: গল্প কথা (golpokotha70)
অতি*রিক্ত রা*গে আবিরের তামা*টে চেহারা র*ক্তবর্ণ ধারণ করেছে। চক্ষু যুগলে ক্রো*ধ স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে। ৫-৭ মিনিটের মধ্যে ভীষণ তাড়াহুড়োতে তৈরি হয়ে নিচে নামছে আবির৷
মেঘ পড়ার রুম থেকে বই খাতা নিয়ে রুমে উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
হঠাৎ সিঁড়ির নিচে সাইড হয়ে দাঁড়িয়ে পরে সে৷
আবির ভাই হুলস্থুল বাঁধিয়ে নামছে। মেঘ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মান*সিক টা*নাপোড়নে ভুগছে মেয়েটা৷ আবিরের সামনে বা আশেপাশে কোথাও দাঁড়াতে পারে না মেঘ। আবিরকে দেখলেই যেনো খেই হারায় বারবার। হৃ*দয় কেঁ*পে উঠে অষ্টাদশীর। কেমন অস্থি*র অস্থি*র লাগে। যেমন মা*রাত্মক চাওনি, তেমনি মা*রাত্মক তার চলাফেরা ৷
মনে মনে এসব ভেবেই যেনো ঘোরের রাজ্যে চলে যায় মেঘ। আবির পাশ দিয়ে যাওয়াতে আবিরের শরীরের ঝাঁঝালো গন্ধ সাথে তীব্র স্প্রের গ*ন্ধ মস্তি*ষ্ক পর্যন্ত চলে যায়। সহসা ঘোর কাটে মেঘের, সিঁড়িতে আবির ভাই নেই৷
কয়েক কদমে আবির পৌঁছে গেলো মেইন গেইটের কাছে৷
হঠাৎ রান্নাঘর থেকে ‘মালিহা খান’ ডাকলেন,
“এই সময় কোথায় যাচ্ছিস বাবা?”
মেঘপেছন ফিরে তাকায় সেদিকে,
আবির চৌকাঠের বাহিরে পা রাখতে রাখতে ব্যস্ত আর ক্রো*ধিত কন্ঠে উত্তর দিলো,
বাহিরে একটু কাজ আছে৷, ফিরতে রাত হবে।
এক মুহুর্ত ও দাঁড়ায় নি সে। ক্ষি*প্রবেগে হেঁটে চলে যায়।
মেঘ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির নিচে, কিছুই যেনো ঢুকছে না ছোট্ট মস্তিষ্কে। কয়েক মুহুর্ত পরে মেঘ ও যথারীতি বই খাতা নিয়ে রুমে চলে যায়। আজ তার অনেক পড়া৷ আগামীকাল রবিবার কোচিং এ পরীক্ষা , ক্লাস, নতুন টিউশন। সবমিলিয়ে পড়া শিখতে ব্যস্ত হয়ে পরে৷
(golpokotha70)
★★★
রাত ৯ টায় খেতে বসেছেন সবাই। খান বাড়ির খাবার টেবিল টা অনেকটায় লম্বা। টেবিলের একপাশের প্রস্থ বরাবর বসেন ‘আলী আহমদ খান’ খান বাড়ির বড় কর্তা। ওনার বিপরীতে কোন চেয়ার নেই কারণ ওনার মুখোমুখি বসার যোগ্যতা এই বাড়িতে কারোর নেই। একপাশে ৪ টা চেয়ার ইকবাল খান, আদি,তানভির ভাইয়া আর আবির ভাইয়ের চেয়ার একপাশে। আবির ভাই না থাকাকালীন ও চেয়ার সরানো হয় নি। অন্যপাশে তিনটা চেয়ার। মোজাম্মেল খান, মীম আর মেঘের। মেয়ে মানুষ গা ঘেঁ*ষে বসা পছন্দ করে না তাই একটা চেয়ার স্টোর রুমে রেখে ৩ টা চেয়ার দূরে দূরে রেখেছে।
যদিও মেহমান আসলে আরও ৩-৪ টা চেয়ার অনায়াসে ফেলা হয় ফেলা হয় এখানে। এতবছর আবির ভাই না থাকায় মেঘ একেবারে কর্ণারের চেয়ারটাতে বসেছে। আবির ভাই ফেরার পরও তাকে বাধ্য হয়ে এই চেয়ারটাতেই বসতে হয়।
আবির ভাইয়ের মুখোমুখি বসা আর প্রথম বি*শ্বযু*দ্ধে শহী*দ হওয়া দুটায় মেঘের কাছে সমান। রোজ দুবার চোখের সামনে নিজের মস্তি*ষ্কের র*ক্তক্ষ*রণ সহ্য করা, বুকের ভেতর উতালপাতাল ঢেউ সামলানো, সেই ধারা*লো চোখের চাউনী প্রতিবার যেনো পি*স পি*স করে কা*টে অষ্টাদশীর হৃদয়টা।।
এদিকে বোকা মেঘ এখনও অনুধাবন ই করতে পারছে না আবির ভাই কি তার শুধুই ক্রাশ নাকি সে তার প্রেমেও পরেছে।।
আচমকা আলী আহমদ খানের রাশভারি কন্ঠে মেঘের গাঢ় চিন্তার ব্যাঘাত ঘটলো
আলী আহমদ খানঃ আবির কোথায়?
অফিসের কাজ তো সেই সন্ধ্যেবেলায় শেষ তাহলে এত রাতে কোথায় সে?
মালিহা খান তটস্থ ভঙ্গিতে বললেন, ও তো সন্ধ্যায় এসেছিল, রেস্ট নিয়ে কফি খেয়ে তারপর বের হলো!
আলী আহমদ খানঃ ছেলেদের নিষেধ করো রাতবিরেতে ঘুরাঘুরি করতে ।
ইকবাল খান সাবলীল ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “বড় ভাইয়া,তুমি চিন্তা করো না, ছেলেটা এতবছর পর দেশে ফিরেছে । বন্ধুদের তো একটু সময় দিতে হয়।
আলী আহমদ খান চুপচাপ খাওয়া শেষ করলেন উঠার আগ মুহুর্তে মেঘের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শাহরিয়ার কেমন পড়িয়েছেন মা?”
মেঘ নরম স্বরে বললো,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো পড়িয়েছেন । ”
আর কোনো কথা বললেন না উঠে বেসিন থেকে হাত ধৌয়ে নিজের রুমে চলে গেছে। তার কিছুসময় পর বাকি দুই ভাই ও যে যার রুমে চলে গেলো৷ খাবার টেবিলে বসে বসে খাচ্ছে খান বাড়ির তিন বাদ*ড়। মেঘ বড় বা*দর , মীম হলো মেজো বাদ*র, আর আদি হলো সবচেয়ে ছোট বাদ*র। তিনজনে রাজ্যের গল্পে মেতেছে।
হালিমা খান এসে ধমক দিলেন, এই মেঘ, তোর কি এখন বাঁদরামি করার সময়? দুদিন পর পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে, পড়াশোনা বাদ দিয়ে আড্ডায় মজে থাকিস সবসময়৷
মেঘের প্রফুল্ল মুখটা তৎক্ষনাৎ মলিন হয়ে গেলো, কোনো রকমে খাবার শেষ করে রুমে চলে গেলো৷ পড়াশোনায় মনোযোগ দিলো।
পেইজ: গল্প কথা
★★★★
আবির কত রাতে ফিরেছে, সে হদিস কেউ রাখে নি।৷
তানভির ফিরেছে ১১ টায় তখনও হালিমা খান অপেক্ষা করছিলেন৷ তানভির মাকে ঘুমিয়ে যেতে বললেন তারপরও হালিমা খান ১২ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন আবির ফিরে নি তাই বাধ্য হয়ে ঘুমিয়ে পরেছেন।
আবির ফিরেছে রাত ২ টার দিকে। কোনোরকমে ফ্রেশ হয়ে বেলকনিতে পাতা চেয়ারে হেলান দিয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে আছে৷ দৃষ্টি নিবদ্ধ দূরে ঐ চাঁদে কিছুক্ষণ পর পর মেঘে ঢেকে যায় আবারও আলোকিত হয়। আবির কি যেন ভাবে খানিকক্ষণ।
তারপর গম্ভীর কন্ঠে নিজেই নিজেকে শুধালো,
“তুই কি কোনোদিন শুধরাবি না?”
কেটে গেলো আবিরের নির্ঘুম, নিদ্রাহীন রাত।
পেইজ:গল্প কথা (golpokotha70)
★★★★
সকাল ৮ টায় খাবার টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে মীম, মেঘ,আদি, তানভির আর কাকামনি ইকবাল খান। বড় দুই ভাই ভোর সকালেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছেন। মেঘ মীমের সাথে ফিসফিস করে আড্ডায় ব্যস্ত। তানভির যেনো দেখেও না দেখার মতো খাচ্ছে। আগে হলে একটা ধ*মক দিয়ে বলতো, ‘ চুপ থাক ‘ আজ যেনো কিছুই করলেন না। তাই মেঘ আর মীম আপন মনে গল্প করে করে খাচ্ছে।
মেঘের মনোযোগ ভাঙলো কারো চেয়ার টানার শব্দে, মেঘ তৎক্ষণাৎ তাকালো। আবিরের নিখাদ দৃষ্টি মেঘের চোখে নিবদ্ধ । মেঘ এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেললো, বুকের ভেতর ধুকপুকেরর মাত্রা বাড়ছে তারসাথেই নিযুক্ত হলো চি*ন্তার ছাপ।
মাথা নিচু করে মনে মনে বললো, ” আবির ভাইয়া সারারাত ঘুমান নি? ফ্যাকাশে হয়ে আছে মুখটা। কি হয়েছে ওনার! এসব ভেবেই মেঘ আঁতকে উঠছে বার বার, গতকাল সন্ধ্যায় বের হলো চোখ অন্ধকার করে, রাতে কখন ফিরেছেন ওনি? কোথায় ছিলেন সারারাত! ”
এসব চিন্তায় মেঘের উৎফুল্ল মেজাজ টা খারাপ হয়ে গেলো।
মীমের ডাকে স্বাভাবিক হলো মেঘ,৷ মীমের খাওয়া শেষ ওঠে যাচ্ছে। এতক্ষণে তানভির আর ইকবাল খানও খেয়ে চলে গেছেন। খাবার টেবিলে এখন শুধু আদি, আবির আর মেঘ।
মেঘ প্লেটের ভাত গুলো তাড়াতাড়ি শেষ করলো । যেইনা উঠতে যাবে আবির ভাই মেঘের প্লেটে আরও দু চামচ ভাত দিলেন।।
মেঘ ছোট করে চিৎকার দিতে গিয়েও দিলো না, চোখ পড়লো আবিরের দিকে, আবিরের তা*মাটে মুখ টা দেখেই চোখ নামিয়ে নিলো।
আবির প্রখর তপ্ত স্বরে বললো, “এগুলো শেষ করে তারপর উঠবি!”
মেঘ কিছু বলতে গিয়েও থেকে গেলো।
আবির আবারও বলে উঠলো, “তোর নামে সারাক্ষণ শুধু অভিযোগ শুনি, খাস না, খাস না! এখন চুপচাপ খা, একটা কথা বলবি তো এক চামচ ভাত দিব”
মেঘ চিবুক গলায় ঠেকাল অল্প অল্প করে ভাত খাচ্ছে। হঠাৎ আদি উৎফুল্ল মেজাজে বললো,
“মেঘাপু , আমার খাওয়া শেষ, তুমি লাস্ট! হা হা হা”
মেঘের মুখটা আরও ছোট হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ আগেই ৩ ভাই বোন মিলে চ্যালে*ঞ্জ নিয়েছিল যে আগে খেয়ে ফাস্ট হবে তাকে একটা কিটকেট দেওয়া হবে।
মেঘ ই ফাস্ট হতো কিন্তু আচমকা আবির বসাতে মেঘের মনোযোগ ন*ষ্ট হয়ে যায়, খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, তাই মীম ফাস্ট হয়ে গেছে। আদির আগে খাওয়া শেষ করলে তো অন্ততপক্ষে ২য় থাকতো। আবির ভাই এর উপর কিছুটা ক্ষি*প্ত হলো মেঘ৷ সঙ্গে সঙ্গে মনোযোগে বিঘ্ন ঘটলো,
মনে মনে বললো,আবির ভাই কে কি জিজ্ঞেস করবো “কি হয়েছে?”
ততক্ষণে প্লেটের ভাত জোর করে খেয়ে শেষ করেছে।
মেঘের জিজ্ঞাসু নেত্র যুগল আবিরের মুখের পানে,
মেঘের হা*ত -পা কাঁ*পছে । গলা শুকিয়ে আসছে। কি জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল সব এলোমেলো হয়ে গেছে,আবির ভাইকে দেখলে প্রতিবার যেমন বুকের ভেতর কেউ ঢোল বাজিয়ে নৃত্য করে। আজও তার ব্য*তিক্রম হলো না। মুখ দিয়ে টু শব্দ টা বের করতে পারছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। চোখ নামিয়ে গ্লাস টেনে ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানি টা শেষ করলো।
আবিরের এদিকে কোনো মনোযোগ নেই। সে তার খাওয়াতে মগ্ন।
মেঘ বসে থাকতে পারছে না আবির ভাইয়ের সামনে তাই কোনোরকমে কাঁপা কাঁপা পায়ে বেসিনে চলে গেলো। আবির চোখ তুলে এক পলক দেখলো প্লেট টা, খাওয়া শেষ তাই আর কথা বাড়ায় নি।।
হাত ধৌয়ে কোনোরকমে রুমের উদ্দেশ্যে ছুটলো মেঘ। সিঁড়িতে এমন ভাবে ছুটেছে যেনো থামলেই পায়ের শিরশিরে গরিয়ে পরবে নিচে।
Page: golpokotha70
★★★★★
৯.৩০/৪০ বাজে আবির বাসা থেকে বের হচ্ছে । আব্বু আর চাচ্চু সেই সকালে অফিসে চলে গেছেন তাই আবির একটু পরে গেলেও সমস্যা নাই। আবিরের কিছুটা পিছনে মেঘ ও বের হলো। আজ রবিবার কোচিং খোলা৷ মেইন গেইটের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো মেঘ। আবির ভাই বাইক ঘুরাচ্ছে।
মেঘ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে। সেদিন প্রথম এখানেই দেখেছিল আবির ভাইকে। সেই থেকে অষ্টাদশীর ছোট্ট পৃথি*বীটা এলোমেলো হয়ে গেছে। ধ্যা*নে জ্ঞানে শুধুই আবির ভাই।
অষ্টাদশীর খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো বাইকে করে কোচিং যেতে । আজ পর্যন্ত মেঘ বাইকে উঠে নি৷ শুধু মেঘ কেন, মীম আদি কেউ ই উঠে নি। মেঘের খুব ইচ্ছে করে খুলা আকাশের নিচে বাইকে ঘুরবে প্রকৃতির সৌন্দর্য, বাতাস উপভোগ করবে৷
মনে মনে ভাবলো, “আবির ভাই কি আমায় নিয়ে যাবেন?”
হঠাৎ আবিরের কন্ঠ কানে বাজলো,
“মেঘ”
নিজের নামটা আবির ভাইয়ের মুখে শুনে, মনের মধ্যে বসন্তের হাওয়া লেগেছে, মনে হচ্ছে তরোয়াল দিয়ে ফালা ফালা হয়ে গেছে হৃদয় টা। মনের মধ্যে হাজারপ পাখির কল রব, তারা যেনো বলে বেড়াচ্ছে, তোর ক্রাশ তোকে ডাকছে!”
আবিরের গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসলো আবারও,
“ডাকছি তো?”
মেঘ চুপসে গেলো, চোখ নামিয়ে কাঁ*পাকাঁ*পা পায়ে এগিয়ে গেলো আবিরের দিকে, মনে মনে ভাবলো
“আবির ভাই কি সত্যিই আমায় বাইকে করে নিয়ে যাবেন..?”
আবির চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে বললো,
“তুই চুল খোলে ঘুরিস কেন? ”
মেঘ যেন আহাম্মক হয়ে রইলো,
আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বললো,
“আজকের পর থেকে যেনো তোকে বাহিরে কোথাও চুল খোলা না দেখি। যদি আর একদিন তোকে এভাবে দেখি তাহলে এমন থা*প্পড় দিবো তোর গাল থেকে থা*প্পড়ের দাগ এক মাসেও যাবে না। ছোট বেলার মাই*র টা আশা করি ভুলিস নাই!”
এতটুকুন বলেই আবির হেলমেট পরে বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো।
মেঘের মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো, কয়েক মুহুর্ত নিস্তব্ধ হয়ে রইলো। মেঘ নিজের প্রতি নি*স্পৃহায় শ্বাস ফেললো। আবির ফিরে আসার পর থেকে মেঘ উদ্বেলিত, ক্রাশ খাওয়া, প্রেম প্রেম অনুভূতি সবেতে যেনো পানি আরে না না বরফ ঢেলে দিয়ে গেলো আবির ভাই৷ যেই মেঘ আবিরের প্রেমে হা*বুডুবু খাবে ভাবছিল তাকে যেনো গভীর খা*দে চুবিয়ে মা*রলো। মনে পরে গেলো ছোট বেলার আবিরের মা*রের কালো অধ্যায়। ছোটবেলায় আবির ই মে*রেছিল শুধু তাকে। আজ পর্যন্ত মা বাবা এমন কি তানভির এত ধমকায় সেও কোনোদিন মেঘের গায়ে হা*ত তুলে নি। এতবছর পর আবির ভাই ফিরলো। আবির ভাইকে দেখে মেঘ পুরোনো সবকিছু ভুলে নতুন ভাবে আবির ভাইকে নিয়ে ভাবনা শুরু করেছিল সবে মাত্র। সেই ভাবনায় আ*গুন জ্বা*লিয়ে চলে গেলো ব্যাটায়।
আহত চোখে তাকিয়ে রইলো কতক্ষণ আচমকা রক্তজবার ন্যায় ঠোঁটদুটো ভে*ঙে হুহু করে কেঁদে উঠলো মেঘ। এই কা*ন্না কতক্ষণ স্থায়ী হলো তা জানা নেই৷
হঠাৎ বন্যার কলে কিছুটা কেঁপে উঠলো মেঘ। ফোন রিসিভ করতেই বন্যা বললো,
“কিরে কই তুই, আসবি না?”
মেঘ কথা না বলেই কে*টে দেয় কল, মেঘের গাল চুপচুপে ভিজে আছে। তারপর হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ দুটো মুছে গাড়ির দিকে যায়।
বেশ কিছুক্ষণ পর কিছুটা স্বাভাবিক হলো মেঘ। মনে মনে ক্ষু*ব্ধ হলো,গাড়িতে বসে বসে ফুঁসছে রাগে। এসির মধ্যে বসেও যেনো কপালে ঘাম ঝরছে মেয়েটার, রাগে ক্ষো*ভে ওষ্ঠ উল্টালো। মনে মনে স্থির করলো,
আর কখনো আবির ভাইকে নিয়ে ভাববে না। আবির ভাই সত্যি ই হিট*লার তা না হলে আমার মতো নিষ্পাপ মেয়েটাকে শুধু শুধু মা*রার চিন্তা করতে পারে, আমি ওনার কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি । অভিমানি কন্ঠে মনে মনে ভাবলো মেঘ।
এসব ভাবতে ভাবতে কোচিং এ পৌছে গেলো। ক্লাস শুরু হয়ে গেছে ১০ মিনিট আগে। বন্যা জায়গা রেখেছিল তাই বন্যার পাশেই বসলো।
একটা ক্লাস শেষ হওয়ার পর আরেকটা ক্লাসের স্যার আসতে আসতে বন্যা মেঘকে ফিসফিস করে বললো,
“কিরে আসতে এত দেরি হলো কেনো? আর তুই না আমাকে তোর ক্রাশ বয় আবির ভাইয়ের ছবি দেখাবি বলছিলি, কই দেখা।”
মেঘ করুণ দৃষ্টিতে তাকালো বন্যার দিকে তারপর গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলো,
“প্রথমত ওনার জন্য আমার আসতে দেরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত ক্রাশ শব্দ টা মনের মধ্যে চাপা পরে ম*রে গেছে। শুধু শুধু আমার জীবন থেকে তিনটা দিন নষ্ট করলাম৷ এখন থেকে আমি শুধু পড়াশোনা করবো। অন্য কিছু ভাববো না”
মেঘের কথাগুলো বন্যা মনোযোগ দিয়ে শুনলো তারপর স্ব শব্দে হেসে উঠলো বন্যা,
মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বন্যার দিকে,
বন্যা আবার আস্তে আস্তে ধীর কন্ঠে বললো,
আমি সেদিনই বলেছিলাম এসব ক্রাশ টাশ কিছু না, পড়াশোনায় মনোযোগ দে । ঠিক হলো তো আমার কথা।
এরমধ্যে স্যার ক্লাসে আসছেন৷ দুজনেই ক্লাসে মনোযোগ দিলো
পেইজ: গল্প কথা (golpokoth70)
★★★
মেঘ বাসায় ফিরে চুপচাপ নিজের রুমে চলে গেলো, মনটা তার ভীষণ খারাপ। ফ্রেশ নিচে এসে খাবার খেয়ে কোনোদিক না তাকি নিজের রুমে গিয়ে পড়তে বসেছে। সন্ধ্যার পর টিউটর আসবে পড়া মুখস্থ করতে হবে৷ সকালের শা*সন ভুলার চেষ্টায় ম*গ্ন মেয়েটা৷
প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে নিচে আসে মেঘ, ছোট ভাই বোনের সাথে আড্ডা আর খেলায় মগ্ন হয়। কিন্তু আজ তার ব্যতি*ক্রম হলো। দুপুরের পর থেকে একবারের জন্যও নিচে নামলো না মেঘ৷ মীম আর আদি কয়েকবার ডাকতেও গিয়েছিল। দরজা লাগিয়ে পড়ছে মেঘ, আসবে না বলেছে।
সন্ধ্যার পর পর বাড়িতে ফেরে আবির। চোখে মুখে উ*জ্জ্বলতা ফুটে উঠছে। চোখ পরে রান্নাঘরে মা কাকিয়া দের দিকে।৷ কাকিয়াকে ডেকে উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
“কাকিয়া, চিকেন পাকোড়া বানাবে প্লিজ!”
মা কাকিয়া তিনজনই যেনো অবাক চোখে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে। ছেলেটা মুখ ফোটে কিছুই চাই না কখনো, খাওয়া নিয়েও কখনো নাক সিটকায় না। পছন্দের খাবারের নাম ও জানে না কেউ। আজ হঠাৎ নিজে থেকে কিছু খেতে চেয়েছে।
কাকিয়া হাসিমুখে বললো,
তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো আমি রেডি করছি।
আবির স্বাভাবিক ভাবে রুমের দিকে চলে গেলো, করিডোরে যাওয়ার পথে কানে আসলো মেঘের পড়ার শব্দ, অনর্গল পড়ছে মেয়েটা শ্বাসও নিচ্ছে না মনে হচ্ছে৷ আবিরের ঠোঁট বেকিয়ে কিছুটা হাসলো তারপর সবেগে রুমে চলে গেলো৷
আবির বেশ সময় নিয়ে শাওয়ার নিলো, ১০ মিনিট রেস্ট ও নিলো। তারপর কালো টিশার্ট আর টাউজার পরে রুম থেকে বের হয়, একটু সামনে আসতেই চোখ পরলো মেঘের রুমের দরজা খোলা, মেঘ নেই৷
আবির নিজের মতো এসে সোফায় বসলো, ভাইকে দেখে মীম আর আদি আগেই ছুটে পালালো। না হয় এসেই বলবে “পড়াশোনা নাই!”
আবিরকে মালিহা খান কফি দিলেন, আবির কফি খেতে খেতে তানভির কে কল দিলো,
“কই তুই?”
তানভির: আমি তো পার্টি অফিসে ভাইয়া, কোনো দরকার?
আবির: কাজ না থাকলে তাড়াতাড়ি বাসায় আয়।
তানভির ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কিছু হয়েছে ভাইয়া?”
আবির স্ব শব্দে হেসে বললো,
“দূর কিছু হয় নি, চিকেন পাকোড়া বানাচ্ছে কাকিয়া, খেলে তাড়াতাড়ি আয়!”
তানভির: আচ্ছা আসছি৷
কথাগুলো না শুনলেও আবিরের হাসির শব্দ ঠিকই কানে এসেছে পড়ার রুমের বসা অষ্টাদশীর। বুকটা সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠলো, নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো,
“আবির ভাইয়া হাসছেন? ওনি বাসার ফিরেছেন? ”
তৎক্ষনাৎ মনে পরে গেলো সকালের ঘটনা, সাথে সাথে মুখটা কালো করে পড়া রিভিশন দেয়ায় ব্য*স্ত হলো মেঘ।
তানভির ফিরেছে ৫-৭ মিনিট হবে৷ ফ্রেশ হয়ে নিচে এসেছে। এতক্ষণে চিকেন পাকোড়া হাজির হলো সামনে। ফ্রিজ থেকে বের করে কিছু রান্না করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার তা তাদের জানাই আছে। এজন্য ধৈর্য নিয়েই বসে বসে ফোন ঘাঁটছিল আবির।
দুই ভাই আপন মনে গল্প করে পাকোড়া খেতে ব্যস্ত। এদিকে মেঘ অপেক্ষা করছে টিউটরের আসার জন্য। ৪০ মিনিট লেইট । এখনও আসছে না কি করবে বুঝতে পারছে না। পড়ছে কিছুক্ষণ হাবিজাবি ভাবছে আবার পড়ছে।
তানভির হঠাৎ ডাকলো,
“মেঘ, এদিকে আয়!”
মেঘ ভাইয়ের ডাক শুনেই কিছুটা কেঁপে উঠলো, তারপর পড়ার রুমের দরজায় দাঁড়ালো, হালকা গোলাপি রঙের জামা পরেছে, মাথায় ওড়না দেয়া। পেট পিঠ সবটায় ওড়না দিয়ে ঢাকা,অনেক স্নিগ্ধ লাগছে মেঘকে।।
আবির তখনও স্ব শব্দে হাসছে। তানভির ভাইয়া আর আবির ভাই নিজেদের মধ্যে মসকরায় ব্যস্ত।।মেঘ দরজায় দাঁড়িয়ে আবির ভাইয়ের হাসিতে ম*গ্ন। তিনদিনেও এই মানুষটাকে এতটা প্রফুল্ল দেখেনি সে৷ বরাবরই যেনো গম্ভীর । সেই বাইক কেনার দিন একটু হেসে হেসে কথা বলার চেষ্টা করেছিল সেই হাসিতেই ক্রাশ খেয়েছিল মেঘ। আজকের হাসি ঘা*য়েল করে দিলো মেঘকে। চোখ সরাতে চেয়েও সরাতে পারছে না।
আবিরের চোখ পরে দূরে দরজায় দাঁড়ানো মেঘের দিকে, কয়েক সেকেন্ড পরেই হাসি থাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো আবির৷
তানভির তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো, “মেঘ পাকোড়া খাবি? আয় খেয়ে যা!”
মেঘ যেনো বড় সড় টাশকি খেলো,
“ভাইয়া তাকে খাবার খেতে ডাকছে, এতগুলো বছরে এরকম ঘটনা তার সাথে কখনো ঘটেনি! ”
তানভির আবার ডাকলো,
‘আয় খেয়ে যা, পরে পড়তে বসবি নে’
মেঘ দু পা এগুলো কি যেনো ভেবে ঠায় দাঁড়িয়ে পরলো,
কিছুটা অভিমানি কন্ঠে উত্তর দিলো, “তোমরা খাও, আমি খাবো না!”
আবারও পড়ার রুমে চলে গেলো মেঘ। তানভির আর আবিরও আর বেশি কথা বললো না। খাওয়া শেষ করে আবির নিজের রুমে গেলো, তানভির পুনরায় পার্টি অফিসে ছুটলো, মিটিং আছে তার৷ ভাই ডেকেছে বিধায় মিটিং রেখে ছুটে এসেছিল সে।
মেঘ টিউটরের জন্য অপেক্ষা করলো আরও ৩০ মিনিট। পড়তে পড়তে খিদা পেয়েছে তার।
মাত্র খাবার হয়েছে ৮ টাও বাজে নি। মেঘ খেতে বসেছে। বার বার তাকাচ্ছে দরজার দিকে, টিউটর আসলে পড়তে বসতে হবে।।
খাওয়া শেষ হলো কিন্তু টিউটর আসলো না। তাই মেঘ বই খাতা নিয়ে উপরে যাচ্ছে আর আম্মুকে বলে গেলো, টিউটর আসলে ঢেকে দিতে।
রাত ৯ টায় খেতে বসলেন সবাই। তানভিরও মিটিং শেষ করে বাসায় এসেছে। খাবার টেবিলে সবাই থাকলেও মেঘের কোনে হদিশ নেই৷
তানভির কাকিয়া কে জিজ্ঞেস করলো,
“মেঘ খাবে না?”
কাকিয়া স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো,” ও তো সন্ধ্যা বেলায় খেয়ে উপরে চলে গেছে, বললো খিদে পেয়েছে’
তেমন কথা নেই কারো মুখে, আবির কোনোরকমে অল্প খেয়ে রুমে চলে গেলো, গতরাতে ঘুমায় নি ছেলেটা। সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুম পাচ্ছে খুব। তাই রুমে গিয়ে শুয়ে পরেছে।
এদিকে মেঘ পড়ছে আর ক্ষ*ণে ক্ষ*ণে ঠোঁট উল্টে কান্না করছে। আবারও নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। যেভাবেই হোক চান্স পেতে হবে। অভিমানি স্বরে বলছে, দূরের ভার্সিটি হলে ভালোই হবে৷ এই বাড়ি থেকে চলে যাবো অনেক দূরে। ভাইয়া৷ আবির ভাই আমায় পাবেই না বক*বে কিভাবে আর মা*রবে কিভাবে? তৎক্ষনাৎ মায়ের কথা ভেঙে কা*ন্না করে দেয়। মাকে ছাড়া থাকবে কিভাবে সে!”
চলবে……..
(০৮) (scsalma90)
“মানুষের মন কখনো ক্লান্ত হয় না।”
এই স্লোগান দিতে দিতে নিজেকে শক্ত করলো মেঘ।
আজকে সে ফজরের আজানের সময় উঠেছে৷ রাতে এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছিল। দিন যত যাচ্ছে পরীক্ষা তত কাছে আসছে। যেভাবেই হোক চান্স পেতে হবে। প্রথম টার্গেট মেডিকেল, দ্বিতীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এজন্য সবই পড়তে হচ্ছে তাকে।
নামাজ পড়ে, পড়তে বসেছে মেঘ। ৭-৭.৩০ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। সকালে খালি পেটে বেশিক্ষণ থাকা কষ্টকর তাছাড়া পড়াশোনা করলে আরও বেশি খুদা পাই। গতকাল সন্ধ্যায় খেয়েছিল সারারাত কিছু খাই নি৷ খিদায় চু চু করছে পেট। দৌড়ে নিচে গেলো মেঘ।
মেঘের দৌড় দেখে ভয় পেয়ে গেলেন হালিমা খান, ওনিও রান্নাঘর থেকে ছুটলেন।
হালিমা খান চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হয়ছে তোর, এভাবে ছুটছিস কেন?”
মেঘ জবাব দিল,
“আমার খুব খুদা পাইছে আম্মু, তাড়াতাড়ি খেতে দাও।”
হালিমা খান আবারও জিজ্ঞেস করলেন,
“তুই কখন উঠেছিস?”
মেঘের শান্ত জবাব,
“ফজরের সময় উঠেছি তারপর পড়াশোনা করেছি। তাড়াতাড়ি খেতে দাও আমায়।”
হালিমা খান যেনো খুশিতে গদগদ হয়ে গেলেন। ওনার মেয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিচ্ছেন সাথে খাওয়া দাওয়াতেও। এ তো প্রতিটা মায়ের ই প্রধান স্বপ্ন। ওনি ছুটে গেলেন রান্নাঘরে। মেয়ের পছন্দের সব খাবার হাজির করলেন মেয়ের সামনে।
মেঘ খুদার তাড়নায় ঝটপট খাবার শেষ করে নিজের রুমে চলে গেলো৷ আজকে তার কোচিং, প্রাইভেট কিছু নেই। সন্ধ্যায় শুধু শাহরিয়ার ভাইয়া পড়াতে আসবেন। সারাদিনের একটা রুটিন করে নিলো মেঘ। টার্গেট সেট করে পড়াশোনা করলে পড়াশোনা তাড়াতাড়ি এগোয়৷
এদিকে ৮ টার পর বাড়ির সবাই খেতে বসেছে। আবির একেবারে রেডি হয়ে নেমেছে। চেয়ার টেনে বসতে বসতে নজর পরে, সামনের চেয়ার টা ফাঁকা। নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে, কয়েক সেকেন্ডে স্বাভাবিক হয়ে খাওয়া শুরু করে।
ইকবাল খান জিজ্ঞেস করলেন,
“মেঘ কোথায়, উঠেনি এখনও? ”
হালিমা খান প্রফুল্ল মেজাজে উত্তর দিলেন,
“ও নাকি সেই ভোর বেলা উঠেছে। পড়তে পড়তে খুদা লাগছিল তাই কিছুক্ষণ আগেই খেয়ে গেলো। ”
আলী আহমদ খান শীতল কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
“শাহরিয়ার কি গতকাল এসেছিল?”
হালিমা খান পুনরায় উত্তর দিলেন,
“গতকাল আসে নি ভাইজান, মেঘ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছে। ”
আলী আহমদ খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
“হয়তো কোনো সমস্যা, আজ আসবে নিশ্চয়ই।”
কেউ আর কোনো কথা বলল না, চুপচাপ খাওয়াতে ব্যস্ত সকলে।
কিছুক্ষণ পর খাওয়া শেষে উঠে চলে গেলেন বাড়ির কর্তারা, বসে আছে চার ভাই বোন। মীম আর আদি খুনসুটি করে খাওয়াতে ব্যস্ত।
তানভির হঠাৎ আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ভাইয়া তোমার কি কিছু হয়েছে?”
আবির নড়েচড়ে বসলো, মুখ গোমড়া করে উত্তর দিলো, “কিছু হয় নি।”
তানভির আর কথা বাড়ায় নি চুপচাপ নিজের খাওয়া শেষ করলো।নিজের খাবার শেষ করে, ফ্রেশ হয়ে আবিরও অফিসের জন্য বেরিয়ে পরেছে। বাকিরাও নিজেদের কাজে ব্যস্ত হলো।
সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে সকলেই বাড়ি ফিরলো, ফিরলো না কেবল আবির।
আগামী মাস থেকে আবিরের নতুন কোম্পানি শুরু হবে সেই কাজেই ব্যস্ত সে। সারাদিন বাবার কোম্পানির কাজ সামলে সন্ধ্যার পর প্রায় ই দেখতে হয় নিজের অফিসের কাজকর্ম । সাথে তার আরও দুজন বন্ধু আছে। একজন রাকিব আরেকজন রাসেল । আবিরের পরেই তাদের পোস্ট আবিরের অবর্তমানে তারাই সামলাবে কোম্পানি । কয়েক বছর আগে থেকেই আবিরের সাথে প্ল্যান করে রেখেছিল এটারই পূর্ণতা পেতে চলেছে।
এদিকে গতকালের ন্যায় আজও পড়ার রুমে অপেক্ষা করছে মেঘ। কিন্তু শাহরিয়ার ভাইয়া আসার কোনো খবর নেই। এই পৃথিবীতে কারো জন্য অপেক্ষা করার মতো কষ্ট আর কিছুতে নেই। অধৈর্য হয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মেঘ বড় আব্বুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
আলী আহমদ খান সোফায় বসে কফি খেতে খেতে টিভি দেখছিলেন। মেঘ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো বড় আব্বুর দিকে তারপর আস্তে করে বলল,
“ভাইয়া কি পড়াতে আসবেন না?”
আলী আহমদ খানের মনোযোগ সরলো টিভির দিক থেকে৷ এক পলক তাকালো মেঘের দিকে তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে ডায়েল করলেন শাহরিয়ারের নাম্বারে। প্রথমবার রিসিভ হলো না। দ্বিতীয় বার রিসিভ হলো।আলী আহমদ খান জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি আসছো না কেনো? পড়াবে না? ”
শাহরিয়ার শীতল কন্ঠে উত্তর দিল,
“আংকেল আমার জন্য বাসাটা দূরে হয়ে যায়। সময় মেইনটেইন করাও একটু সমস্যা তাই আমি আর আসতে পারবো না। সরি। ”
আলী আহমদ খানের জবাব,
“তাহলে তুমি এই কথাটা প্রথম দিন ই জানাতে পারতে।”
শাহরিয়ার গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলো,
“একটু অসুস্থ ছিলাম আংকেল, হাসপাতাল থেকে আজই ফিরেছি। আপনাকে সময় করে ফোন দিতাম আমি। ”
আলী আহমদ খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“কি হয়েছে তোমার?”
শাহরিয়ার ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“তেমন কিছুটা, হালকা ব্যথা পেয়েছি। দোয়া করবেন আংকেল, আল্লাহ হাফেজ। ”
আলী আহমদ খান বললেন,
” সাবধানে থেকো, আল্লাহ হাফেজ। ”
আলী আহমদ খান মেঘকে জানালেন, মেঘ কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো সোফার পাশে৷ তখন ই সিঁড়ি দিয়ে নামছিল তানভির, মেঘের কাছে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল,
“এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
মেঘ মাথা নিচু করে, পাতলা অধর নেড়েচেড়ে বলে,
“শাহরিয়ার ভাইয়া পড়াবেন না আমায়!”
তানভির কপাল গুটিয়ে বলল,
“তাতে মন খারাপ করার কি আছে? মানুষের সমস্যা থাকতেই পারে! ”
মেঘ চোখ তুলে তাকালো ভাইয়ের পানে। তানভির বড় আব্বুর দিকে তাকিয়ে পুনরায় বললো,
“আমার একজন পরিচিত আপু আছে, ওনি খুব ভালো পড়ান শুনেছি। আপনি অনুমতি দিলে আমি কি কথা বলে দেখবো?”
আলী আহমদ খান তানভিরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন,
” হয়তো মনে মনে ভাবলেন যেই ছেলে জীবনে পড়াশোনায় করে না সেই ছেলে আবার বোনের জন্য টিউটর খোঁজছে।”
মুখ ফোটে বললেন,
“দেখো তোমার মতো গর্দ*ভ হয় না যেনো”
তানভির হাসি মুখে বলল এবার,
“২-১ দিন পড়ার পর মেঘের যদি মনে হয় পড়বে তাহলেই ফিক্সড করবো।”
আলী আহমদ খান এবার যেন স্বস্তি পেলেন।সহজভাবেই বললেন,
” ঠিক আছে কালকেই আসতে বলো তাহলে।”
তানভির আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বাসা থেকে বের হয়ে গেল। মেঘ ও নিজের মতো বই খাতা নিয়ে রুমে চলে গেলো।
★★★★
আজ মঙ্গলবার, মেঘ রেডি হয়ে একেবারে নিচে নামলো, ক্লাসের টাইম ৩০ মিনিট এগিয়ে দিয়েছে তাই তাড়াতাড়ি যেতে হবে। খাবার টেবিলে বসে তাড়াহুড়োয় খাবার খাচ্ছে মেঘ। সামনের চেয়ার ফাঁকা এতেই যেনো মেঘের স্ব*স্তি কাজ করছে। রবিবারের ধ*মক খাওয়ার পর থেকে মেঘ ইচ্ছে করেই আবিরের থেকে দূরে দূরে থাকতে চাইছে। এদিকে আবির ৮ টার দিকে না খেয়ে অফিসে চলে গেছে। নিজের অফিসে কাজ শেষ করে তারপর বাবার অফিসে যাবে। মেঘও খাওয়া শেষ করে কোচিং এর উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
২ টায় মেঘ কোচিং থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসেছে। ২ লুকমা মুখে তুললেই কারো পায়ের শব্দে ফিরে তাকায় মেঘ। আবির খাবারের টেবিলের দিকে আসছে, ওমনি মেঘের গলায় খাবার আটকে গেছে। খাবার গিলতে পারছে না মেয়েটা। কোনোরকমে পানি দিয়ে খাবার টা গিললো। এদিকে আবির বেসিন থেকে হাত ধৌয়ে এসে মামনিকে খাবার দিতে বলল। বসল মেঘের বিপরীতে রাখা চেয়ারটাতে।
মেঘের চিবুক নামলো গলায়, দৃষ্টি তার প্লেটের দিকে। মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করছে মেয়েটা, হাত পা কাঁ*পাকাঁ*পি শুরু হয়ে যাচ্ছে। ২ দিন পালিয়ে থেকেও লাভ হলো না। বার বার কানে বাজছে রবিবারের সেই কথাটা
“এমন থা*প্পড় দিব যার দাগ ১ মাসেও যাবে না।”
কে চাই স্বেচ্ছায় মা*ইর খেতে, কোনোরকমে খেয়ে সরে পরলেই বাঁ*চে সে। খাওয়ার গতি বাড়ালো, নাকে মুখে খাচ্ছে মেঘ। আবির ক্ষি*প্ত দৃষ্টিতে তাকালো মেঘের দিকে, কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,
“কি হয়েছে তোর?”
মেঘের নি*শ্বাস আটকে আছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। সারাশরীরের কম্পনের মাত্রা তীব্র হলো, কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে। কিন্তু আজ তাকে বলতে হবে, হি*টলারের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। নিজেকে নিজে সাহস দিলো।
মেঘের সরল স্বীকারোক্তি,
“কিছু হয় নি আমার।”
আবির কিছু বলতে গিয়েও গিলে ফেলল কথাটা। এরমধ্যে হালিমা খান আবিরের খাবার নিয়ে এসেছেন। আবির খাওয়ায় মনোযোগ দিল। হালিমা খান আবিরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“সকালে কিছু খেয়েছিলি বাবা?”
আবির গুরুভার কন্ঠে উত্তর দিলো,
“খায় নি”
হালিমা খান কিছুটা চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
“সকালে খেয়ে গেলেই পারতিস, একটু দেরি হলে না হয় হতো!”
আবির কোনো উত্তর দিলো না।মেঘ মনে মনে ভাবছে, আমায় যে লোক হু*মকি দেয়,
“ঠিকমতো খেতে হবে”
সে নিজে যখন না খেয়ে থাকে তখন তাকে কেনো কেউ ধম*ক দেয় না। সব দোষ এই মেঘের। থাক*বোই না এই বাড়িতে৷ উঠতে চাইলো টেবিল থেকে তৎক্ষণাৎ চোখ পরে আবির ভাইয়ের দিকে, আবির মাথা নিচু করে খাচ্ছে। এখন উঠতে গেলে নিশ্চয় ধ*মক দিয়ে আবার বসাবেন, কে জানে আবার থা*প্পড় ই মা*রেন কি না। এসব ভেবে মেঘ আবার বসে দ্রু*তগতিতে খাওয়া শুরু করে।
আবির রাগে একপ্রকার চিৎকার দিয়ে উঠল,
“একটা থা*প্পড় দিব তোকে, এভাবে খাচ্ছিস কেন?”
মেঘ সহসা থমকে গেল, ধমক খেয়ে চোখ টলমল করছে তার, মুখের ভাত গুলো কোনোরকমে গিলল।মনে মনে ভাবলো,
“আমাকে থা*প্পড় দেয়ার এত ইচ্ছে আপনার?”
আবিরের থা*প্পড়ের ভয়ে ২ দিন যাবৎ খাবার টেবিলে সবার সাথে খায় না মেয়েটা। কে জানতো এই দুপুর বেলা আবির ভাই অফিস থেকে বাসায় চলে আসবেন। জানলে হয়তো আগে খেয়ে নিতো না হয় আবির ভাই খাওয়ার পর খেতে আসতো। কেনো এই মানুষ টা তার সামনে আসে। কেনোই বা এত রা*গ দেখায় ভেবে পায় না মেঘ। হঠাৎ মনে পরে যায় ঘুম থেকে উঠে বলা স্লোগান টা। মেঘ মনে মনে বিড়বিড় করল,
” আমার মন একমাত্র আমার নিয়ন্ত্রণে চলবে, মেঘ ভয় পাবে না আবিরকে।”
তারপর স্বাভাবিক ভাবে প্লেটের ভাতগুলো শেষ করে হাত ধৌয়ে সিঁড়ি দিকে যেতে নেয়৷ সোফার কাছে পর্যন্ত যেতেই মীম আর আদি দৌড়ে এসে জাপ্টে ধরে মেঘকে৷ আকস্মিক ঘটনায় কিছুটা ঘাবড়ে গেলো মেঘ।তারপর স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
” কি হয়েছে তোদের?”
মীম ফিসফিস করে মেঘকে বললো,
“আপু প্লিজ আবির ভাইয়াকে বলো না আমাদের নিয়ে বাইকে ঘুরতে, কখনো বাইকে উঠি নি, প্লিজ বলবা!”
মেঘ কোনো কিছু না ভেবেই বললো,
“আমি বলতে পারবো না।”
আদি বলে উঠল,
“প্লিজ প্লিজ প্লিজ আপু। আমরা বলার সাহস পাচ্ছি না। প্লিজ তুমি একটু বলো না ”
মেঘ আবারও গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো,
” আমি পারবো না বলতে। তোদের ঘুরতে ইচ্ছে করে তোরা বল। ”
মেঘ মনে মনে ভাবছে,
“তোরাই সুখে আছিস আমাকে তো উঠতে বসতে থাপ্পড় মা*রার হুম*কি দিচ্ছে! আমি এবার এটা বললে নিশ্চিত এখনই খাবো থাপ্প*ড় টা।”
আবিরের খাওয়া শেষ এদিকে আসতে দেখে মেঘ তাড়াতাড়ি রুমে চলে যেতে চাচ্ছে। কিন্তু আদি আর মীম আরও করুন স্বরে বলছে,
“প্লিজ আপু, তুমি বলো না। ”
এবার মেঘ রেগে কটমট করে বলে,
“আমি বললাম তো পারবো না।।”
মীম আর আদি এবার চুপসে গেলো। মেঘ আর এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না। সিঁড়ি দিয়ে উঠায় ব্যস্ত। আবির বিষয়টা লক্ষ্য করেছে, আবির আদিকে জিজ্ঞেস করে,
“কাকে কি বলতে বলছিস ওকে?”
মীম শ্বাস টেনে সাহস নিয়ে বললো,
“ভাইয়া আমাদের আপনার বাইকে নিয়ে ঘুরাবেন প্লিজ?”
মেঘ সিঁড়িতে উঠতে উঠতে ফিসফিস করে বলছে, “হিট* লার নিবে বাইকে তোদের? সেগুরে বালি৷”
আবির কন্ঠ তিনগুণ ভারি করে উত্তর দিলো,
“আমার বাইকে কাউকে উঠাবো না,
কিছুদিন পর তানভির কে বাইক কিনে দিব। তখন ও তোদের নিয়ে ঘুরবে। ”
আদি অকস্মাৎ প্রশ্ন করে বসলো,
“তুমি তানভির ভাইয়াকে নিয়ে ঘুরো না?”
আবির এবার স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো,
“এখনও তানভির আমার বাইকে উঠে নি! তবে ভবিষ্যতে উঠতে পারে । ওর সাথে তোদের কি সম্পর্ক?”
মীম আর আদি বোবা হয়ে রইলো। মেঘের কথা ফলে যাওয়াতে নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে করতে রুমের দিকে যাচ্ছে আর ভাবছে দুই ভাইয়ের গলায় গলায় সম্পর্ক অথচ বাইকে উঠার পারমিশন দেয় নি ছিঃ।
সহসা অভিব্যক্তি পাল্টালো মুখের৷ বিড়বিড় করে বলল,
“হিট*লারের থেকে ভালো আর কি আশা করা যায়?”
রুমে গিয়ে সোজা শুয়ে পরলো। তৎক্ষনাৎ ফোনটা হাতে নিল। এই ২-৩ দিনে একবারের জন্য ও ফে*সবুকে ঢুকে নি সে। মন খারাপ কাটাতে ঢুকলো ফে*সবুকে, কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরির পর একটা পোস্ট সামনে আসছে। ১ দিন আগে আবির ফেসবুক একটা অসম্ভব সুন্দর ছবি আপলোড দিয়েছে সাথে ছোট করে ক্যাপশন লিখেছেন।
“শূন্যতা আমায় ঘিরে আছে,
আর আমি ঘিরে আছি মোহে।”
মেঘ ছবিটা দেখে যতটা খুশি হলো তার থেকে বেশি চিন্তিত হলো ক্যাপশনে কি বুঝিয়েছেন তা ভাবতে। সে ক্যাপশন বুঝার চেষ্টায় মগ্ন হলো। মনে মনে আওড়ালো,
“ওনি কি তাহলে সত্যি কারো সাথে রিলেশনে আছেন? ”
তৎক্ষণাৎ মনের ভেতর থেকে জবাব এলো,
“ওনি প্রেম করলে তোর কি? তোরে যে উঠতে বসতে থা*প্পড় দে*য়ার ভ*য় দেখায়, তোর লজ্জা করে না এই হি*টলার কে নিয়ে ভাবতে!”
সঙ্গে সঙ্গে ডাটা অফ করে ফোন রেখে দিলো মেঘ। সত্যিই তো, সে তো আবির ভাইয়ের উপর রেগে আছে তাহলে আবার আবির ভাইকে নিয়ে ভাবছে কেনো..!
এদিকে আবির রুমে এসে ৫-১০ মিনিট রেস্ট নিয়ে নিজের ল্যাপটপ আর কিছু কাগজপত্র নিয়ে বেরিয়ে পরেছে৷
★★★★
সন্ধ্যায় মেঘের নতুন টিউটর এসেছে। বয়স এত বেশি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সে পড়াশোনা করছেন এবার ৩য় বর্ষে আছেন। দেখতে মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দরী, গোলগাল চেহারা, বোরকা পরে হিজাব পরে এসেছেন। গুছিয়ে কথা বলেন, সুন্দর করে বুঝিয়ে পড়িয়েছেন মেঘকে। মেঘ যেনো পড়ার থেকেও বেশি মুগ্ধ হয়েছে ওনার কথা বলার স্টাইলে।
ওনার নাম জান্নাত। মেঘের ওনাকে এতই ভালো লেগেছে যে দু দিন পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলো না। জান্নাত আপু চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল বড় আব্বুর কাছে। জানালো ওনার কাছেই পড়বে সে।
আলী আহমদ খান যেনো কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেন। তারপরও মেঘকে বললেন,
“কখনো যদি মনে হয় তোমার পড়ার ঘাটতি হচ্ছে তাহলে আমি নতুন টিউটর আনবো, তুমি চিন্তা করো না। পড়াশোনায় মনোযোগ দাও!”
মেঘ “ঠিক আছে” বলে নিজের রুমে চলে গেলো।
রাতে সবাই একসাথে খাওয়া দাওয়া করলো কিন্তু আবির নেই। ইদানীং আবির অফিস শেষ করে নিজের নতুন অফিসে চলে যায়। ওখানে সব গুছানো, প্ল্যানিং করা এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। রাত ১১ টার আগে ফিরেই না। কেউ অপেক্ষাও করে না তার জন্য। কারণ আবিরের ক*ড়া নির্দেশ,
“আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করলে আমি আর ফিরবোই না।”
সেই থেকে মা আর মামনি নিজেদের সময় মতো শুয়ে পরে। আবির ১১ টার পরে এসে ফ্রেশ হয়ে নিজের মতো খায়।
★★★★
কেটে গেলো আরও দুদিন। দেখা হলো না মেঘ আর আবিরের। সকালে আবির খেতে আসলেও মেঘ আগে আগেই খেয়ে পা*লায়, সে আবির ভাইয়ের মুখোমুখি হতে চাই না।
মেঘ ছোটবেলা থেকেই খুব আবেগী আর জে*দি৷ অল্পতে কা*ন্না করা তার স্বভাব। আর কোনো বিষয়ে জে*দ করলে তা সহজে কাটে না। যেমন সামান্য থা*প্পড়ের জন্য আবির ভাই এর সাথে ৯ বছরের উপরে কথা বলে নি একটিবার। আবির দেশে আসাতে মনে অন্যরকম অনুভূতি জন্মানো শুরু করেছিল সবেমাত্র। কিন্তু আবির ভাইয়ের হুমকিতে অনুভূতি গুলো চা*পা পরে যাচ্ছে। মেঘ নিজেই যেনো অনুভূতি গুলোকে মাটি চা*পা দিতে ব্যস্ত।
কথায় আছে,
“চোখের আড়াল হয়ে গেলে,
মনের আড়াল হতে বেশি সময় লাগে না”
এজন্য মেঘ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যেনো আবির ভাইয়ের সামনে সে না পরে৷ সবাই টেবিলে বসার আগেই সে খেয়ে নিজের রুমে চলে যায়, আবির ভাই অফিসে গেলে সে কোচিং এর জন্য বের হয়, দুপুরে আবির থাকে না বলে একটু রিলাক্সে খেতে পারে৷ রাতে জান্নাত আপু পড়িয়ে যায় ৭.৩০ নাগাদ তখন ই খেয়ে রুমে চলে যায়। তখন তো আবির ভাই ফিরেই না, দেখা হবে কি ভাবে..!!
★★★★
সেই রবিবার থেকে মেঘ পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার রাত, মেঘ নিজের পড়া শেষ করে শুয়ে মোবাইল টা হাতে নিয়েছে। আবিরের কথা খুব মনে হচ্ছে তার, তাই আবিরের আইডি তে ঢুকলো কিন্তু কোনো আপডেট নেই। মনের ভেতরটা কেমন জানি মোচড় দিলো মেঘের। মঙ্গলবার দুপুরে খেতে বসেছিল একসাথে তারপর আর দেখেই নি সে।
মেঘের খুব ইচ্ছে করছে আবির ভাইকে দেখার। মনকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছে না। মনের জোর গুলোও নিস্তেজ হয়ে পরেছে। অনেকক্ষণ মনকে বুঝিয়ে ব্যর্থ হলো তাই রুম থেকে বের হয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়েছে আবির ভাইয়ের রুমের দিকে। রাত তখন ১১ টার উপরে। ড্রয়িং রুমে একটা হালকা আলোর বাল্ব জ্বলছে, পুরো বাড়ি অন্ধকার। মেঘ আবিরের রুমের সামনে দাঁড়ালো। দরজা চাপানো, আস্তে করে ধাক্কা দিলো মেঘ। চেক করতে চাইছিলো খোলা কি বন্ধ। মেঘের হালকা ধাক্কাতেই খুলে গেলো দরজা। কিছুটা ঘাবড়ে গেল মেঘ। যদি আবির ভাই রুমে থাকেন তাহলে আজ থা*প্পড় নিশ্চিত। তাই দুগালে হাত দিয়ে আস্তে করে উঁকি দিলো রুমে৷
রুমের বারান্দায় বাল্ব জ্বলছে । সেটার আলোয় রুমে আসছে। মোটামুটি আলোকিত হয়ে আছে রুমটা। আবির কোথাও নেই। বিছানা টানটান করে পাতানো। টেবিলে বই, খাতা, কাগজপত্র এলোমেলো সাথে একটা ল্যাপটপের আলো জ্ব*লছে। চেয়ারের উপর ২-৩ টা কাপড় এলোমেলো পরে আছে। ছেলেদের রুম সচরাচর যেমন হয়।
মেঘ মনে মনে ভাবছে,
“আবির ভাই কি এখনও বাসায় ফিরে নি?”
নিজের রুমের দিকে ফিরে ১ কদম এগুতেই কানে ভেসে আসে গানের সুর । দাঁড়িয়ে পরলো মেঘ, মনে মনে ভাবছে,
“গান কে গাইছে, আবির ভাই নয় তো?”
আবারও ঘুরে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলো সিঁড়ির কাছে। মেঘ এই জীবনে কোনোদিন সন্ধ্যার পর ছাদে যায় নি৷ সবাই গেলেও যায় না, ওর ভ*য় লাগে, সন্ধ্যা বেলা নাকি ছাদে তাঁনারা ঘুরে বেড়ায়। সারারাত ছাদেই থাকেন এ ভয়ে ছাদে পা বাড়ায় না সেদিকে। সিঁড়ি কাছে এসে থমকে দাঁড়ালো মেঘ,
“এই গান কি তাঁনারা গাইতেছেন? আমাকে আকৃষ্ট করে নেয়ার জন্য? ”
যাবে কি যাবে না এটায় ভাবছে মেঘ, বুকে সাহস নিয়ে দু কদম এগিয়েছে মেঘ, একটু উঁকি দিয়ে দেখলো ছাদের দিকে৷ ছাদের গেইট খোলা। এটা দেখে মনে সা*হস পেলো মেয়েটা৷ তাঁনারা গান গাইলে গেইট খুলার কি দরকার। তারপরও আল্লাহ আল্লাহ করে এগুচ্ছে মেঘ৷
গেইটের কাছে এসে বুকে হাত রেখে উঁকি দিলো ছাদের দিকে। ছাদের এক কর্ণারে নজর পরলো, সিঙ্গেল সোফার উপর হেলান দিয়ে বসে আছে একজন৷ চাঁদের উপর থেকে মেঘ সরে যেতেই স্পষ্ট বুঝা গেলো এটা আবির ভাই৷ মেঘ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পরলো, এত রাতে আবির ভাই ছাদে কি করেন, কৌতুহল হলো মেঘের।আগে কি গান গেয়েছে তা মেঘ বুঝতে পারে নি,
নিচ থেকে শুধু সুর টায় শুনেছে। এখন আবির ভাই নিরব। কয়েক মুহুর্ত পর আবির ভাই আবার শুরু করলো,
“ছোট্ট বুকে মেঘ জমিয়ে ক্যানরে কাঁদিস পাখি?
তুই ফিরবি বলে আমি কেমন সন্ধ্যা নামায় রাখি
ছোট্ট তোর ওই ওমের ডানায় নাক ঘষতে দিবি কি?
বুকের ভেতর ঘুলঘুলিতে একলা পাখি হবি?
তুই বুকের ভেতর ঘুলঘুলিতে একলা পাখি হবি?”
মেঘ উদ্বিগ্ন নয়নে তাকিয়ে আছে আবির ভাইয়ের দিকে। ছেলেদের গান শিখতে হয় না, তারা খালি গলাতে গান গাইলেও যেনো অসম্ভব সুন্দর লাগে। মেঘ মুগ্ধ হয়ে আবিরের গান শুনছে। আবির ভাই একই লিরিক্স বার বার গাওয়াতে গানে মনোযোগ দিলো মেঘ,
নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলো মেঘ,
“এই গান কাকে উদ্দেশ্য করে গাইছেন ওনি? আমাকে নিয়ে নয়তো? এটুকু বলতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো মেঘের, তৎক্ষনাৎ মনে হলো ওনি আমাকে নিয়ে কেনো গান গাইবেন, আমি কে! তানভির ভাই তো সেদিন বললো আবির ভাইয়ের জীবনে কেউ আছে তাহলে কি তার কথা ভেবেই গাইতেছেন?”
সঙ্গে সঙ্গে হাসি গায়েব হয়ে গেল ৷ নিস্তব্ধ আঁখিতে তাকিয়ে আছে সে, বুকের বা পাশে হালকা ব্যথা অনুভব হলো, ওনার মনে সত্যি অনেক দুঃখ না হয় এমন গান কেউ গায়..!
এরমধ্যে আবির ভাইয়ের গান থেমে গেলো, কিছুক্ষণ নিরব থেকে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে ধরলো, আ*গুন দিয়ে জ্বা*লালো সেই সিগা*রেট। এদিকে মেঘের মাথায় আকাশ ভে*ঙে পরেছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে ক*ষ্ট হচ্ছে, আবির ভাই সিগারেট খান.? দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকু পাচ্ছে না মেয়েটা । অকস্মাৎ দরজার এখানেই বসে পরেছে সে৷মেঘের জাত শ*ত্রু হলো সিগারেট। যেখানে সিগারেটের গ*ন্ধ মেঘ সহ্য করতে পারে না, সিগারেটের গ*ন্ধে তার শ্বা*সকষ্ট হয়ে যায়। সেখানে আবির সিগারেট খাচ্ছে। এটা যেনো মেঘ মানতেই পারছে না৷ ওষ্ঠদ্বয় উল্টে নিরবে চোখের জল ফেলছে, যাকে সে মিস করছিল, এতক্ষণ তাকে দেখার জন্য উদ্বেগ ছিল তাকে খোঁজে এসে এরকম একটা দৃশ্য দেখবে তা সে কল্পনাও করে নি। অষ্টাদশীর মনটা নির্ম*মভাবে হ*ত্যা করেছে আবির। আবির ভাই অষ্টাদশীর মনে বসন্তের ফুলের মতো আর ফুটবে না । আবিরের প্রতি খুব রা*গ হলো মেঘের। রাগের সাথে কান্নার মাত্রাও বাড়তে লাগলো। ছাদের দরজার পাশে বসেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেঘ। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার কোনো ভাষায় খোঁজে পাচ্ছে না সে। আচমকা আবির মেঘের সামনে হাজির হলো। মেঘ তখনও কা*ন্নায় ব্যস্ত৷
আবির গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“এখানে কি করছিস?”
চলবে……
০৯) (scsalma90)
আবির ভাইয়ের কন্ঠ শুনে মেঘ ভূ*ত দেখার মতো চমকে উঠল, মেঘের কা*ন্নার তীব্রতা এতোটায় বেড়ে গেছিলো যে ছাদের কর্ণার থেকে আবির শুনতে পেয়ে ছুটে এসেছে।
অতিরিক্ত কা*ন্নায় মেঘের শরীর কাঁ*পছে। জোর করে কা*ন্না থামিয়েছে। এখনও নাক টানছে আর জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ছে।
আবির গম্ভীর স্বরে পুনরায় বললো,
“কথা বলছিস না কেন, এত রাতে এখানে কি করিস?”
মেঘ এবার কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে, ছাদের ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কন্ঠে উত্তর দিলো,
“এমনি এসেছিলাম”
আবিরের শরীর ঝুঁকে এলো, মেঘ তখনও ছাদের ফ্লোরেই বসা। চাঁদের আলোতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিলো মেঘের অভিব্যক্তি৷ চিবুক নেমেছে গলায়, হাত পা কাঁপছে, ভ*য় আর কা*ন্নার প্রতিক্রি*য়া দুটায় অনুভব করছে। আবির আচমকা মেঘের বাহুতে ধরলো, এক টানে দাঁড় করালো মেঘ কে। মেঘের শরীরের কম্পন তীব্র হলো, হৃদপিণ্ডের ধুপধাপ বেড়ে যাচ্ছে সহসা৷ চোখ তুলে তাকাতেও পারছে না। আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো, রা*গে ক*টমট করতে করতে বলল,
“তুই কাঁদছিলি কেনো?”
মেঘ উত্তর খোঁজে পাচ্ছে না। কিভাবে বলবে, আবির ভাইয়ের সি*গারেট খাওয়া আর অন্য মেয়েকে উদ্দেশ্য করে গান গাওয়াতে তার ভেতর থেকে এমনিতেই কা*ন্না আসছে। মেঘ মাথা নিচু করে চুপ হয়ে রইলো।
আবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“তুই কি সবসময় রাতবিরাতে ছাদে আসিস?”
মেঘ তৎক্ষনাৎ বিদ্যুৎ বেগে কতক্ষণ মাথা নাড়িয়ে না বোধক সম্মতি জানালো, তারপর আস্তে আস্তে বললো,
” এই জীবনে কোনোদিন সন্ধ্যার পর ছাদে উঠি নি আমি”
আবির ভাই উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“তাহলে আজ আসলি কেন?”
মেঘ নিস্তব্ধ, নিরব। কিছু বলার সাধ্য নেই বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ৷ এত রাতে ছাদে আসার কোনো অজু*হাতও খোঁ*জে পেল না। আবির কয়েক পা এগিয়ে মেঘের অনেকটা ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো। আবিরকে এত কাছাকাছি দেখে মেঘের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার হাল হলো। আবিরের গায়ের গ*ন্ধে মা*তাল হওয়ার অবস্থা। ভ*য়ংকর পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বাঁচাতে দু কদম পিছিয়ে গেল মেঘ। কিন্তু পিছনে আর জায়গা নেই দরজার পাশের পিলারে পিঠ ঠেকল, থরথ*র করে কাঁপছে অষ্টাদশীর ছোট দেহ, পায়ের পাতা শিরশির করছে । সরে যেতে চাইলো সামনে থেকে,
আচমকা আবির দুহাতে পিলারের দু পাশ চেপে ধরলো। কিছুটা ঝুঁকে মেঘের মুখোমুখি হলো। আবিরের উষ্ণ শ্বাস, তীব্র দৃষ্টি মেঘকে নাজেহাল করে দিচ্ছে। মা*নসিক টানাপো*ড়নে পরে গেল মেঘ ৷ বুকের ভেতর কেউ অবিরাম নৃত্য করছে যার শব্দ বাহির থেকে শুনা যাচ্ছে। শরীর ঘামতে শুরু করেছে।
আবির ভাই হঠাৎ ই শীতল কণ্ঠে বললেন,
“এতবছর তো খুব পা*লায় বেড়াইছিস! এখন দেখবো কতটা পা*লাতে পারিস।”
আবিরের ঠান্ডা হুম*কিতে কেঁপে উঠল, এই কথা শুনামাত্র মেঘের শরীরে হাই ভোল্টেজের ঝাঁকুনি দিল। মেঘের বক্ষস্পন্দন জোড়ালো হতে শুরু করেছে। আবির সরু নেত্রে অষ্টাদশীর পানে তাকিয়ে আছে। মেঘের টাল*মাটাল অবস্থা বুঝতে পেরে সামনে থেকে সরে গেল৷ আবির শক্ত কন্ঠে ফের বলল,
“রুমে যা”
আবির সরে যাওয়াতে স্বস্তি পেল মেঘ, বার বার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে শুরু করল। কয়েক মুহুর্ত পর সিঁড়ির দিকে নামতে গেলো, গুটগুটে অন্ধকার সিঁড়ি। পিছন ফিরে তাকিয়ে বুকে সা*হস নিয়ে ডাকল,
“আবির ভাই”
আবির উল্টো দিকে ফিরে ছিল, ডাক শুনে ঘুরে বলল,
“হুমমমমম”
মেঘ ভয়ে ভয়ে বলল ,
“আমাকে একটু রুম পর্যন্ত দিয়ে আসবেন! প্লিজ”
আবির বিস্মিত কন্ঠে বলল,
“কেনো? হাঁটতে পারছিস না?
মেঘ মাথা নিচু করে আস্তেধীরে বলল,
“ভয় লাগছে!”
“কেন?”
“তাঁনারা যদি আমাকে ধরে ফেলেন! ”
আবির কয়েক সেকেন্ড থেমে, স্ব শব্দে হেসে উঠলো।
আবির মেঘের কথায় হাসছে ভাবতেই মনে মনে খুশি লাগছে মেঘের৷ আবিরের হাসির শব্দে মেঘ অবাক চোখে তাকালো। ততক্ষণে আবিরের হাসি গায়েব৷ আবির অকস্মাৎ ঠাট্টার স্বরে শুধালো,
“তা তুই ছাদে আসার সময় কি তাঁনারা বেড়াতে গিয়েছিলো?”
আবিরের এমন কথায় মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে। আবির সহসা বলে উঠলো,
” তুই যা আমি পিছনে আছি”
মেঘ আর কিছু বলার সাহস পেল না। দুটা সিঁড়ি নেমে হঠাৎ কিছু ভেবে থমকে দাঁড়ালো। আবির নিরুদ্বেগ কন্ঠে শুধালো,
“আবার কি হলো?”
মেঘ দুবার জোরে জোরে শ্বাস ছাড়লো, মনে তীব্র সাহস নিয়ে পেছন ফিরে তাকালো। আবির ছাদের দরজার পাশে দাঁড়ানো, ৬ ফুট লম্বা তারউপর মেঘ বেশ কয়েকটা সিঁড়ি নেমে গেছে। এখান থেকে আবিরের লম্বা শরীরটা চাঁদের আলোয় সুপারি গাছের মতো মনে হচ্ছে । মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
“আবির ভাই, আপনি সিগা*রেট খান কেনো?”
মেঘের কথায় আবির যেন ছোটোখাটো টাশকি খেল।মুহুর্তেই গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“তার জবাবদিহি কি তোকে দিতে হবে?”
মেঘ এবার কোমল কন্ঠে বললো,
“সিগারে*ট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষ*তিকর, আর আমি..”
এটুকু বলেই থেমে গেল। আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,
“আর তুই কি?”
মেঘ ভ*য়ে ভ*য়ে বলল,
“কিছু না”
মেঘ আর থামলো না, সিঁড়ি দিয়ে নামতে ব্যস্ত হলো।
মেঘ করিডোরে হাঁটছে, আবির পেছনে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বা*লিয়ে সিঁড়ি নিচ পর্যন্ত নামলো।
মেঘ পেছন ফিরে আবিরকে দেখার সাহস পাচ্ছে না। নিজের রুমের দরজা পর্যন্ত এসে রুমে ঢুকার সময় এক পলক তাকালো। আবিরের মনোযোগ মোবা*ইলে। মেঘ রুমে চলে গেলো।
★★★★
আবিরের আরও একটি রাত কাটলো নির্ঘুম, নিস্তব্ধ। প্রত্যেক সপ্তাহে ছুটির দিনের আগে সারারাত জেগে থাকে, এটা তার বহু বছরের অভ্যাস। বিদেশে থাকাকালীনও তাই করতো। দেশে এসে প্রতি বৃহস্পতিবার রাত নিজের মতো একাকী কা*টায়৷ নিজেকে নিয়ে ভাবে, নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছে, ভালোবাসা, প্রিয়জন সবকিছু নিয়েই ভাবে।
মেঘ নিজের রুমে শুয়ে ছাদের বিষয়গুলো ভাবছে, আবিরের এত কাছে আসা, আবির ভাইয়ের বলা সেই কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। এসব ভেবে কখন ঘুমিয়েছে নিজেও জানে না। সকাল সকাল খাবার টেবিলে খাবার খাচ্ছে সবাই, শুক্রবার বলে ভালোমন্দ রান্না হয়েছে। মেঘের মনটা আজ খুব ভালো। কেনো ভালো নিজেও জানে না তবে আবিরের প্রতি ভ*য় কিছুটা শিথিল হয়েছে। খাবার টেবিলে আবির নেই দেখে মন কিছুটা খারাপ হয়েছে কিন্তু তেমন পাত্তা দেয় নি। নিজের মতো খেয়ে পড়তে বসেছে। প্রতি শুক্রবারে প্রাইভেটে ১ ঘন্টার পরীক্ষা থাকে। ১ সপ্তাহে যা পড়ায় তার উপরই পরীক্ষা থাকে, আজও ৩ টা থেকে ৪ টা পর্যন্ত পরীক্ষা।
অন্যদিকে তানভির রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেছে৷ সামনে এমপি নির্বাচন, তাদের প্রিয় নেতা মনোনয়ন কিনেছেন। সবাই মিটিং মিছিলে ব্যস্ত। জনসমর্থন যাচাই করে মনোনয়ন দেয়া হবে। তানভিরদের এখন সব এলাকায় যেতে হচ্ছে, জনগণের সুবিধা অসুবিধা শুনছে, লিস্ট করছে। এমপি নির্বাচনের কয়েকমাস পরেই হবে সভাপতি নির্বাচন। তানভিরের টার্গেট সভাপতি হওয়া তাই তাকে আরও বেশি এক্টিভ থাকতে হচ্ছে।
★★★
২.৩০ টা নাগাদ মেঘ পরীক্ষা দিতে বেড়িয়েছে। আজ একটু আগেই চলে এসেছে। পরীক্ষা শুরু হতে এখনও ১০ মিনিট বাকি। তাই বন্যা আর মেঘ গল্প করছে৷
বন্যা: কিরে তোর হি*টলার ভাইয়ের কি খবর ? কিছু তো আর বললি না, ছবি দেখাবি বলছিলি তাও দেখালি না। সত্যি সত্যি মন থেকে বের করে দিয়েছিস?
মেঘ: মুখে যা বলি তার সবটায় কি পারি?
এত চেষ্টা করেও তো পারলাম না মন থেকে তাড়াতে৷ গতরাতে থাকতে না পেরে গিয়েছিলাম ওনাকে দেখতে৷ কি যে একটা বাঁশ খেয়েছি!
বন্যা: কেন, কি হয়ছে?
মেঘ: কি আর হবে লুকিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম, আবির ভাইয়ের কাছে ধরা পরে গেছি।
বন্যা: ব্যাটার চোখ আছে! ভালো হয়েছে। গেলি কেন তুই?
মেঘ মনে মনে ভাবছে,
” এখন যদি বন্যাকে বলি আবির ভাইয়ের জন্য কা*ন্না করেছি তাহলে বন্যা আমায় এখানেই বালি চা*পা দিয়ে দিবে।”
বন্যা আর মেঘ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভার্সিটিতে ভর্তির আগ পর্যন্ত কোনো প্রকার প্রেম, বন্ধুত্ব, ক্রাশ কিছুই খাওয়া যাবে না। এজন্য কোচিং এ নতুন কারো সাথে কথায় বলে না৷ মেঘ আগে আসলে বন্যার জন্য সিট রাখে, বন্যা আগে আসলে মেঘের জন্য সিট রাখে। বিষয়টা অনেকটা হাইস্কুল জীবনের মতো। এত কিছুর পরও মেঘ আবির ভাইয়ের উপর ক্রাশ খেয়ে ফেলেছে । এরজন্য বন্যা অবশ্য প্রতিনিয়ত ই মেঘকে বুঝাচ্ছে। এতক্ষণে স্যার চলে আসছেন, যথারীতি পরীক্ষাও শুরু হলো।
৪ টায় পরীক্ষা শেষ করে দুই বান্ধবী হাতে হাত ধরে বের হয়েছে। আশেপাশে মেঘদের গাড়ি নেই৷ তাই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ড্রাইভার আংকেল কে ফোন দিবে ভাবলো। হঠাৎ বাইক নিয়ে আবির হাজির হলো,
হেলমেট পরা, সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট,কালো সু, হাতে কালো ফিতার ঘড়ি, শার্টের বোতামের ফাঁকে সানগ্লাস ঝুলানো। মেঘের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে ডাকল,
“মেঘ”
মেঘ আর বন্যা দুজনেই ডাক শুনে সেদিকে তাকিয়েছে৷ মেঘ এক পলক তাকাতেই চিনতে পারলো। আবিরকে এভাবে দেখে আবারও নতুন করে ক্রাশ খেয়েছে। মেঘ মনে মনে ভাবছে,
” ওনি এখানে কেনো? ওনি কি আমায় নিতে এসেছেন? কই সেদিন তো মীম আর আদিকে ধমকে বললেন, কাউকে বাইকে উঠাবে না, তারমানে আমাকেও নিশ্চয় উঠাবেন না! না উঠাক, ওনার বাইকে উঠতে আমার বয়েই গেছে! কিন্তু ওনি আসলো কেনো, আল্লাহ জানেন কোন পাপের শাস্তি দিতে এখানে এসেছেন। আল্লাহ বাঁচাও!”
এসব হাবিজাবি ভাবনায় ব্যস্ত মেঘ৷ এদিকে বন্যা মেঘের হাত ঝাপটে ধরে আছে। আবির মেঘের দিকে খানিকক্ষণ সুস্থির বনে তাকিয়ে আছে, হয়তো মেঘের অভিব্যক্তি বুঝার চেষ্টা করছিলো। এবার হেলমেট খুলে মেঘের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলল,
‘উঠ’
মেঘ অজানা ঘোরে আঁটকে আছে, আনমনে হাবিজাবি ভাবনায় ব্যস্ত৷ আবিরের কথা কানেই গেল না৷ বন্যাও মনেযোগ দিয়ে ছেলেটাকে দেখছে, আগে কখনোই এই ছেলেকে দেখে নি। বন্যা তানভিরকে অনেকবার দেখেছে কিন্তু আবিরকে ঠিকমতো চিনে না৷ বন্যা মনে মনে আওড়ালো,
“এই ছেলে কে? মেঘকে বাইকে উঠতে বলছে কেনো?”
বন্যা মেঘে হাতটা আরও শক্ত করে ধরে আছে। আবির এবার ধ*মকে উঠল,
“এই মেঘ, উঠতে বললাম তো!”
মেঘ এবার চমকে উঠে। গোল গোল চোখে তাকায়, পরপর দুবার জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে৷ তারপর বন্যার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
“ওনি আবির ভাই”
তৎক্ষনাৎ বন্যা মেঘের হাত ছেড়ে দিল, হয়তো আবিরের রাগী চোখ মুখ দেখে কিছুটা ভয়ও পেয়েছে। মেঘ কয়েকপা এগিয়ে আবিরের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। ততক্ষণে আবির বাইক থেকে নেমে গেছে।
আবির মেঘের দিকো স্পষ্ট চোখে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“এই, তুই কি কিছু খাস?”
মেঘ কপাল কুঁচকে বললো,
“মানে? কি খাবো?”
“কোন দুনিয়ায় থাকিস তুই? ডাকলে শুনিস না”
মেঘ চুপচাপ মাথা নিচু করে রইলো। আবির আবারও বলল,
” বাইকে উঠ।”
আবির মেঘকে বাইকে উঠতে বলছে, এটাও সম্ভব? মেঘ নিজের কানতে বিশ্বাস করতে পারছে না। মেঘের হেলদোল নেই দেখে আবির বাইক থেকে হেলমেট নিয়ে নিজেই মেঘকে পরিয়ে দিল। তারপর পুনরায় বাইকে বসে গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলল,
“তুই কি উঠবি?”
এতকিছু না ভেবে মেঘ হাসিমুখে বাইকে উঠে বসল। আবিরের গায়ের সাথে গা লাগতেই কেঁপে উঠল কিছুটা। মেঘ কাঁধে হাত রাখবে নাকি রাখবে না তা নিয়ে দুটানায় আছে। এমনিতেই জীবনে প্রথম বাইকে উঠছে তারউপর আবার আবির ভাইয়ের বাইকে । আবির মেঘের মনের অস্থিরতা বুঝে শীতল কন্ঠে বলল,
“ধরে বস না হয় পরে যাবি”
মেঘ কাঁপাকাঁপা হাতে আবিরের কাঁধে হাত রাখলো। সঙ্গে সঙ্গে মেঘের হৃৎস্পন্দনের মাত্রা বাড়তে লাগলো।
এদিকে বন্যা নির্বাক চোখে তাকিয়ে দেখছে আর ভাবছে,
“মেঘের বর্ণনায় কোনো ভুল ছিল না, আবির ভাইয়া সত্যি ই অসাধারণ। যেকোনো মেয়েই এক দেখাতে ক্রাশ খাবে।”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবির বাইক স্টার্ট দিল, মনের ভ*য়ে মেঘ আবিরের কাঁধে জোড়ে চেপে ধরল। মেঘের কান দিয়ে শা শা করে মৃদু বাতাস ঢুকছে, প্রথমবার বাইকে উঠার অনুভূতি অসাধারণ। মেঘ নিভু নিভু চোখে চারপাশ দেখার চেষ্টা করছে। বেশকিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছে গেল, “বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে”
আবির মেঘকে শপিং এ নিয়ে আসছে ভাবতেই মেঘ আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছে। এত খুশি রাখার জায়গা পাচ্ছে না।
আবির মেঘকে নিয়ে একটা হিজাবের দোকানে গেল, রেগুলার পড়ার জন্য হিজাব চাইতেই দোকানদার জর্জেট হিজাবের বক্স বের করে দিলো। মেঘের বুঝতে বাকি নেই, রবিবারে বলেছিল হিজাব পড়ে যেতে কিন্তু মেঘ ওড়না মাথায় দিয়ে যাচ্ছিলো। কি করবে সে? মা আর বড় মা ছাড়া মেঘ একা শপিং এ যায় নি কখনো। বড় আম্মুরাও এখন শপিং করবেন না। তাই মেঘ ভেবেছিলো কিছুদিন ওড়না মাথায় দিয়ে যাবে তারপর ওনারা শপিং এ গেলে হিজাব নিয়ে নিবে। মেঘ বক্স থেকে বেছে বেছে ৩ টা আলাদা করেছে৷ তারপর আবিরকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এই তিনটা নিব?”
আবির মেঘের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দোকানদার কে জিজ্ঞেস করল,
“এগুলোর মধ্যে কয়টা কালার আছে আপনার কাছে?”
দোকানদার বললেন,
“ভাইয়া আপাতত ২৪ টা আছে, আপনি চাইলে আরও দিতে পারবো তবে কিছুদিন পরে নিতে হবে!”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“সবচেয়ে বড় সাইজের ২৪ টা কালারের ই হিজাব দেন।”
আবিরের কথা শুনে মেঘ তড়িৎ বেগে তাকাল। তৎক্ষনাৎ চোখ নামিয়ে শক্ত গলায় বলল,
“এতগুলো লাগবে না, ৩ টা হলেই হবে।”
আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়েছে, রাগে কটমট করে বলল,
“তোকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি?”
আবিরের রাগী চোখ দেখে ভ*য়ে সিটিয়ে পরলো মেঘ। আর কিছু বলার সাহসই পেল না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফুঁসছে । যেখানে তার কোচিং সপ্তাহে ৩-৪ দিন, ২-৩ টা হিজাব হলেই হয়ে যায় সেখানে ২৪ টা হিজাব নেয়ার কোনো মানেই হয় না। কিন্তু এই কথা কিভাবে বুঝাবে হিট*লারকে।
আবির নিজে পছন্দ করে আরও কয়েকটা পার্টি হিজাবও নিল। মেঘ মাথানিচু করে মনে মনে শুধু আবিরকে ব*কেই গেল। আবির শপিং ব্যাগ গুলো হাতে নিয়ে মেঘকে বলল,
“চল”
মেঘ মুখের উপর জিজ্ঞেস করে ফেলল,
” কোথায়?”
আবির রাগান্বিত কন্ঠে ফের বলল,
“কোথায় যাবো না যাবো কি তোরে বলে যেতে হবে?”
মেঘের নিজের মাথায় নিজের গাট্টা দিতে মন চাচ্ছে। আম্মু, বড় আম্মুকে আর বন্যাকে কথার পাল্টা ঝটপট প্রশ্ন করে অভ্যস্ত মেঘ। তাই আবিরকেও তেমনি জিজ্ঞেস করে ফেলেছে৷ আবিরের পেছন পেছন একটা জুয়েলার্সের দোকানে ঢুকলো মেঘ। আবির ঢুকেই একজনকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আজকে কি নেয়া যাবে?”
লোকটা হাসিমুখে উত্তর দিলেন,
” জ্বি ভাইয়া, দু মিনিট বসুন আমি বের করে দিচ্ছি। ”
২ মিনিটের মধ্যেই লোকটা পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “ভাইয়া প্যাকিং করে দিবো?”
আবির তৎক্ষনাৎ জবাব দিল,
“প্যাকিং লাগবে না, রেডি হলে আমাকে দেন।”
লোকটা ১ জোড়া নুপুর আবিরের দিকে এগিয়ে দিল।
মেঘ উৎসুক জনতার ন্যায় নুপুর ২টা দেখছে, অনেক মোটা আর খুব সুন্দর ডিজাইনের ২ টা নুপুর। আবিরের আকস্মিক কর্মকাণ্ড দেখে মেঘ কারেন্টের খাম্বার ন্যায় স্তব্ধ হয়ে গেছে। আবিরের এক হাঁটু ফ্লোরে আরেকটা পা স্বাভাবিক রেখে নিচে বসেছে। যেভাবে প্রপোজ করে অনেকটা সেভাবে। সহসা মেঘের এক পা নিজের হাঁটুর উপর রেখে একটা নুপুর পরিয়ে দিল।
এদিকে মেঘের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার অবস্থা, হৃদপিণ্ডের কম্পনের তীব্রতা বুঝতে পেরে মনে হচ্ছে এই যাত্রাই আর বাঁচবে না। আবিরকে না করার শক্তিটুকুও পাচ্ছে না। মেঘ খাম্বার মতোই স্থির, যা হওয়ার তা শরীরের ভিতরে হচ্ছে, র*ক্ত সঞ্চালনের মাত্রা বাড়ছে, মনে হচ্ছে এই বুঝি প্রেশার বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
দু পায়ে নুপুর পরিয়ে আবির চেয়ারে বসলো। মেঘের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
“দেখ, কেমন লাগছে ”
মেঘ তখনও নিষ্পলক চোখে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তোকে নুপুর দেখতে বলেছি, আমাকে না! ”
আবিরের কথায় দোকানদার জোরে হাসি শুরু করেছে৷ ততক্ষণে মেঘ স্বাভাবিক হলো, পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি পায়ের দিকে তাকালো।
সত্যিই অনেক সুন্দর লাগছে, মেঘের ফর্সা পায়ে নুপুরগুলো দেখতে অন্যরকম লাগছে। মেঘ খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
“অনেক ধন্যবাদ, আবির ভাই”
আবির দোকানের বিল পরিশোধ করে মেঘকে নিয়ে কাছাকাছি একটা রেস্টুরেন্টে গেল। মেঘের বার বার মনে হচ্ছে, এইসব কিছু স্বপ্ন, একটু পর ঘুম ভাঙবে আর সব শেষ হয়ে যাবে। রেস্টুরেন্টে বসে আবির মেঘের দিকে ম্যানু কার্ড এগিয়ে দিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“তোর যা খেতে ইচ্ছে করে অর্ডার দে।”
মেঘ নিজের পছন্দ মতো কাচ্চি সাথে বোরহানির কথা বললো৷ আবির ওয়েটারকে ডেকে ২ টা কাচ্চি দিতে বলল, সাথে ২ গ্লাস বোরহানি। মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আবির ভাই, আপনার কি কাচ্চি পছন্দ? ”
আবির বেশ বিরক্ত হয়ে বললো,
“আমার পছন্দ অপছন্দ জেনে তোর কাজ নেই৷ ”
সহসা মেঘের মুখটা চুপসে গেছে। খাবার আসায় দুজন চুপচাপ খাবার খেল। মেঘ অবশ্য খেতে খেতে কয়েকবার চোখ তুলে আবিরকে দেখছিলো কিন্তু আবিরের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই৷ সব কাজ শেষে আবির বাইকে উঠতে যাবে এমন সময় মেঘ আবিরকে ডাকল,
“আবির ভাই”
“হুমমম”
“না, কিছু না!”
আবির এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল। কন্ঠ তিনগুন ভারি হলো, রাগান্বিত স্বরে বলতে শুরু করল,
“তোকে হিজাব আর নুপুর দিয়েছি বলে খুশিতে বেশি লাফাইস না! মাথায় ওড়না দিয়ে বউয়ের মতো চলাফেরা যাতে না করতে পারিস সেজন্য হিজাব দিয়েছি। আর তুই সারাক্ষণ টুইটুই করে কোথায় কোথায় ঘুরিস সেসব জানতে নুপুর দিয়েছি।”
আবিরের এমন কথা শুনে মেঘ আহাম্মক বনে গেল। মনে মনে কি না কি ভাবছিলো সে। আবির ভালোবেসে গিফট দিচ্ছে, আহা কি সুন্দর অনুভূতি হচ্ছিলো সবকিছু মুহুর্তেই বিলীন হয়ে গেছে। অষ্টাদশীর মনের ভেতর নবজাগ্রত অনুভূতিতে আবির সযত্নে এক বালতি পানি ঢেলে দিল। আবির কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“উঠ”
মেঘ ভ*য়ে ভ*য়ে চুপচাপ উঠে বসল, তবে মনে মনে ঠিক করল,
“এবার আর আবিরকে ধরে বসবে না। ”
আবিরের ধম*কে মেঘের ভাবনার সুতা ছিঁড়লো। আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“এক কথা তোকে কতবার বলতে হয় মেঘ? ধরে বস না হয় তোকে রাস্তায় ফেলে চলে যাব।”
ধমক খেয়ে মেঘের ছোট দেহ কম্পিত হয়, সহসা শক্ত হাতে আবিরের কাঁধ চেপে ধরে । আবির আর কিছুই বলল না, বাসার সামনে পর্যন্ত আসলো কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না। আবির বাসার সামনে বাইক থামিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“বাসায় যা”
মেঘ বাইক থেকে নেমে, আবিরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি যাবেন না?”
“না”
“কোথায় যাবেন?”
আবির বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“তুই কে যে তোকে আমার সবকিছু বলে যেতে হবে? আর একবার আমার মুখের উপর প্রশ্ন করবি সঙ্গে সঙ্গে থা*প্পড় দিব!”
মেঘের মুখটা চুপসে গেছে, চিবুক নামিয়েছে গলায়, পাতলা ওষ্ঠে বিড়বিড় করে বললো,
“হিট*লার একটা। ”
আবিরের তৎক্ষনাৎ জবাব এলো,
“আমি হি*টলার হলে তুই কি?”
“আবির শুনে ফেলছে?”
ভেবেই আঁতকে উঠলো মেঘ, আবিরের দিকে দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস হলো না। আবিরের থা*প্পড়ের ভয়ে ছুটে পালালো বাড়ির ভিতর। আবির নিষ্পলক চোখে অষ্টাদশীর পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে, নুপুরের ঝনঝন শব্দ কানে লাগছে৷ আচমকা আবিরের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির ঝলক দেখা গেল।
চলবে….
#পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
মেঘ এক ছুটে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। সোফায় বসে গল্প করছিলো মালিহা খান, হালিমা খান আর আকলিমা খান।
মেঘকে ছুটতে দেখে দৃষ্টি পরলো সেদিকে।
আকলিমা খান ডেকে বললেন,
“মেঘ কি হয়ছে তোর, এভাবে ছুটছিস কেনো?”
মেঘ সিঁড়ির নিচে এসে থামলো, হাঁপাচ্ছে মেয়েটা, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে আর বার বার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। আবির ভাই বলেছে কোথায় যাবে তারপরও যদি কোনো কারণে বাসায় চলে আসে, এই আশংকায় বার বার তাকাচ্ছে মেঘ।
হালিমা খান সূক্ষ্ম নজরে মেঘের পায়ের দিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুই নুপুর পেলি কোথায়?”
মেঘ এবার দরজার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মা কাকিয়ার দিকে তাকালো, অকস্মাৎ বলে উঠলো,
“আবির ভাই দিয়েছে! ”
হালিমা খান, মালিহা খান আর আকলিমা খান তিনজন অবাক হয়ে চোখাচোখি করলো কিছুক্ষণ,
মালিহা খান পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
“আবির তোকে নুপুর দিয়েছে মা?”
মেঘ এবার স্পষ্ট দৃষ্টিতে তাকালো, একটু রাগী রাগী ভাব নিয়ে বললো,
“আবির ভাই ই দিয়েছে বড় আম্মু! তোমার ছেলে না দিলে কি তোমার ছেলের কথা বলতাম আমি?”
হালিমা খান কয়েক মুহুর্ত নিরব থেকে আবার বললেন,
তোর মনে আছে মেঘ, “আবির বিদেশ যাওয়ার ৬ মাস আগে, তোর নুপুর গুলো তোর থেকে আমি নিয়ে নিছিলাম! ”
মেঘ কিছুক্ষণ ভাবলো তারপর বললো,
“হ্যাঁ আম্মু মনে পরছে, ঐ নুপুর গুলো কোথায়?”
হালিমা খান সহসা উত্তর দিলেন,
“ঐগুলো তো আমার কাছেই আছে। কিন্তু সেদিন নুপুর গুলো আমি নিজের ইচ্ছে তে নেই নি। আবির ই বলেছিলো নিতে৷”
মেঘ চমকে উঠলো মায়ের কথায়, ছুটে এসে বসলো সোফায়,
“কি হয়ছিলো বলো আম্মু, কেনো নিয়েছিলে?”
হালিমা খান একটু ভেবে চিন্তে বললেন,
“তেমন কিছু না, আবির আমার কাছে এসে বলেছিলো, তোর পায়ের নুপুরের শব্দ নাকি ওর মাথায় ধরে, ঘুমাইলে তুই দৌড়াদৌড়ি করিস,ঝনঝন করলে ওর মাথা ব্যথা করে,পড়তে পারে না। তাই বলছিলো নুপুর খুলে রেখে দিতে৷
তাই আমিও আবিরের কথামতো তোর থেকে নুপুর নিয়ে নিছিলাম৷ এরপর তুই ও আর কখনো চাস নি, আমিও আর তোকে দেয় নি । ২-১ বছর পর মনে হয়ছিলো আমার কিন্তু বের করে দেখি এগুলো তোর লাগবে না। এজন্য তোর আব্বুকে বলে রাখছিলাম, তুই চাইলে তোকে যেনো নুপুর বানিয়ে দেয়, তখন তো আবির ছিল না।।
এজন্যই আজকে তোর পায়ে নুপুর দেখে আমরা অবাক হচ্ছিলাম। ”
মেঘ ভাবনায় পরে গেলো,
“ছোটবেলায় আবির ভাই নুপুর খুলতে বললে এখন ওনি নিজের হাতে কেনো পরিয়ে দিলেন, এখন কি ওনার মাথা ব্যথা ভালো হয়ে গেছে? তৎক্ষনাৎ মনে হলো আবির ভাইয়ের কথা, তাহলে কি সত্যি আমার চালচলন পর্যবেক্ষণ করতেই নুপুর গুলো দিয়েছেন নাকি ছোটবেলার কথা ভেবে মনটা নরম হয়েছে ওনার।”
আকলিমা খান হাসিমুখে বলে উঠলেন,
“ঐসব বাদ দে৷ শপিং ব্যাগে কি রে মেঘ?”
মেঘ কাকিয়ার কথায় স্বাভাবিক হয়ে বললো,
“হিজাব”
কেউ আর কিছু বললো না, তারা তাদের আড্ডায় মনোযোগ দিলো
মেঘ ও শপিং ব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি তে উঠায় ব্যস্ত হলো..
রাতে আর আবিরের সাথে মেঘের দেখা হয় নি।
★★★★
প্রতিদিনের মতো আজকেও সকাল ৮ টায় অফিসের জন্য রেডি হয়ে খেতে বসেছে আবির,মেঘ ইচ্ছে করেই আজ সেজেগুজে খেতে নামবে ভাবলো, চুল ছাড়ায় সেগুলো কোমড় ছাড়িয়ে পরেছে , মাথায় পিচ্চি বাচ্চার মতো একটা পুতুলের বেল ও দিয়েছে, কালো জামা পরেছে সাথে ম্যাচিং কালো ওড়না, ওষ্ঠদ্বয়ে হালকা গোলাপি রঞ্জকও লাগিয়েছে,
সিঁড়ি দিয়ে নামছে, আবির এক পলক তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে রইলো, মেয়েটা এমনিতেই অনেক ফর্সা,তারমধ্যে কালো জামা পরাতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে, সাথে চুল গুলো ছাড়া থাকাতে মায়াবন বিহারির মতো লাগছে অষ্টাদশীকে।।
আবির চোখ সরাতে পারছে না,অবিচলিত আঁখিতে তাকিয়ে আছে অষ্টাদশীর পানে,
হঠাৎ তানভির ডেকে উঠলো,
“ভাইয়া তুমি কি আজ ফ্রী আছো?”
মনোযোগ নষ্ট হলো আবিরের, মেঘের দিক থেকে চোখ নামালো, তানভিরের দিকে না তাকিয়েই বললো,
“কেনো?”
“আজকে আমাদের হবু এমপির জন্মদিন, ওনি তোমার কথা বলছিলেন, তুমি দেশে আছো জেনে খুব করে বললেন তুমি যেতে।। ”
আবিরের স্বাভাবিক জবাব,
“কখন যেতে হবে?”
তানভির: ৬ টায়
আবির: আচ্ছা ঠিক আছে।
মেঘ এতক্ষণে টেবিলের কাছে চলে এসেছে, তিন কর্তায় যেনো ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো৷
সকলেই এক নজর পায়ের দিকে তাকালো কিন্তু কেউ তেমন কথা বললো না।
অবশ্য কথা বলারও কিছু নেই। মেয়েদের সাজুগুজুতে বাবা, চাচারা নাক গলায় না সচরাচর, বরং তারা চায় বাড়ির মেয়েরা সবসময় হাসিখুশি থাকুক।
মেঘ চেয়ার টেনে বসলো আবির ভাইয়ের বিপরীতে, এক পলক তাকালো, আবির ভাইও আজ কালো শার্ট পরেছে৷ আবির ভাই সবসময় সাদা অথবা কালো শার্ট ই পড়েন। হঠাৎ কফি কালার বা আসমানি বা হালকা কোনো কালার পড়েন। শুধু পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়৷
ড্রেস মিলে যাওয়াতে মেঘের মাথা নিচু করে মুচকি হাসলো।।
ইকবাল খান তানভিরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোদের হবু এমপি আবিরকে কিভাবে চিনে?”
তানভিরের সহজ সরল উত্তর,
আমি একটা প্ল্যান দিয়েছিলাম ওনাকে, প্ল্যান কার্যকর হওয়ায় খুশি হয়ে হবু এমপি বলছিলেন,
“তোমার মাথায় এত প্ল্যান আসে কিভাবে? ”
আমি তখন বলেছি,
” আমায় বেশিরভাগ প্ল্যান ভাইয়া দেন। আমি ভাইয়াকে প্রবলেম শেয়ার করি তারপর ভাইয়া আমায় প্ল্যান দেয়৷ ‘
তখনই এমপি বলছিলেন তাহলে তোমার ভাইয়াকে নিয়ে আইসো। তখন ভাইয়া বাহিরে ছিলেন।
আজ ওনার জন্মদিন তাই সকাল বেলা ওনি নিজে আমায় কল করে জিজ্ঞেস করলেন ভাইয়া আসছে কি না, আমি হ্যাঁ বলাতে ওনি নিজেই বার বার বললেন ভাইয়াকে নিয়ে যেতে৷ ”
ইকবালের খানের সাথে মোজাম্মেল খান এবং আলী আহমদ খান ও যেনো মনোযোগ দিয়ে তানভিরের কথা গুলো শুনছিলো। মোজাম্মেল খান সবসময় ই চুপচাপ থাকেন৷ যা সিদ্ধান্ত সকল কিছু বড় ভাইয়ের৷
তানভিরের এসব কথা শুনে আলী আহমদ খান রাগে ফুঁসছেন, রাগান্বিত স্বরে বললেন,
“আবির, আমি কিন্তু তোমায় আগেই সাবধান করেছি! রাজনীতিতে তুমি জরাবে না। ”
আবির নিরুদ্বেগ কন্ঠে উত্তর দিলো,
“আমি তো বলেছি রাজনীতি করবো না!”
“তাহলে তানভির কে রাজনীতি নিয়ে প্ল্যান দাও কেন, রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাও কেন, আর এমপির জন্মদিনে যেতে এক কথায় রাজি হলে কেনো?
এই বুদ্ধি, প্ল্যান ব্যবসায় লাগালে আমাদের ব্যবসাটা আরও এগুতো৷ ”
গম্ভীর কন্ঠে একটানা কথাগুলো বললেন, আলী আহমদ খান।
মেঘ, মীম আর আদি চুপচাপ খাচ্ছে। বাবা, চাচার কথায় কোনো মনোযোগ নেই তাদের। মেঘ খাচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে, আবার একটু পর পর আবির ভাইয়ের দিকে পিটপিট করে তাকাচ্ছে।
আলি আহমদ খানের কথায় আবির খাবার প্লেট থেকে চোখ তুলে তাকালো, রাশভারী কন্ঠে বলা শুরু করলো,
“”তোমাদের কয়েকবছর যাবৎ একটায় সমস্যা , তানভির কেনো রা*জনীতি করে, মেইন কথা তোমরা রা*জনীতি পছন্দ করো না৷ কিন্তু আমি মন থেকে চাই তানভির রা*জনীতি করুক এবং সেটা মাঝপথে ছাড়ার জন্য না৷ সভাপতি, এ*মপি,ম*ন্ত্রী পদে পদে নিজের সাফল্য বয়ে আনুক এবং আমার বিশ্বাস আমার ভাই সফল হবে, ইনশাআল্লাহ।
কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বলা শুরু করলো,
প্রতিটা বিষয় আমরা নিজেরা যখন ভাবি তখন একতরফা ভাবি, মনে হয় আমি যা ভাবছি সেটায় ঠিক, এটা করলেই পারফেক্ট হবে। কিন্তু সব দিক থেকে সেটা পারফেক্ট নাও হতে পারে৷ তাই তানভির পরিস্থিতি বুঝে নিজে যা ভাবে সেটা আমায় জানায় যদি ভাবনা ঠিক থাকে তাহলে আমি বলি ঠিক আছে, না হয় আমি সাজেশন দেয় এটা এভাবে না করে ওভাবে কর। এতটুকুই। এই কথাগুলো তানভির চাইলে আমায় না বলে তাদের কমিটির লোকজন কে বলতে পারতো কিন্তু তানভিরের যেহেতু ইচ্ছে সভাপতি হওয়ার, তার প্ল্যান সভাপতি জানলে সে কাজ করবে তখন তানভিরের নাম থাকবে না। এজন্য তানভির আমায় শেয়ার করে৷
আরেকটা বিষয় হলো ব্যবসা । আমি ব্যবসায় ঢুকেছি মাত্র ১ সপ্তাহ হলো, আমি সবকিছু বুঝে নেয় ঠিকমতো তারপর দেখো ব্যবসায় মনোযোগ দিতে পারি কি না।
এমপির জন্মদিনে যেতে রাজি হওয়ারও কারণ আছে।
এবার বাবা চাচাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে, চোখ নামিয়ে বলা শুরু করলো,
তোমরা এখন নামি-দামি ব্যবসায়ী। একসময় তোমাদের ব্যবসাও অনেক ছোট ছিল। অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়ছে তোমাদের। তখন আমি ছোট ছিলাম তবুও যতটা সম্ভব বুঝেছি৷ বর্তমানে আমি নতুন ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছি। আমারও কাগজপত্র নিয়ে অনেক জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করতে হবে। অনেক বিত্তবানদের সঙ্গে ব্যবসার দিক থেকে টক্কর লাগবে। শুধু টাকা থাকলেই সবকিছু করা সম্ভব হয় না সাথে পা*ওয়ার প্রয়োজন হয়। অনেক সময় পুলিশের থেকেও রা*জনৈতিক পাও*য়ার বেশি কাজে লাগে৷ আইনি ভাবে যে বিষয় সমাধান করতে মাসের পর মাস লেগে যায় সেটা বড় বড় নে*তাদের একটা কলে*ই সলভ হয়ে যায়। তানভিরের যেহেতু রাজনীতি তে আগ্রহ আছে তাহলে সে মনোযোগ দিয়ে রাজনীতি করুক। আমি ব্যবসা সামলায়। তানভির ভালো অবস্থানে থাকলে,আর আমি মোটামুটি পরিচিত থাকলে আমাদের যেকোনো প্রয়োজনে আশেপাশে মানুষের সাহায্য পাবো।”
এতগুলো কথা বলে এবার আবির থাকলো।
মেঘ হা করে তাকিয়ে আছে আবির ভাইয়ের দিকে আর ভাবছে,
” কি দূরদর্শী চিন্তাভাবনা আবির ভাইয়ের, মেঘ মনে মনে নিজেকে বাহবা দিচ্ছে, আবির ভাইয়ের জন্য হি*টলার নাম টা একদম ঠিক ঠাক। ”
আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান এবং ইকবাল খান তিনজনই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে৷
ইকবাল খান সহসা বলে উঠলেন,
“দেখেছো ভাইয়া, আবিরের চিন্তা ভাবনা কত দূর৷ আগে থেকেই ভেবে চিন্তে মাঠে নেমেছে। তুমি খামোখা চিন্তা করো ওর জন্য। দেখবে আমাদের ব্যবসাতে খুব শীগ্রই পরিবর্তন আসবে ইনশাআল্লাহ। ”
আলী আহমদ খান আর কথা খোঁজে পেলেন না। খাওয়া শেষ করে উঠে গেলেন।
মোজাম্মেল খান তানভিরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমাদের মান না রাখ, আবিরের মান অন্ততঃ রাখিস ”
তানভির শীতল কন্ঠে জবাব দিলো,
“আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো ভাইয়াকে সব দিক থেকে সাহায্য করার। ”
সকলেই নিরব, এতক্ষণে মোটামুটি সবার খাওয়া শেষ। সবাই সবার মতো উঠে যাচ্ছে। আবিরের খাওয়া শেষ হতেই যেই না উঠতে যাবে,
নজর পরলো অষ্টাদশীর পানে, কাজল পরিহিতা টানাটানা চোখ,গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে,
আবির টেনে হিঁচড়ে দৃষ্টি সংযত করলো, হালকা করে কাশি দিলো,
মেঘ এখনও বিভোরে তাকিয়ে আছে।
আবির এবার দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো,
“মুখ টা বন্ধ কর মেঘ, মাছি ঠুকবে মুখে”
মেঘ নড়েচড়ে বসলো, আবির ততক্ষণে বেসিনে চলে গেছে হাত ধুতে।
মেঘ নিজের মাথায় নিজে গাট্টা দিলো,
“ছিঃ আবির ভাই কি ভাবলো, যতই মন শক্ত করি, আহাম্মকের মতো আবির ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকবো না ভাবি, ততই যেনো আবির ভাইয়ের কাছে বেকুব সাজতেছি৷ ”
সেই যে মাথা নিচু করে খাচ্ছে আর মনে মনে নিজেকে ব*কতে ব্যস্ত, আবির ভাই কখন ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়েছেন সেদিকেও নজর নেই মেঘের৷
খাওয়া শেষ করে রুমে গিয়ে পড়তে বসেছে। আজ কোচিং, প্রাইভেট নেই তাই ৩ টা পর্যন্ত টানা পড়াশোনা করেছে। তারপর গোসল করে খেতে এসেছে৷
বিকেল হয়ে গেছে তাই কাকিয়া আর বড় আম্মু ঘুমাচ্ছেন, হালিমা খানও শুয়ে ছিলেন মেঘের সিঁড়িতে নামার সময় নুপুরের শব্দে বেড়িয়ে এসে খাবার দিলেন মেঘ কে,
মেঘ চুপচাপ খাবার খাচ্ছে।
হালিমা খান পাশে চেয়ারে বসে শান্ত কন্ঠে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,
“পড়াশোনা ঠিকমতো করছিস তো মা?”
মেঘ উপর নিচ মাথা নাড়লো শুধু।
হালিমা খান: আর তো কয়েকটা দিন এরপর ই তো রেজাল্ট দিয়ে দিবে। তারপর ই তো ভর্তি পরীক্ষার যু*দ্ধ শুরু হয়ে যাবে।
মেঘ চুপচাপ খাওয়া শেষ করে সোফায় বসে টিভি দেখছিলো।। হালিমা খান সব গুছিয়ে মেয়ের পাশে বসলেন।
মেঘ কিছুক্ষণ পর মায়ের উরুর উপর মাথা রেখে শুয়ে পরলো, হালিমা খানও সযত্নে মেয়ের মাথায় হাতবুলিয়ে দিচ্ছেন, বিকেলে গোসল করাতে চুলগুলো এখনও ভেজা।।
হালিমা খান একটু রাগে রাগে বললেন,
“সারাদিন বাসায় থেকেও বিকেলে গোসল করিস কেনো, ঠিকমতো না খেলে, ঠিক মতো গোসল না করলে অসুস্থ হয়ে পরবি, তখন তো পড়তেই পারবি না।”
মেঘ চুপচাপ মায়ের হাঁটু আঁকড়ে শুয়ে আছে।
ততক্ষণে ৫ টা বেজে গেছে। আবির আজ একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছে অফিস থেকে। ৬ টায় এমপির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যেতে হবে।
বাড়িতে ঢুকে চুপচাপ সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে। পায়ের শব্দে হালিমা খান তাকিয়ে দেখলেন আবির,
হালিমা খান কোমল কন্ঠে বললেন,
“এত তাড়াতাড়ি চলে এলি যে, কফি দিব তোকে?”
আবিরের দৃষ্টি পরে সোফায়, হালিমা খানের উরুতে শুয়া মেঘকে দেখে বুকের ভেতর ছ্যাত করে উঠে আবিরের।
মায়ের কথা শুনে মেঘ ও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, চোখ পরে সিঁড়ির কাছে আবির ভাইয়ের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে উঠে বসলো।
আবির তৎক্ষনাৎ তড়িৎগতিতে মেঘের কাছে আসে, ভয়ার্ত কন্ঠে বললো,
“কি হয়েছে তোর?”
বলতে বলতে কপালে, গালে,গলায় হাত রাখলো একবার।
আবির ভাইয়ের উষ্ণ হাতের ছোঁয়ায় কেঁপে উঠলো অষ্টাদশী।
আবির হাত সরিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে পুনরায় প্রশ্ন করলো,
“শরীর খারাপ লাগছে? মাথা ব্যথা করছে?”
মেঘ যেনো বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবির ভাইয়ের অভিমুখে। আবির ভাইয়ের কপাল ঘামে চিকচিক করছে।
হালিমা খান অভিযোগের স্বরে বললেন,
“আরে দেখ না সারাদিন বাসায় থেকেও অসময়ে গোসল করে, এত লম্বা চুল শুকাতে তো সময় লাগে নাকি। নিজের কোনো যত্ন নেয় না কিছু না।”
আবির সহসা বলে উঠলো,
“মামনি একটু কফি করে দিবা প্লিজ?”
হালিমা খানের সরল উত্তর,
তুই বস একটু, এখনি নিয়ে আসছি।
হালিমা খান উঠে রান্না ঘরে গেলেন, আবির ঘুরে গিয়ে হালিমা খানের জায়গায় বসলেন,
মেঘ নিচের দিকে চেয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে বসে আছে, শীর্ণ বক্ষ ধড়ফড় করছে অষ্টাদশীর।
আবির ক্ষুদ্র চোখে তাকিয়ে আছে অষ্টাদশীর পানে, নিরুদ্যম কণ্ঠে শুধালো,
“কি হয়েছে তোর? মন খারাপ? ”
মেঘের দুনিয়া ঘুরছে, মনের ভিতর টালমাটাল অবস্থা। হৃদপিণ্ড ছুটছে দ্বিকবিদিক।।
কিছু সেকেন্ড পর, কোনোরকমে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লো।
আবির একটু চুপ থেকে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“কেউ বকেছে তোকে?”
সহসা মেঘের জবাব,
“কেউ বকে নি!”
আবির এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো, বেশ ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“তাকা আমার দিকে!”
মেঘ এবার দ্বিতীয় দফায় ধাক্কা খেলো, মেঘ নড়ে উঠলো, কাঁপা কাঁপা চোখে তাকালো আবির ভাইয়ের চোখের দিকে৷ আবির ভাইয়ের শীতল চাউনিতে অষ্টাদশীর মনে ঝড় শুরু হয়েছে। সাগরের গভীরতার ন্যায় চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা সম্ভব হলো না মেঘের । চটজলদি মাথা নিচু করে ফেললো।
আবির তখনও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অষ্টাদশীর দিকে।
আবির কিছুটা ভেবে শক্ত কন্ঠে বললো,
“মেঘ, আমি এই বাড়ির সিঙ্গেল একটা মানুষের মুখেও তোর নামে অভিযোগ শুনতে চাই না”
মেঘের অভিব্যক্তি বুঝা গেলো না, চিবুক গলায় নেমেছে৷ নিজের মনের উথাল-পাথাল পরিস্থিতি সামলাতে ব্যস্ত অষ্টাদশী।
আবির কপাল গোটায়, হঠাৎ ই পল্লব ফেলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শ*ক্ত চাউনিতে মেঘের দিকে তাকায়,
“কাল থেকে বিকালে কোচিং এ যাবি। ওনাদের ৩ টায় ব্যাচ আছে। প্রতিদিন ১১ টায় গোসল করবি, ১ টার পর নামাজ পরে খেয়ে প্রাইভেটে যাবি তারপর কোচিং শেষ করে বাসায় আসবি। আমি কোচিং এ কথা বলে নিবো। ”
এতক্ষণে হালিমা খান কফি নিয়ে হাজির হলেন,
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“মামনি, মেঘ কাল থেকে ১১ টায় গোসল করবে, আর বিকালে কোচিং যাবে।৷ ওর গোসলের টাইম যদি ১ মিনিট এদিক সেদিক হয় তুমি সঙ্গে সঙ্গে আমায় কল করবা। ”
এতটুকু বলেই কফির কাপ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ধপধপ করে উপরে চলে গেলো।
মেঘের হৃদপিণ্ড দুভাগ হয়ে গেলো আবির ভাইয়ের কথায়। এতদিন মনের ভেতর শুধু তু*ফান চালিয়েছে এই লোকটা। এখন মেঘের জীবনেও তুফা*ন চালাচ্ছেন। বন্যা তো ১০ টার ব্যাচে যাবে, মেঘ একা একা বিকালে পড়তে যাবে৷ ওখানে তো কাউরে চিনে না ভাবতেই আ*হত হলো মনটা।
ঠায় সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে মেঘ। হালিমা খান মেঘকে এক কাপ কফি এনে দিলেন। মেঘ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে কফি খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।
কিছুক্ষণ পর মেঘ সিঁড়ি দিয়ে উঠছে রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। তখন ই সিঁড়ি দিয়ে ব্যস্ত পায়ে নামছে আবির ভাই, এমপির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য রেডি হয়েছেন,
খয়েরি রঙের শার্ট কনুই পর্যন্ত হাতা ভাজ করা, কালো প্যান্ট দিয়ে ইন করা, নতুন শো জুতা, চোখে নতুন একটা সানগ্লাস, চুল গুলো খুব সুন্দর করে স্টাইল করা৷
এক পলক তাকাতেই মেঘ থমকে দাঁড়ালো সিঁড়িতে, আবির ভাইয়ের এক হাত পকেটে অন্য হাতের আঙুলে বাইকের চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে মেঘের পাশ কেটে নেমে গেলেন, মেঘ ওখানেই দাঁড়িয়ে পরেছে, বডি স্প্রের তীব্র গন্ধে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো আবির ভাইয়ের দিকে, যতক্ষণ দেখা গেলো ততক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো,
বিড়বিড় করে বললো,
“ওনার য*ন্ত্রণায় আমাকে পা*বনা যেতে হবে মনে হচ্ছে! ”
কিছুক্ষণ পর মেঘ রুমে চলে গেলো!
পেইজঃ Salma Chowdhury (scsalma90)
★★★★
তানভির সারাদিনেও বাসায় ফিরতে পারে নি সেই যে সকালে বের হয়েছিলো, সারাদিন নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত। বিকেলে বাহিরেই খেয়েছে। তারপর থেকে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কাজে ব্যস্ত। কোথায় কি রাখবে, কি ভাবে করবে, সভাপতি, সাধারণ সদস্য সকলেই ব্যস্ত।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর্যায়ে আবির উপস্থিত হলো। আবিরকে দেখে তানভির ছুটে এসেছে৷ পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন হবু এমপির সাথে৷ হ্যান্ডসেক করে মতবিনিময় শুরু করলেন দুজনে।
অনুষ্ঠান ভালোই ভালোই শেষ হলো৷ বেশ কিছু ছবিও তুলা হয়েছে। এমপির ফ্যামিলির সাথে, আবির তানভির এমপির দুপাশে দাঁড়িয়ে, কেক খাওয়ানো সহ আরও অনেক ছবি তুলা হয়েছে।
সেখান থেকেই ৪ টা ছবি আবির ফেসবুকে আপলোড করেছে সাথে জন্মদিনের ক্যাপশন দিয়ে।
অনুষ্ঠান শেষে তানভির বললো,
“ভাইয়া তুমি কি আমায় বাইকে লিফট দিবা নাকি রিক্সা করে বাড়ি যাব?”
আবির এক মুহুর্ত ভেবে উত্তর দিলো,
“আজ থেকে যেতে পারবি, সমস্যা নেই!”
তানভির খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে। ১০ দিনের মাথায় ভাইয়ের বাইকে উঠার অনুমতি পেলো।
বাইক চালাতে চালাতে আবির গম্ভীর কন্ঠে তানভির কে বললো,
“তোর কাছে মেঘের বান্ধবীর নাম্বার আছে?”
তানভির স্বাভাবিক ভাবেই বললো,
“হ্যাঁ আছে। কেনো ভাইয়া?”
আবির রাশভারি কন্ঠে বললো,
“তুই তাকে কল দিয়ে বলিস কাল থেকে যেনো ৩ টায় কোচিং এ যায়, মেঘের ব্যাচ টাইম চেইঞ্জ করে দিয়েছি সাথে তারটাও। কোচিং এর লোকের সাথে কথা বলেছি। মেঘের একা একা বিকেলে ভালো লাগবে না। ”
তানভিরের চিন্তিত স্বরে বললো,
“আবার কোনো সমস্যা হয়েছে ভাইয়া?”
আবির এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বললো,
“তোর বোন ঠিক মতো খায় না, গোসল করে না, পড়ে না কত অভিযোগ শুনতে হয়। এজন্য টাইম পাল্টে দিয়েছি, সাথে ওকেও ওয়ার্নিং দিয়েছি।”
তানভির আর কিছু বললো না। চুপচাপ দুই ভাই বাসায় ঢুকে যে যার মতো রুমে চলে গেলো।
পেইজ: গল্প কথা(golpokotha
★★★★
রাত তখন ১০.৩০+
তানভির ফোন থেকে বন্যা নামে সেইভ করা একটা নাম্বারে কল দিলো। দুবার দেয়ার পর রিসিভ হলো।
বন্যাঃ আসসালামু আলাইকুম।
তানভিরঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম
বন্যাঃ কে বলছেন?
তানভিরঃ আমি মেঘের ভাই।
বন্যা একটু ভ*য়ে ভ*য়ে বললো,
“আবির ভাইয়া?”
তানভিরের কিছুটা রাগ হলো, অকস্মাৎ বলে উঠলো,
“ভাইয়া তোমায় কল দিবে কেন, ভাইয়ার কি খেয়ে কাজ নাই যে তোমায় কল দিবে? ভাইয়া জীবনেও তোমায় কল দিবে না, শুধু তোমায় কেনো কোনো মেয়েকেই কল দিবে না! ”
বন্যা আস্তে আস্তে শুধালো,
“তানভির ভাইয়া?”
তানভিরঃ হ্যাঁ।
বন্যাঃ কোনো দরকার ভাইয়া?
তানভিরঃ শুনো তুমি কাল থেকে ২ টার ব্যাচে প্রাইভেট পড়বে আর ৩ টার ব্যাচে কোচিং করবে। মেঘও বিকালে কোচিং করবে। এটায় জানানোর জন্য কল দিয়েছি। ভুল করে আবার সকালে চলে যেয়ো না। আল্লাহ হাফেজ।
এতটুকু বলেই কল কেটে দিলো তানভির।
বন্যা খাটের উপর টাশকি খেয়ে বসে পরলো। কিছু ভাবতে পারছে না। কিছুক্ষণ স্থির থেকে তাড়াতাড়ি কল করলো মেঘকে।
১ বার বাজতেই কল রিসিভ করলো মেঘ।
বন্যাঃ এই পাগল, তোর কি হয়ছে রে? কাল থেকে এতবার কল দিচ্ছি কোনো খবর নাই তোর! সেই যে আবির ভাইয়ের সাথে বাইকে গেলি। কি হলো তাও বললি না, কি অ*ঘটন ঘটাইছিস তুই?
মেঘঃ আমি অ*ঘটন ঘটাই নি। আবির ভাই অঘটন ঘটাইছে৷ ওনি আমার মনের ভিতর ঢুকে আমার জীবনের ১৪ টা বাজায় দিছে। আমার খাওয়া,গোসল, ঘুম সবকিছুর নাজেহাল অবস্থা করে ফেলছে। ওনাকে যতবার দেখছি ততবারই ভেঙেচুরে যাচ্ছি আমি আমি। বারবার নতুন করে ক্রাশ খাই। কি করবো বল..!!
বন্যা এবার রাগে বললো,
রাত বিরাতে নে*শা করা ছেড়ে ঘুমা বাই।
কি জন্য কল দিয়েছিলো তা বলতেই পারলো না, মেঘের এসব হাবিজাবি কথা শুনতে তার এখন একটুও ভালো লাগছে না। কোথায় সিরিয়াস মুডে কল দিলো মেঘকে৷ মেঘ যেনো ঘো*রেই পরে আছে।
মেঘ ও আর কল ব্যাক করলো না।
★★★★
পেইজঃগল্প কথা (golpokotha70)
মেঘ ফেসবুকে ঢুকলো, ঢুকতেই সামনে আসলো আবির ভাইয়ের ৩ ঘন্টা আগে করা পোস্ট। ছবিগুলো খুব ভালো করে দেখছে মেঘ৷ টেনে টেনে বড় করে আবির ভাইকে মনোযোগ দিয়ে দেখছে। হঠাৎ ই একটা ছবি দেখে মেঘের দৃষ্টি স্থির হলো৷
আবির ভাইয়ের পাশে কড়া নীল রঙের একটা গাউন পরা মেয়ে। দেখেই মনে হচ্ছে শরীরে বড়লোক বড়লোক ভাব আছে একটা।
মেঘের পায়ের রক্ত চড়চড় করো মাথায় উঠছে।ঐ মেয়ে কে আর আবির ভাইয়ের পাশে ঐ মেয়ে কি করে। কমেন্ট চেক করতে গেলো মেঘ, অনেকগুলো কমেন্টের ভিড়ে ঐ নীল জামা পরিহিতার একটা আইডি চোখে পরলো। আবির ভাইদের ছবি তে কমেন্ট করেছে,
“আপনি অসম্ভব কিউট, ইচ্ছে করছিলো আপনাকে সবসময়ের জন্য রেখে দেয়। ইচ্ছে হলে বেড়াতে আসবেন আর সম্ভব হলে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট এক্সেপ্ট করবেন।”
রাগে শরীর ঘামছে মেঘের, শুয়া থেকে উঠে বসলো, কমেন্ট টাতে Angry রিয়েক্ট দিয়ে মেয়ের আইডিতে ঢুকলো।
প্রোফাইল পিকটা ২ ঘন্টা আগেই আপলোড করা, কভার ফটোতে হবু এমপির সাথে ছবি, ক্যাপশন (বাবা-মেয়ে)
মেঘের বুঝতে বাকি নেই এটা এমপির মেয়ে। একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। মেঘ রাগে ফুঁস ফুস করছে।
আবারও আবির ভাইয়ের আইডিতে ঢুকলো মেঘ। Just Now একটা পোস্ট করেছেন আবির ভাই,
“Teri Nazar Ne Ye Kya Kar Diya
Mujh Se Hi Mujhko Juda Kar Diya”
সাথে রাতের শহরে বাইকে বসা একটা ছবি শেয়ার করলেন।
মেঘ মনোযোগ দিয়ে ক্যাপশন বুঝার চেষ্টা করছে। তারমানে আবির ভাই ঐ মেয়ের প্রেমে পরে গেছে। ভাবতেই নেত্রযূগল থেকে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পরলো৷ আবারও সেই কমেন্ট টা খোঁজতে গেলো মেঘ। কি এমন সুন্দর মেয়েটা দেখতে হচ্ছে তো! কিন্তু পোস্টের সব কমেন্ট ঘেটেও মেয়ের কমেন্ট পেলো না। তারমানে আবির ভাই ডিলিট করে ফেলছে?
কিন্তু ঐ মেয়ে কে কি এক্সেপ্ট করে ফেললো?
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিতে লাগলো,
“আবির ভাই তো শুধুই আমার ক্রাশ। ক্রাশ তো ক্ষণিকের। ওনিও তো কিছুদিন পর বিয়ে করবেন তখন তো আমাকে মেনে নিতেই হবে। আমার তো সাহসে কুলাবে না আবির ভাইকে কিছু বলার। মা*ইর খাওয়ার থেকে চুপ থাকি, সেই ভালো।”
★★★★
এদিকে আবির বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে আছে৷
একটা ছবি Zoom করে শুধু চোখ গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে,
আর বিড়বিড় করে গাইছে,
Maine Jab Dekha Tha Tujhko
Raat Bhi Wo Yaad Hai Mujhko
Taare Ginte Ginte So Gaya
Dil Mera Dhadka Tha Kaske
Kuch Kaha Tha Tune Hanske
Main Usi Pal Tera Ho Gaya
কিছুক্ষণ থেমে আবার বললো,
Teri Nazaron Ne Kuch Aisa Jaadu Kiya
Lut Gaye Hum Toh Pehli Mulaqaat Mein
চলবে…….
#পেইজঃ Salma Chowdhury -সালমা চৌধুরী (scsalma90)
প্রতিদিনের মতো আজও খাবার টেবিলে একসাথে খেতে বসেছে সকলে৷ কিন্তু মেঘের মাথায় আজ অন্য প্ল্যান ঘুরছে। সবার খাওয়া মোটামুটি শেষ, মেঘ ইচ্ছে করেই অল্প অল্প খাচ্ছে।
এদিকে মোবাইলে কি যেনো চেক করছিলো আবির, মোবাইল চেক করে করেই খাচ্ছিলো , আবিরের খাওয়া শেষ, তাই মোবাইল টেবিলের উপর একপাশে রেখে হাত ধৌতে উঠে পরে।
৩-৪ কদম যেতেই মেঘ হাত বাড়িয়ে আবির ভাইয়ের মোবাইল হাতে নেয়৷ তাড়াহুড়োতে হয়তো পাওয়ার বাটনে চাপ দিতে ভুলে গেছে আবির ভাই। হোমপেইজ ভেসে আছে। এখানে ২ টা হাতের ছবি। একটা বড় হাতের উপর একটা পিচ্চি হাত। মেঘ ১ সেকেন্ড তাকালো ছবিটার দিকে৷ কিন্তু এখন ছবি নিয়ে গবেষণা করার সময় না।
তাই মেঘ তাড়াতাড়ি ফেসবুকে ঢুকলো,
friend requests অপশনে ঢুকতেই চোখে পরলো কত ছেলে মেয়ের আইডি৷ সে খোঁজতে লাগলো গত রাতের নীল জামা পরিহিতাকে। একটু নিচে যেতেই পেয়ে গেলো, প্রত্যাশিত ব্যক্তির আইডি। এক সেকেন্ড না ভেবে ব্ল*ক করে দিলো তাকে। তাড়াতাড়ি ফেসবুক থেকে বের হয়ে ফোন রেখে দিলো আগের জায়গায়।
এবার মেঘ দীর্ঘশ্বাস ফেললো, মনে খুব শান্তি লাগছে এখন।
আবির ভাই টেবিলের কাছে এসে মোবাইল নিতে নিতে, মেঘের দিকে তাকালো,
নিরুদ্বেগ কন্ঠে বললো,
“যতক্ষণ সময় খাবার টেবিলে বসে থাকিস ততক্ষণ যদি তুই খাইতি, তাহলে আজ ক*ঙ্কালের মতো থাকতি না! ”
মোবাইল আর ব্যাগ নিয়ে অফিসের জন্য বেড়িয়ে গেলেন।
এদিকে মেঘ মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বললো,
“আমি তো আপনার জন্যই বসে থাকি। আমি খাবার খেয়ে রুমে যেতে যেতে আপনি বাইক নিয়ে চলে যান৷ দেখতেই পারি না। তাই তো বাধ্য হয়ে এখন টেবিলেই বসে থাকি! ”
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী
(scsalma90)
★★★★
আবির ভাইয়ের কথা মতো মেঘ ১১ টার মধ্যে গোসল করেছে আজ। যথাসময়ে রেডি হয়ে রওনা দিলো টিউশনের উদ্দেশ্যে। মনটা ভিষণ খারাপ। আজ থেকে একা একা টিউশন আর কোচিং এ পড়তে হবে এটা ভেবেই মন ভা*ঙছে বারবার।
টিউশনে ঢুকতেই বন্যা ডাকলো,
“মেঘ,এখানে আয়!”
মেঘ চোখ গোল গোল করে অবাক চোখে তাকালো, ছুটে গেলো বন্যার কাছে,
মেঘ: তুই এই সময় টিউশনে কেন? আগের ব্যাচে পড়িস নি?
বন্যা: কিভাবে পড়বো? তোর বেস্ট হয়েছি, তোর ভোগান্তি তো আমাকে ভুগতে হবেই।
মেঘ: মানে?
বন্যা: গতকাল রাতে তানভির ভাইয়া কল দিয়েছিল আমায়, বললো তোর সাথে আমারও টাইম পাল্টায় দিছে। আজ থেকে যেনো বিকেলে আসি৷
মেঘ: তাহলে তুই জানাস নি কেনো আমায়? আমি পুরো রাস্তা মন খারাপ করে এসেছি। একা একা পড়তে হবে বলে।
বন্যা: তোকে কিভাবে জানাবো? তুই তো আবির ভাইয়ের ঘো*রে ডুবে আছিস।
মেঘ কিছুটা লজ্জা পেলো।
তারপর স্ব শব্দে হেসে বললো, জানিস বন্যা আমার হিজাব টা আবির ভাই কিনে দিছে। শুধু এটায় না সর্বমোট ৩০ টা হিজাব কিনে দিয়েছে। শুধু তাই না দেখ আমার পায়ের নুপুর গুলো। এগুলোও আবির ভাই দিয়েছে৷ তাও আবার নিজের হাতে পড়িয়ে দিয়েছেন। দেখ, সুন্দর না?
বন্যা কপাল ভাজ করে নুপুর গুলো দেখলো, তারপর বললো,
“হ্যাঁ খুব সুন্দর হয়েছে। কিন্তু কাহিনী কি বল তো? ঐ ব্যাটার হঠাৎ তোর প্রতি এত মায়া হচ্ছে! তোকে কিছু বলছে কি?”
মেঘ: হ্যাঁ বলছে। আমি কই যাই না যাই তা পর্যবেক্ষণ করতে নুপুর দিয়েছে৷
বন্যা হা করে তাকায় আছে!
ততক্ষণে স্যার পড়াতে চলে এসেছেন।
টিউশন, কোচিং শেষে মেঘ বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেছে৷
সন্ধ্যার পর আবার জান্নাত আপু আসবে। পড়া রিভিশন দিতে হবে৷
জান্নাত আপু শুক্রবার, শনিবার বাদ দিয়ে বাকি ৫ দিন পড়ান। জান্নাত আপু খুব ভালো পড়ান৷ মেঘ ওনার ভক্ত হয়ে গেছে একেবারে। জান্নাত আপুও মেঘকে খুব আদর করে৷ পড়াশোনার পাশাপাশি কিভাবে পড়লে ভালো হবে, রুটিন করা সবকিছুতেই হেল্প করেন৷ এজন্য মেঘ ইদানীং পড়াশোনাতেও গুরুত্ব বেশি দিচ্ছে।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী
(scsalma90)
★★★★
এভাবে কেটে গেলো ১০-১২ দিন। আবিরের সাথে মেঘের প্রতিদিন সকালে খাবার টেবিলে দেখা হয়৷ মাঝে মাঝে মেঘ আগে আসে, মাঝে মাঝে আবির আগে চলে আসে। তারপরও দেখা তো হয়, এতেই যেনো মেঘের মনে সারাদিন প্রশান্তি কাজ করে।
আবির বাড়ি ফেরে ১১-১২ টার দিকে৷ আবিরের বাইকের শব্দ পেলেই মেঘ ছুটে যায় নিজের রুমের বারান্দায়। হেলমেট টা খুলে যখন বাইক থেকে নামে,
“মেঘ গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখে সে দৃশ্য আর গুনগুন করে গান গায় ” তারপর বাড়িতে ঢুকার আগ পর্যন্ত যতটুকু সম্ভব তাকিয়ে তাকিয়ে আবির ভাই কে দেখে। আবির ভাই বাড়িতে ঢুকে গেলে হাসিমুখে ঘুমিয়ে পরে মেঘ৷ এটায় যেনো মেঘের দৈনিক রুটিন। কেনো আবির ভাইকে দেখে, তার কোনো উত্তর নেই অষ্টাদশীর কাছে।
আবির ভাই কি শুধুই তার ক্রাশ নাকি সে আবির ভাইকে ভালোবাসে এর উত্তর নিজেও খোঁজে পায় না। তবে আবির ভাইকে অসম্ভব ভালো লাগে, আবির ভাইয়ের শীতল চাউনি বারংবার অষ্টাদশীর হৃদ*য়টা চূ*র্ণবিচূ*র্ণ করে। আবির ভাই অষ্টাদশীর মন- মস্তিষ্ক জোড়ে বিচরণ করছে ।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
১০-১২ দিন পর সকালবেলা আবির জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে দু চুমুক খেলো কি না।
আলী আহমদ খান বলে উঠলেন,
“আবির তোকে একটু চট্টগ্রাম যেতে হবে। ”
আবির তৎক্ষনাৎ বিসুম খেলো।
তানভির তাড়াতাড়ি উঠে, ভাইয়ের মাথায় ফু দিচ্ছে। রান্না ঘর থেকে ছুটে এসেছেন মালিহা খান৷
এদিকে মেঘ অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে আবির ভাইয়ের দিকে৷
কিছুক্ষণ পর আবির স্বাভাবিক হয়ে বললো,
“আমি চট্টগ্রাম গিয়ে কি করবো?”
আলী আহমদ খান স্বাভাবিক ভাবেই বললেন,
“আমাদের কোম্পানিতে কিছু সমস্যা হচ্ছে, কিছু ডিলার ঝামেলা করতেছে শুনলাম। তোর কাকামনিকে সিলেট যেতে হবে। কোম্পানির CEO হিসেবে এখন দায়িত্ব তোর উপর ই পরে। তুই কথা বললেই আশা করি সমাধান হবে। ডিলাররা অর্ডার ডেলিভারি করা পর্যন্ত তুই থাকবি ঐখানে৷ যদি সব ঠিকঠাক হয়ে যায় তখন চলে আসিস। ”
আবির এক পলক মেঘের দিকে তাকালো, তারপর দৃষ্টি নামিয়ে প্রশ্ন করলো,
“কবে যেতে হবে?”
আলী আহমদ খান সহসা বলে উঠলেন,
“আজ রাতে অথবা আগামীকাল সকালে চলে গেলে ভালো হবে। ”
আবির চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে। আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান উঠে গেলেন।
তানভির এবার ভাইকে বললো,
“ভাইয়া তোমার কি একা যেতে খারাপ লাগবে? আমি কি যাবো তোমার সঙ্গে? ”
আবির অ*গ্নিদৃষ্টিতে তাকালো তানভিরের দিকে, দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় বিড়বিড় করে কি যেনো বললো,
কেউ কিছু বুঝলো না কিন্তু তানভির স্ব শব্দে হেসে উঠলো।
আবির এবার রা*গে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
“”তানভির..!!””
তানভির হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে উঠে বেসিনের দিকে দৌড় দিলো।
আবির অ*গ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তানভিরের দিকে তারপর মাথা নিচু করে প্লেটের খাবার টা কোনোরকমে শেষ করে উঠে চলে গেলো।
এদিকে মেঘ, মীম আর আদি বসে আছে।
আদি আর মীম প্ল্যান করছে আবির ভাইয়াকে বলবে কক্সবাজার গেলে ওদের জন্য খেলনা, সাজুনি, শামুক নিয়ে আসতে।
মেঘ নিশ্চুপ বসে খাচ্ছে! আবির ভাই কে দেখার জন্য ই এখন সে প্রতিদিন ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠে৷ রাতে ঘুমানোর আগেও আবির ভাইকে দেখে ঘুমায়৷ আবির ভাই চট্টগ্রাম চলে গেলে ও থাকবে কিভাবে!
মীম হঠাৎ ডেকে উঠলো,
“আপু ভাইয়াকে তুমি কি আনতে বলবা?”
মীমের ডাকে ধ্যান ভাঙলো মেঘের, একটু হাসার চেষ্টা করলো, তারপর কোমল কন্ঠে বললো,
“আমার কিছু লাগবে না!”
সারাদিন কেটে গেলো, মেঘ নিজের মতো কোচিং, টিউশন শেষ করে আসছে৷ মীম, আদি স্কুল থেকে ফিরেছে।
আবির ৮ টায় বাসায় ফিরেছে। ততক্ষণে জান্নাত আপু পড়িয়ে চলে গেছেন। মেঘ বই খাতা নিয়ে নিজের রুমে চলে গেছে। রাত ১০ টার দিকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যাবে আবির।
রুমে গিয়ে শাওয়ার শেষ করে, একেবারে রেডি হয়ে রুম থেকে বের হলো আবির। মেঘের রুমের দরজার সামনে এসে থামলো,
দরজা ধাক্কা দিলো আস্তে করে।
মেঘ বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে । পাশে বই খাতা পরে আছে, ফ্যানের বাতাসে পৃষ্ঠা গুলো উড়ছে। জান্নাত আপু যাওয়ার পর ই রুমে এসে শুয়ে ছিল।
আবির আস্তে করে ডাকলো,
“মেঘ”
কোনো সাড়া নেই। তাই রুমের ভিতরে ঢুকলো আবির। শান্ত পায়ে এগিয়ে গেলো মেঘের কাছে।
মেঘের মুখের একপাশ বিছানায় লেপ্টে আছে। ফ্যানের বাতাসে চুল গুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে,ছোট চুল গুলো বার বার মুখে ঝাপটে পরছে, লাইটের আলোয় অপর গালটা চিকচিক করছে।
আবির বিছানার এক পাশে বসলো, কিছুক্ষণ সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পরখ করলো অষ্টাদশীকে। তারপর গালে হাত রেখে মুখ থেকে ছোট চুলগুলোকে সরিয়ে দিলো। ২-১ বার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চুপচাপ রুম থেকে বেড়িয়ে, ব্যাগ নিয়ে নিচে চলে আসলো।
মীম আর আদি খুব করে বললো,
“ভাইয়া কক্সবাজার যেয়ো প্লিজ, চাটনি নিয়ে এসো, খেলনা,শামুক আরও অনেক কিছুর আবদার করলো ভাইয়ের কাছে। ”
উত্তরে আবির শুধু বললো,
“সময় পেলে যাব!”
খেয়ে ১০ টা নাগাদ বেড়িয়ে গেছে আবির।
ইকবাল খান আগামীকাল সকাল ৮ টায় সিলেট যাবেন।
আবিরের বাবার কোম্পানি ঢাকার বাহিরে তিনটা শাখা আছে। চট্টগ্রাম, সিলেট এবং রাজশাহী । ইকবাল খানকে বেশিরভাগ সময় ই বিভিন্ন জায়গাতে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। কখনো চট্টগ্রাম, কখনো রাজশাহী, কখনো সিলেট, বাকি সময় বাড়িতে থাকলে হেড অফিসে থাকেন। একই সাথে দুই শাখাতে যেতে হলে কখনো কখনো মোজাম্মেল খানকেও যেতে হয়। তবে আলী আহমদ খান এখন আর ঢাকার বাহিরে যান না। আবির আসাতে ওনি চাইছেন আবির সব দায়িত্ব বুঝে নেক৷
রাত ১১ টায় মীম এসে ডাকছে,
“আপু উঠো, খাবে না?”
মেঘ ঘুমঘুম চোখে তাকায় মীমের দিকে,
মীম আবার বলে,
“১১ টা বাজে, তুমি কখন খাবে? আম্মু, বড় আম্মু সবাই বসে আছে তোমার জন্য। আমিও খাই নি আসো৷ ”
১১ টা শুনেই মেঘের ঘুম উদাও হয়ে গেছে, সহসা মনটা খারাপ হলো৷
চিন্তিত স্বরে বললো,
“আবির ভাই কি চলে গেছে?”
মীম হাসিমুখে বলছে,
“হ্যাঁ, ভাইয়া তো ১০ টার আগেই চলে গেছে। আমি আর আদি বলে দিছি আমাদের জন্য, খেলনা, গিফট, চাটনি নিয়ে আসতে৷ তোমার জন্যও আনতে বলেছি। ভাইয়া বলেছে সময় পেলে যাবে কক্সবাজার। ”
মেঘের মনটা চূ*র্ণবি*চূর্ণ হয়ে গেছে। মনে মনে ভাবছে,
কেনো যে শুইতে গেলাম, না ঘুমালে তো আবির ভাইকে দেখতে পারতাম৷ আমি ঘুমিয়ে ছিলাম তাতে কি, আবির ভাই কি আমায় বলে যেতে পারতো না?
মীম আবার ডাকলো,
“আপু আসো খেতে যাই! ”
মেঘ কঠিন স্বরে বললো,
“আমার খিদা নেই । খাবো না। তুই খেয়ে নে। ওদের বল খেয়ে নিতে। আমি ঘুমাবো। আর লাইট টা অফ করে দিয়ে যা৷ ”
মীম মন খারাপ করে চুপচাপ লাইট অফ করে চলে গেলো,
এদিকে মেঘ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁ*দছে, কিছুক্ষণ পর নিজে নিজেই ভাবছে,
আবির ভাই তো আমায় নিয়ে ভাবেন ই না।ভাবলে তো আমাকে ডেকে বলেই যেতেন। তাহলে আমি কেনো ওনার জন্য কা*ন্না করছি। আর কাঁদবো না আমি। কিছুক্ষণ পর থামলো। খুব খিদে পাচ্ছে কিন্তু সে খাবে না। বড্ড অভিমান জমেছে বুকে। এভাবেই ঘুমিয়ে পরলো আবার।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
ভোরবেলাও উঠলো না মেঘ৷ ৮ টার উপরে বাজে খাবার টেবিলেও আসে নি। বাধ্য হয়ে মোজাম্মেল খান নিজে গেলেন মেয়েকে ডাকবে। মেঘ তখনও ঘুমে৷
আব্বুর ডাকে ঘুম ভাঙলো মেঘের। ১০ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসলো। খাবার টেবিলে আবির ভাই নেই দেখে মনটা খারাপ হলো , কাকামনিও সকাল সকাল সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। চুপচাপ খেতে বসলো মেঘ কিন্তু গলা দিয়ে খাবার নামছে না। কোনো রকমে অল্প কিছু খেয়ে উঠে পরলো৷
রুমে গিয়ে পড়ার চেষ্টা করলো কিন্তু পড়া মাথায় ঢুকছে না। মাথায় শুধু আবির ভাই ঘুরছে। আবির ভাই কেনো বলে গেলো না, এখন আবির ভাই কোথায় আছেন, খেয়েছেন কি না এসব চিন্তায় ব্যস্ত হলো৷ একটু পর পর ডাটা অন করে ফেসবুকে ঢুকছে৷ কিন্তু আবির ভাই নেটে নাই, কোনো আপডেট ও নেই। ১০ মিনিট পর পর মেঘ ফেসবুক চেক করছে কিন্তু তাতে কোনো লাভ হচ্ছে না।
সারাদিন গেলো, এই পড়তে বসছে এই আবার ফোন চেক করছে৷ বিকাল নাগাদ কোনো খবর না পাওয়াতে মন খারাপ করে ঘুমিয়ে পরলো।
★★★★
আবির চট্টগ্রাম এসে অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পরেছে। বাসা থেকে আবিরের আম্মু কল দিয়ে খোঁজ নিয়েছে ছেলের। এছাড়া মোজাম্মেল খানও কাজের জন্য কয়েকবার কল দিয়েছে আবিরকে৷
দেখতে দেখতে ৩ দিন হয়ে গেলো আবিরের চট্টগ্রাম আসা। সাথে অফিসের ঝামেলায় সারাদিন এক মুহুর্ত রেস্ট নিতে পারে না। অফিসের কাজের ফাঁকে ২-১ বার বাসায় কল করে, আম্মু, মামনি,তানভিরের সাথে কথা হয়। মীম আর আদির এক কথা ভাইয়া কক্সবাজার যেয়ো প্লিজ, আমাদের জিনিস গুলো নিয়ে এসো। কিন্তু মেঘ যেনো নিখোঁজ।।
আবির বিদেশে থাকাকালীন তানভির বাসায় না থাকলে যেই মেয়ে একায় সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখতো৷ এখন আবির চট্টগ্রাম, তানভির সকালে বের হয়ে পার্টি অফিসে আর ফেরে ১০ টার দিকে৷ বাবা চাচাও সারাদিন অফিসে থাকে। তারপরও মেঘকে সারাদিনে খোঁজে পাওয়া যায় না।
সকালে অল্প খেয়ে যে রুমে ঢুকে কোচিং থাকলে বের হয়, না হয় ৩-৪ টায় খুদা লাগলে চুপচাপ এসে খাবার খায়, মাকেও ডাকে না। জান্নাত আপু এসে পড়িয়ে গেলে, মেঘ অল্প খেয়ে আবার রুমে চলে যায়। মনমরা হয়ে থাকে সবসময়।
আবিরের অফিসের ঝামেলা মোটামুটি মিটেছে। ডিলার প্রোডাক্ট ডেলিভারি দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দুদিন ফ্রী থাকাতে মীম আর আদির কথা মনে করে কক্সবাজার গেলো। এর আগে কখনো কক্সবাজার যায় নি আবির। এটায় জীবনে প্রথমবার। 5★ হোটেলে রুম নিয়েছে। ফ্রেশ হয়ে বের হতে হতে বিকেল হয়ে গেছে।
সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে আবির,
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্পষ্ট রূপ দিয়ে সজ্জিত বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। কক্সবাজারের সূর্যাস্তের ছবি প্রায় সবাই স্মৃতি হিসেবে রেখেছেন নিজেদের মোবাইল ফোন বা প্রতিটা বাড়ির দেয়ালে।আবির সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে গোধূলি বেলার সূর্যাস্ত দেখে বিমোহিত। অসংখ্য প্রাপ্তি, ক্লান্তি, হতাশা বিকীর্ণ হয়ে আছে আবিরের মনে। সমুদ্রের পানিতে অস্তমিত সূর্যের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করেছে।
কিছুক্ষণ পর আবিরের ফোনে কল আসে।। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখে তানভিরের কল। রিসিভ করে,
তানভির: আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া
আবির: ওয়ালাইকুম আসসালাম।
তানভির: কোথায় আছো?
আবির: কক্সবাজার আসছি আজ। কেনো?
তানভির: একটু দরকার ছিল !
আবির: বল।
তানভির: এমপির মেয়ে নাকি তোমায় রিকুয়েষ্ট দিয়েছিল৷ তুমি নাকি তাকে ব্লক করে দিয়েছো। আজ এমপির বাসায় গেছিলাম। মেয়ে তো তোমার কথা জিজ্ঞেস করতেছে আমায়।
আবির: তুই কি বলছিস?
তানভির: প্রথমে তো এমনিতেই বুঝানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু মানতেছে না তাই বাধ্য হয়ে বলছি তুমি আরেকজনকে পছন্দ করো। তারসাথে তোমার বিয়ে ঠিক।
আবির: আচ্ছা ঠিক আছে ।
তানভির: কিন্তু একটা সমস্যা আছে ভাইয়া।
আবির: আবার কি সমস্যা?
তানভির: এমপির মেয়ে যদি এমপিকে বলে আর ওনি যদি আমায় জিজ্ঞেস করে তখন আমি কি বলবো? যদি মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করে তখন কি বলবো?
আবির: প্রথমত এমপি কোনোসময় এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবে না। আর যদি শুনে ছেলে অন্য কাউকে পছন্দ করে তাহলে আরও কিছু বলবে না।
তানভির: তারপর ও যদি জিজ্ঞেস করে ফেলে তখন কি বলবো?
আবির: বলবি তোর বোনের সাথে বিয়ে ঠিক।
তানভির: তারপর?
আবির: তারপর আবার কি? বাকিটা আমি সামলে নিবো।
তানভির: যদি ফোর্স করে?
আবির একটু গম্ভীর কন্ঠে বললো, “বেকুবের মতো কথা বলিস না তানভির। এমপির মেয়ে হোক আর মন্ত্রীর মেয়ে তারজন্য কি তুই নিজের ভালোবাসা কোরবান করবি নাকি, আজব।”
তানভির আর কথা বাড়ালো না।
তানভির: আচ্ছা ভাইয়া এখন রাখি তাহলে৷ আল্লাহ হাফেজ।
আবির: আল্লাহ হাফেজ ।
কল কেটে আবির ডাটা অন করে ফেসবুকে ঢুকে। কেনো জানি মনে হলো ব্লকলিস্ট চেক করবে৷ ব্লক লিস্টে ঢুকতেই চোখে পরলো প্রথম আইডিটাই ঐ মেয়ের।
দু সেকেন্ড ভাবলো, সে তো শুধু কমেন্ট ডিলিট করেছিল, ব্লক তো করে নি। এটা যে মেঘের কাজ তা বুঝতে বেশিক্ষণ সময় লাগলো না । কিন্তু মেঘ ফোন পেলো কোথায়? আরও কিছুক্ষণ ভাবার পর মনে হলো, টেবিলের উপর ফোন রেখে যাওয়ার ঘটনা। তারমানে সেদিন ই ব্লক করেছে।
অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসির ঝলক দেখা গেলো।
আস্তে আস্তে বললো,
“”এই সামান্য বিষয়ে জ্বলে উঠলে
সইবি কিভাবে এত ঝড়-ঝঞ্ঝা।
এত তাড়াতাড়ি তো তোকে আমার করে নিবো না।
আবার খুব বেশি কষ্টও দিবো না তোকে। ”
অন্ধকার নেমেছে বিচে, একটু হাঁটাহাঁটি করলো আবির। ভাই বোনের জন্য কিছু কেনাকাটাও করলো। তারপর হোটেলে চলে আসছে।
Page: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী ( scsalma90)
★★★★
কেটে গেলো আরও ২ দিন। আবির বাড়ি নেই ৬ দিন যাবৎ। অষ্টাদশীর মনে বিষন্নতা ছেয়ে গেছে। খাই না ঠিক মতো, পড়াশোনা করে না, মোবাইল ও চাপে না, কথাও বলে না কারো সাথে। শুধু টিউশন আর কোচিং যায় আসে এতটুকুই।
আজ সকাল থেকে মনটা মাত্রাতিরিক্ত খারাপ। তানভির ডেকে এনে খাবার টেবিলে বসিয়েছে। তানভির আজকাল পার্টি অফিসের দৌড়াদৌড়িতে মেঘকে কিছুই বলে না। মেঘকে এখন আর আগের মতো বকেও না। মেঘ যেমন পাল্টে গেছে তেমনি তানভিরও পাল্টে গেছে। মেঘ খাবার টেবিলে বসে কোনো কথা না বলেই অল্প খাবার খেলো।
তানভির মোজাম্মেল খান কে প্রশ্ন করলো,
আব্বু, ভাইয়া কবে ফিরবে?
মোজাম্মেল খান যথারীতি জবাব দিলেন,
“কাজ শেষ হলে ফিরবে, কাজ এখনও শেষ হয় নি!”
মেঘের হৃদয়ে র*ক্তক্ষরণ হচ্ছে, কয়েকটা দিনেই আবির ভাইয়ের শূন্যতা খুব করে ভোগা*চ্ছে অষ্টাদশীকে।
টিউশন শেষ করে কোচিং এ গেলো দুই বান্ধবী একসাথে।
বন্যা বার বার জিজ্ঞেস করছে,
“কি হয়ছে তোর?”
মেঘ শুধু মাথা নাড়ছে একটা কথাও বলছে না।
একটা ক্লাস শেষ হয়েছে । স্যার বেড়িয়ে যাওয়া মাত্রই ওষ্ঠ উল্টে কান্না শুরু করলো মেঘ, প্রথম দিকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদলেও নিজেকে বেশিক্ষণ কন্ট্রোল করতে পারলো না । কা*ন্নার মাত্রা বেড়ে গেছে। শ্বাস নিতে পারছে না।
মেঘের এই অবস্থা দেখে আঁতকে উঠে বন্যা। মেঘকে নিয়ে ওয়েটিং রুমে চলে যায়। ওখানে যাওয়াতে বাধভাঙ্গা কা*ন্না শুরু হয় মেঘের। বন্যা কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছে না। ১০-১৫ মিনিট স্থির হয় এই কা*ন্না । তারপর কিছুটা থেমেছে, এখন জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ছে৷ একটু কাঁদলেই মেঘের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়৷
বন্যা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শান্ত কন্ঠে বললো,
“কি হয়েছে তোর? এভাবে কান্না করছিস কেন?”
মেঘ ফুপিয়ে ফুপিয়ে উত্তর দিলো,
“আমার খুব কা*ন্না পাচ্ছে! ”
বন্যা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কা*ন্না পাচ্ছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি! কিন্তু কেনো কান্না পাচ্ছে সেটা বল!”
মেঘের গম্ভীর জবাব,
“জানি না!”
বন্যা নিজেকে কন্ট্রোল করে আবার প্রশ্ন করলো,
“রেজাল্ট নিয়ে চিন্তা করছিস? নাকি চান্স পাওয়া নিয়ে? নাকি বাসায় কেউ বকেছে তোকে?”
আবারও কাঁদছে মেঘ, কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
“আমি আবির ভাইকে খুব মিস করছি বন্যা, ওনি ফেসবুকেও আসেন না, আমি ওনাকে না দেখে, ওনার কথা না শুনে আর থাকতে পারছি না ”
বন্যা এবার অবুঝ বাচ্চার মতো হাসলো, তারপর বললো,
“মিস করছিস তো কল দে”
মেঘ কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
“ওনি কি আমার সাথে কথা বলবেন?”
বন্যা এবার স্ব শব্দে হাসলো,
“ওনি কথা বলবেন কি বলবেন না, এসব যদি তুই ভাবিস তাহলে ওনি কি ভাববেন?”
মেঘ এবার মুখ তুলে তাকালো বন্যার দিকে,
বন্যা এবার হাসতে হাসতে বললো,
“বেবি, তুমি তো আবির ভাইয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছো, সাবধান বান্ধবী ডুবে যেয়ো না, সামনে কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা। ”
মেঘ ভেংচি কেটে বললো,
আমি আবির ভাইকে ভালোবাসি..
এটুকু বলেই থেমে গেলো, না টা বলার খুব চেষ্টা করলো কিন্তু বলতে পারলো না।
বন্যা মেঘকে ঠান্ডা মাথায় বেশ কিছুক্ষণ বুঝালো৷ মেঘ শান্ত হয়ে বসে আছে।
বন্যা বললো,
“তুই তাহলে বাসায় চলে যা, ক্লাস করতে হবে না৷ ফোন দে, আমি ড্রাইভার আংকেল কে কল দিচ্ছি।। ”
তারপর মেঘকে গাড়িতে দিয়ে বন্যা এসে ক্লাস টা শেষ করলো।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
মেঘ বাসায় এসে ফ্রেশ হয়েই ছুটে গেলো মায়ের রুমে। হালিমা খান ঘুমাচ্ছিলেন। মেঘ মায়ের হাতের উপর মাথা রেখে মাকে জরিয়ে ধরে শুয়ে পরেছে।৷ হালিমা খান ঘুমের মধ্যে ই একবার চোখ খুলে দেখলেন, মেঘকে দেখে মেঘের পিঠ বরাবর জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে পরলেন পুনরায়।
অনেকক্ষণ কান্না করায় মেঘও ক্লান্ত ছিল সেও মাকে জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে পরেছিলো। বেশ কিছুক্ষণ পর মেঘের ঘুম ভাঙে। ততক্ষণে হালিমা খান সজাগ হয়ে গেছেন৷ শুয়ে শুয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মেঘ সচরাচর মায়ের কাছে শুতে আসে না। যখন খুব বেশি মন খারাপ থাকে তখন ই আসে।
মেঘের ঘুম ভাঙতেই হালিমা খান বললেন,
“তোর কি শরীর খারাপ মা?”
মেঘ মাথা নেড়ে, না করলো
হালিমা খান পুনরায় বললেন,
“রেজাল্ট নিয়ে চিন্তা করছিস?”
মেঘ আবারও মাথা নেড়ে, না করলো
মেঘ এবার মাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে বললো,
“আম্মু আবির ভাই কবে আসবে?”
মেয়ের প্রশ্নে হালিমা খান মুচকি হাসলেন আর বললেন,
“কেনো ভাইয়ের জন্য পেট পু*ড়ছে?”
মেঘ মনে মনে বললো,
“পেটের সাথে মনটাও পু*ড়ছে আম্মু। ”
মেঘকে নিরব দেখে হালিমা খান বললেন,
“দুপুরে তো কথা হলো, বললো আরও ২-৪ দিন লাগতে পারে। ”
কথা হয়েছে শুনে সহসা মেঘের মনটা খারাপ হলো, নিজেকে সামলে বললো,
“আম্মু আবির ভাইকে কল দাও না প্লিজ।”
হালিমা খান: বিকেলেই তো কথা হলো। এখন আবার কল দিয়ে কি করবো, ছেলেটা মনে হয় ব্যস্ত।
মেঘ: আম্মু প্লিজ দাও না।
হালিমা খান নিজের ফোন হাতে নিয়ে কল দিলো আবিরকে। লাউড স্পিকারে দিয়েছেন।
কয়েকবার রিং হতেই রিসিভ হলো৷
আবির: আসসালামু আলাইকুম মামনি
আবির ভাইয়ের কন্ঠ শুনে মেঘের বক্ষস্পন্দন জোড়ালো হলো।
হালিমা খান: ওয়ালাইকুম আসসালাম। ব্যস্ত আছিস বাবা?
আবির: হ্যাঁ কিছুটা৷ কেনো?
হালিমা খান: মেঘ একটু কথা বলবে তোর সাথে!
আবির: ঠিক আছে দাও।
হালিমা খান মেঘের দিকে ফোন এগিয়ে দিলেন। মেঘ কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন নিলো, সঙ্গে সঙ্গে লাউডস্পিকার অফ করে দিলো মেঘ।
মেঘ ধীর কন্ঠে বললো,
“হ্যালো”
আবির তৎক্ষনাৎ রেগেমেগে বললো,
“হ্যালো কি রে? প্রথমে কল দিয়ে সালাম দিতে হয় এটাও জানিস না?”
আবিরের ধমকে চুপসে গেলো মুখটা। আস্তেধীরে বললো,
“আসসালামু আলাইকুম ”
আবির গম্ভীর কন্ঠেই উত্তর দিলো,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম”
মেঘ এবার কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“কেমন আছেন আবির ভাই?”
আবির কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললো,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুই কেমন আছিস?”
মেঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলো,
“আলহামদুলিল্লাহ । ”
দুজনেই কয়েক সেকেন্ড নিরবতা পালন করলো,
আবির নিরবতা ভেঙে রাশভারী কন্ঠে শুধালো,
“তোর ফোন দিয়ে কল দিতে পারিস না? মামনির ফোন থেকে দিতে হলো কেনো?”
মুখের উপর মেঘ বলে ফেললো,
“আপনার নাম্বার নাই আমার কাছে”
আবির এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো, গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো,
“রাখছি, ব্যস্ত আছি আমি। ”
এই বলে কল কেটে দিলো। মেঘ আহাম্মকের মতো ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। বুঝে উঠতে পারলো না ব্যাপার টা। আবির ভাইয়ের নাম্বার নেই এই কথা শুনে রেখে দিলো নাকি সত্যি ই ব্যস্ত।এটা ভেবে পাচ্ছে না অষ্টাদশী।
ফোনের স্ক্রীনে ভেসে আছে, আবির নামে সেইভ করা নাম্বার টা। মেঘ মনে মনে নাম্বার টা মুখস্থ করতে ব্যস্ত হলো। তারপর মাকে ফোন দিয়ে নিজের রুমের দিকে দৌড় দিলো।
নিজের ফোনে আবির ভাইয়ের নাম্বার টা লিখে নামের অপশনে লিখলো,
“আমার আবির সাথে লাভ ইমুজি কিছুটা দূরে লিখলো ভাই। ” সেইভ করলো নাম্বারটা।
চলবে…….
#পেইজঃSalma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
আবির ভাইয়ের সাথে কথা বলেছে এই খুশিতে মেঘ সারাবাড়ি ছুটছে। কে বলবে এই মেয়েটায় এক সপ্তাহ রুম থেকে বের হয় নি, কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলে নি। আজ সে মীম আর আদিকে নিয়ে দুষ্টামি, খুনসুটিতে মগ্ন৷ মীম আর আদিও যেনো আপুকে এভাবে পেয়ে বড্ড খুশি।
হঠাৎ জান্নাত আপু বাড়িতে ঢুকলো, মেঘকে এত হাসিখুশি দেখে জান্নাত আপুও খুশি হলো। এই ১ সপ্তাহে জান্নাত আপু যতদিন এসেছে৷ প্রতিদিন ই মেঘ মনমরা হয়ে বসে থাকে। পড়া ধরলে পারলে বলে, না পারলে চুপ থাকে, আপু বুঝালেও সারা নেই। বুঝছে কি না তাও বলে না। জান্নাত আপু কম করে হলেও ২০ বার জিজ্ঞেস করে,
“মেঘ তোমার কি হয়েছে বলো?”
মেঘ কিছুই বলে না। এতে জান্নাত আপুও চিন্তিত ছিল। ওনি নিজে থেকেই অনেক বুঝিয়েছেন, রেজাল্ট নিয়ে যেনো চিন্তা না করে, এডমিশন টেস্ট নিয়ে যেনো না ভাবে। কিন্তু মেঘ এসবে কোনো সাড়া দেয় নি। তাই আজ মেঘকে খুশি দেখে জান্নাত আপুর মুখে সহসা হাসি ফুটে উঠেছে।
জান্নাত আপু ডাকলে,
“মেঘ”
সোফায় বসা মেঘ পিছন ফিরে তাকিয়ে জান্নাত আপুকে দেখে ছুটে আসে।
মেঘ: আপু কেমন আছো?
জান্নাত: আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?
মেঘ: আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপু তুমি একটু বসো , আমি রুম থেকে বই খাতা নিয়ে আসছি।
বলেই সিঁড়ি দিয়ে ছুটছে রুমের দিকে। জান্নাত হাস্যোজ্জ্বল মুখে তাকিয়ে আছে মেঘের দিকে। সত্যি বলতে ছটফটে স্বভাবের মেয়েরা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেলে সবার নজরে পরে যায়। মেঘের ক্ষেত্রেও তেমনটায় হয়েছে৷
জান্নাত আপুর পড়ায় মেঘের সম্পূর্ণ মনোযোগ আছে আজ। পড়ানোর আগেই সব বুঝে ফেলছে। জান্নাত আপু পড়িয়ে যাওয়ার পর আরও ১-২ ঘন্টা মীম আর আদির সাথে আড্ডা দিয়েছে মেঘ। নিজেও পড়ছে না ওদের কেও পড়তে দিচ্ছে না।
এতে অবশ্য মা,কাকিয়া কিছুই বলছে না। মেয়েটা যে হাসিখুশি আছে এতেই সবার ভালো লাগছে।
মোজাম্মেল খান এবং আলী আহমদ খান বাসায় ফিরেছেন কিছুক্ষণ আগে। ফ্রেশ হয়ে খেতে বসেছেন। মেঘ ও আজ সবার সাথে খেতে বসেছে। আবির ভাইয়ের চেয়ারের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
মনে মনে বললো,
“মিস ইউ আবির ভাই”
আলী আহমদ খান মেঘকে জিজ্ঞেস করলেন,
“মেয়েটা ভালো পড়াচ্ছে তো আম্মু?”
মেঘ হাসিমুখে উত্তর দিলো,
“আপু অনেক ভালো পড়ায় বড় আব্বু!”
‘কোনো সমস্যা হলে জানাইয়ো’
স্বাভাবিক ভাবেই কথাটা বললেন আলী আহমদ খান।
মেঘও শান্ত স্বরে বললো,
“ঠিক আছে বড় আব্বু!”
মেঘ রুমে এসে শুয়ে পরেছে। আজ পড়তে একটুও ইচ্ছে করছে না৷ আবির ভাইয়ের সাথে কথা বলার খুশি, সাথে এটাও অনুভব করছে সে আবির ভাইকে ভালোবেসে ফেলেছে। এসব ভেবেই মেঘের ওষ্ঠ ছড়িয়ে আসে। সহসা ডাটা অন করে আবির ভাইয়ের আইডিতে ঢুকে। সেদিন রাগ করে ছবি ডিলিট করার পর আর ছবিগুলো ডাউনলোড করে নি। আজ আবার ইচ্ছে হলো ছবিগুলো সেইভ করার। এখন আর রা*গ, অভিমানে আবির ভাইয়ের ছবি ডিলিট করবে না এই প্রতিজ্ঞা করলো৷
আবির ভাইয়ের আইডিতে ঢুকতেই একটা পোস্ট চোখে পরে,
“আমার স্বপ্নগুলো হাতছানি দেয়,
সন্ধ্যাতারার মাঝে”
সাথে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে তুলা একটা ছবি।
২ ঘন্টা আগেই পোস্ট করেছেন।মেঘ সঙ্গে সঙ্গে ছবিতে কেয়ার রিয়েক্ট দিলো, একটা লাভ ইমুজিও কমেন্ট করলো। আবির ভাইয়ের ছবি দেখে মেঘেরও কক্সবাজার যেতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু চাইলেই তো সব ইচ্ছে পূরণ হয় না। এক দৃষ্টিতে ছবিটা কিছুক্ষণ দেখলো তারপর আস্তে আস্তে সব ছবি সেইভ করতে লাগলো৷
গ্যালারিতে একটা একটা এলবাম খুললো
নাম দিলো – Pawky Trample এখানে আবির ভাইয়ের সব ছবি একসাথে রাখলো৷
আবির ভাইকে দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়েছে কে জানে।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী
★★★★
কেটে গেলো আরও ২-৩ দিন। মেঘ নিজের রুটিন মতো খায়, গোসল করে, ঘুমাই, পড়াশোনা করে। মাঝখানে ৫/৭ দিন একদম ই পড়াশোনা করে নি। এই গ্যাপটাও এখন ফিলাপ করছে। ক্লান্ত লাগলে আবির ভাইয়ের ছবি দেখে৷
আজ কোচিং, টিউশন কিছু নেই। তাই দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়েছে মেঘ। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসে কফি খাওয়ার৷ নিচে আসতেই চোখে পরে মীম আর আদি অনেক গিফট ছড়িয়ে দেখছে।
মেঘকে দেখেই আদি ছুটে যায় মেঘের কাছে।
আদি: আপু দেখো ভাইয়া কত গিফট নিয়ে আসছে আমাদের জন্য। অনেকগুলো শামুক এনেছে সবার নাম লিখা। আসো আসো
এরমধ্যে মীম ২ টা শামুক নিয়ে এসেছে। দেখো আপু তোমার নামের একটা আমার নামের একটা।।
মেঘ এক পলক তাকালো শামুকের দিকে।
শামুক গুলোর উপর সুন্দর করে ভেসে আছে নামটা,
মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আবির ভাই কখন এসেছে?”
মীম হাসিমুখে উত্তর দিলো,
“কিছুক্ষণ আগেই এসেছে । ”
মেঘ আর কিছু না বলে সিঁড়ি দিয়ে ব্যস্ত পায়ে উঠতে লাগলো।
মীম পিছন থেকে ডাকলো,
আপু কোথায় যাচ্ছো, আরও গিফট আনছে ভাইয়া, আসো দেখে যাও।
মেঘ গলা উঁচু করে বললো,
“একটু পরে আসছি। ”
হুটোপুটি করে উঠে, অন্তহীন ছুটে আবির ভাইয়ের রুমের দিকে, ঠিক দরজার সামনে এসে থামে, উত্তেজিত হাতের ধা*ক্কায় চাপানো দরজা সহসা খুলে গেলো,
আবির শাওয়ার শেষ করে কোমড়ে টাওয়েল জড়িয়ে উন্মুক্ত শরীরে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে মাত্র। সারা শরীরে বিন্দু বিন্দু পানিতে চিকচিক করছে। প্রশস্ত বুকের লোমগুলোতেও পানি জমে আছে। চুল থেকে টুপ টুপ করে পানি পরছে।
মেঘের দিকে নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে আবির। মেয়েটার এলোমেলো চুলগুলো উড়ছে এদিকসেদিক। এই কয়দিনেই অষ্টাদশীর মুখটা মলিন হয়ে গেছে। গায়ের রঙও কিছুটা চেপে গেছে। গভীর দৃষ্টিতে তা পরখ করতে ব্যস্ত আবির।
এদিকে আবির ভাইয়ের আবেশিত, নেশা ভরা চোখের চাউনীতে অষ্টাদশীর কোমল মনে অশান্ত, অস্থির ঢেউ আঁচড়ে পরে৷ মনে হচ্ছে সিডর, আইলা, জলোচ্ছ্বাস সবকিছু একসাথে হানা দিয়েছে। এতদিন পর প্রিয় মানুষটাকে দেখছে তাও আবার এই অবস্থায়! আবির ভাইকে এই অবস্থায় দেখে মেঘের অন্তঃস্থলে শিহরণ জাগায়।
মেঘের মনে অকস্মাৎ গান বেজে উঠলো,
“দৃষ্টিতে যেন সে রাসপুতিন
খু*ন হয়ে যায় আমি প্রতিদিন
নামধাম জানি, সাথে তার সবকিছু
তবুও নিলাম আমি তার পিছু!’
টেনে হিঁচড়ে অনেক কষ্টে দৃষ্টি নামালো মেঘ। বক্ষস্পন্দন জোড়ালো হলো। অষ্টাদশীর ভেতরটা ভরে এলো, এ যেনো প্রশান্তির হাওয়া।
আবির তখনও দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অষ্টাদশীর পানে।
মেঘ গলা খাকাড়ি দিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
“Sorry”
আবিরের এবার হুঁশ ফিরে।
অবাক চোখে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বললো,
“SORRY কেন?”
মেঘ কন্ঠ খাদে নামিয়ে জবাব দিল,
“অসময়ে চলে আসছি তাই,”
এটুকু বলেই চলে যেতে নেয় মেঘ।
আবির হঠাৎ ই গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“দাঁড়া, কি বলতে এসেছিলি বল!”
মেঘ তৎক্ষনাৎ শীতল কন্ঠে বললো,
“ভুলে গেছি ”
আবির কয়েক সেকেন্ড থাকলো, ঠোঁটের কোণায় দুষ্টু হাসি, নিরুদ্বেগ কন্ঠে বললো,
“মনে করে বলে, তারপর যাবি”
আবির ভাইয়ের কথা শুনে মেঘের হাত পা কাঁপা কাঁপি শুরু হয়ে গেছে। আবির ভাই থা*প্পড় দিবে না তো!
মেঘ নরম স্বরে আস্তেধীরে আবারও বললো,।
“সরি আবির ভাই, এভাবে আর রুমে ঢুকবো না। সরি”
আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে, বিরক্তি নিয়ে বললো,
“এত ন্যাকামি করছিস কেনো মেঘ,
তুই কি চাচ্ছিস, এখন আমি চিৎকার দিয়ে বাড়ির সব মানুষ জড়ো করে বলি,
“”ওমা গো, ও বাবা গো, মেঘ আমার স*র্বনাশ করে ফেলছে, আমায় খালি গায়ে দেখে ফেলছে, এখন আমার কি হবে!””
আবির ভাইয়ের মুখে এমন কথা শুনে মেঘ হা করে তাকালো আবির ভাইয়ের দিকে। আবির ভাইয়ে খালি গা দেখে মনের ভেতর পুনরায় উতালপাতাল শুরু হয়ে যাচ্ছে৷ মেঘের সমস্ত গায়ে স্রোতের মতো শীতল হাওয়া বয়ে যায়। তৎক্ষনাৎ মাথা নিচু করে ফেললো মেঘ৷
আবির শক্ত কন্ঠে আবার বললো,
“আমি মেয়ে না যে আমায় এই অবস্থায় দেখে ফেলছিস বলে মানসম্মান চলে যাবে। তুই কি বলতে আসছিলি সেটা বল। ”
মেঘ এবার মাথা নিচু করে কাঁপা কাঁপা গলায় আস্তে আস্তে বললো,
“আপনাকে দেখতে আসছিলাম”
আবির ভ্রু কুঁচকে তাকালো, তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
“দেখতে আসছিস দেখ, খোঁজ নে আমার, এত ফরমালিটি করছিস কেনো?”
মেঘ নরম স্বরে বললো,
“দেখেছি এখন আসি!”
ঘুরে এক পা ফেলতেই, আবির ডাকলো,
“তোর সাথে কথা আছে, বস এসে”
মেঘ ঠায় দাঁড়িয়ে পরলো সেখানে। মেঘের এবার রক্ত সঞ্চালণ বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি হলো। মুখ তুলে তাকাতেও পারছে না। মনে মনে বলছে,
“আল্লাহ বাঁচাও ”
আবির আবার বললো,
“বসতে বললাম তো তোকে”
মেঘ ধীরস্থির পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার কোণায় বসেছে৷ চিবুক নামিয়েছে গলায়। দৃষ্টি তার ফ্লোরে৷
আবির একটা টিশার্ট হাতে নিয়ে ঘুরে এসে মেঘের থেকে কিছুটা দূরে বসেছে।
আবির কঠিন স্বরে বললো,
“কি হয়েছে তোর?”
মেঘ আবারও কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
আবির ভাই আপনি কিছু একটা পড়ুন, প্লিজ।
আবির মুচকি হেসে ভেজা শরীরেই হাতের গেঞ্জি টা পরে নিলো। আর বললো,
“এবার শান্তি হয়ছে? এখন বল কি হয়েছে তোর?”
মেঘ চিবুক নামিয়ে শীতল কন্ঠে উত্তর দিলো,
“কিছু হয় নি। ”
রাগান্বিত স্বরে আবির বললো,
“মেঘ, ভাবছি তোকে মেডিকেলে বিক্রি করে দিব!”
মেঘের সংকীর্ণ মুখটা আরও বেশি ছোট হলো, নিভু নিভু চোখে তাকালো আবির ভাইয়ের দিকে, পাতলা অধর নেড়ে বললো,
“কেনো? আমি কি করেছি?”
আবির অভিভূতের ন্যায় নিষ্পলক চেয়ে রইলো মেঘের দিকে, প্রখর তপ্ত স্বরে বললো,
“”এইযে তুই ঠিকমতো খাচ্ছিস না, দিনকে দিন কঙ্কাল হইতেছিস, তোকে এই বাড়িতে রাখার থেকেও মেডিকেলে রাখলে বেশি কাজে দিবে।””
কন্ঠ ভিজে এলো মেঘের, নেত্র দ্বয় টলমল করছে,
কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“খাই তো আমি!”
আবির এবার সরু নেত্রে তাকালো মেঘের চোখের দিকে, নেত্র যুগল টইটম্বুর হয়ে আছে, পল্লব ফেললেই পানি গড়িয়ে পরবে গাল বেয়ে।
আবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা শুরু করলো,
এই কয়দিনে না তুই ঠিক মতো খেয়েছিস আর না তুই ঠিক মতো কোনো কাজ করেছিস। খাওয়া আর ঘুম যে ঠিকমতো করিস নি তা তোকে দেখলেই বুঝা যাচ্ছে। চুল গুলো কতদিন আঁচড়াস না আল্লাহ জানে। এমনকি তুই পড়াশোনাও করিস না। কোচিং, টিউশনের প্রতিটা পরীক্ষায় কম নাম্বার পেয়েছিস
একটু থেমে রাগে কটমট করে বললো,
“তুই কি পড়াশোনা করতে চাচ্ছিস না? তুই পড়াশোনা না করলে বল আমি বাড়ির সবার সাথে কথা বলে নিবো। আজকের পর কোনোদিন তোর বই নিয়ে বসতে হবে না। এরজন্য তোকে কেউ কিচ্ছু বলবে না!”
মেঘের গাল বেয়ে অঝোরে পানি পরছে। কান্নারত কন্ঠে বললো,
“আমি পড়াশোনা করবো!”
আবির পুনরায় গুরুভার কন্ঠে বললো,
“১ সপ্তাহে কোচিং, টিউশনের পরীক্ষায় কম নাম্বার পাওয়ার কারণ কি?”
মেঘ ভণিতা ছাড়ায় বলে উঠলো,
কম পায় নি তো!
আবির দাঁতে দাঁত চেপে, কন্ঠ তিনগুণ ভারি করে বললো,
“আমার সামনে অন্ততপক্ষে মিথ্যা বলিস না। প্রতিটা ৩০ মার্কের পরীক্ষায় তুই ১২/১৫/২০ পেয়েছিস। এগুলো কি খারাপ মার্ক না? এই মার্ক পেলে তুই জীবনে চান্স পাবি?”
মেঘ অকস্মাৎ আবির ভাইয়ের দিকে তাকায়,আওয়াজ বিহীন কান্নায় গাল বেয়ে গলায় এসেছে অশ্রুরা।
ভেজা কন্ঠে অবাক চোখে তাকিয়ে বললো,
“আপনি কিভাবে জানেন?”
আবির উদ্বেলিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে অষ্টাদশীর পানে, শক্ত কন্ঠে বললো,
“মেঘ আমি তোকে ছাড় দিয়েছি, ছেড়ে দেয় নি!
তুই কি ভাবছিস তোর কোনো খবর আমার কাছে নাই? তোর কোচিং এর পরিচালক আমার স্কুল ফ্রেন্ড। তাছাড়াও তোর নাম্বারের পাশে গার্ডিয়ানের যে নাম্বার টা দেয়া কোচিং এ সেটাও আমার নাম্বার। তুই পরীক্ষায় কত পাস, তোর কবে কি পরীক্ষা সব মেসেজ যেমন তোর কাছে যায়, তেমনি আমার কাছেও আসে। তোর টিউশনের স্যারও আমার পরিচিত। তুই যেদিকে পা দিবি সবটায় আমার দখলে। তাই মিথ্যা বলা, কোনোকিছু লুকানোর চেষ্টা কখনো করিস না!”
মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে কথা গুলো শুনলো, দুরু দুরু বুক কা*পছে। উদগ্রীব চোখদুটো লম্বাচওড়া মানুষটার মুখের দিকে৷ কান্না থেমে গেছে। গালে পানির দাগ স্পষ্ট । উদ্বেগহীন চাউনী আবির ভাইয়ের।
কয়েক মুহুর্ত চোখাচোখি হলো দুজনের।শেষমেশ আবির ভাই দৃষ্টি ফেরালো।
মেঘ আর কিছু বলার ভাষা খোঁজে পাচ্ছে না। চুপচাপ পা বাড়ায় দরজার দিকে,
আবির সহসা ডাকে,
“দাঁড়া!”
মেঘের পা কাঁপছে,
আবির হাতে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে আসলো মেঘের কাছে। আবির ভাই কাছাকাছি আসতেই নাকে লাগলো চিরচেনা, পরিচিত গতরের গন্ধ৷ মাত্র শাওয়ার নেয়ায় সে গন্ধটা যেনো অন্যরকম সুন্দর লাগছিলো।
আবির শপিং ব্যাগ এগিয়ে দিলো মেঘের দিকে। আর বললো,
“এগুলো তোর, আর আজকের পর পরীক্ষা, পড়াশোনা, নিজের যত্নে একটুখানি ত্রুটি যদি আমি দেখি তাহলে আর মুখে কিছু বলবো না। যা এখন”
আবির ভাইয়ের ঠান্ডা হুমকিতে কম্পিত হলো অষ্টাদশীর দেহ। আঙ্গুল শুদ্ধ কাঁপছে। কাঁপা হাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে ছুটে পালালো রুম থেকে।
নিজের রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। শপিং ব্যাগটা বিছানার পাশে রেখে বিছানায় শুয়ে পরলো মেঘ। শপিং ব্যাগ টা খুলে দেখার ইচ্ছেও করছে না। ইচ্ছের থেকেও বড় বিষয় সেই শক্তিটায় পাচ্ছে না। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো আবির ভাইয়ের সেই উন্মুক্ত দেহ, গায়ে চিকচিক করতে থাকা বিন্দু বিন্দু পানি, সেই ধারালো চাউনী। অষ্টাদশীর হৃদয়ে লাগছে বসন্তের হাওয়া।। হৃদপিণ্ডের কম্পনের মাত্রা এতটায় তীব্র যা সহ্য করতে না পেরে মেঘ ডানহাত দিয়ে চেপে ধরেছে। কিন্তু তাতেও যেনো কম্পন থামছে না।
সহসা চোখ মেলে তাকালো মেঘ।
চোখের সামনে থেকে যেনো আবির ভাই সরছেই না। চোখ বন্ধ করলেও আবির ভাইকে দেখছে, চোখ মেলে তাকালেও আবির ভাইকেই দেখছে৷ আর বার বার মাথায় আসছে, আবির ভাইয়ের বলা কথা গুলো,
“মেঘ তোকে ছাড় দিয়েছি, ছেড়ে দেয় নি!”
আবার মনে হচ্ছে,
“তুই যেদিকে পা দিবি সবটায় আমার দখলে”
এসব ভেবেই বারবার কেঁপে উঠছে অষ্টাদশী সাথে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে । প্রতিটা মেয়েই চাই তার প্রিয়জন তাকে আগলে রাখুন, চোখেচোখে রাখুক তেমনি মেঘের কাছে আবির ভাইও প্রিয়মানুষ৷৷ আবির ভাই যদি বোনের নজরেও দেখে তারপরও তে মেঘ কে নিয়ে ভাবে এটা ভেবেই মানসিক শান্তি পাচ্ছে মেয়েটা।
এভাবে চললো ৩০ মিনিটের উপরে৷ তারপর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো মেঘ।
উঠলো ঠিক সন্ধ্যে নামার আগে। ফ্রেশ হয়ে এসে তৎক্ষনাৎ শপিং ব্যাগটা টেনে আনলো নিজের কাছে৷ শপিং ব্যাগটা উল্টে সবগুলো জিনিস বিছানার উপর ফেললো।
অনেক ছোট ছোট জিনিস এলোমেলো হয়ে পরে আছে বিছানার উপর। কম করে হলেও ১৫-২০ টা হাতের ব্রেসলেট, মুক্তার মালা, কানের দুলের সংখ্যা অগণিত। দেখে মনে হচ্ছে ওনি বেছে দেখার সময় পান নি। যা পেয়েছেন সব নিয়ে নিয়েছেন। বড় একটা শামুকে লিখা, “My Pursuit” আরেকটা শামুকে লিখা, #মাহদিবা_খান_মেঘ এছাড়াও অসংখ্য ছোট ছোট শামুক একটা কাঁচের বয়ম ভরা যার সবগুলোই আবির নিজের হাতে কুড়িয়ে এনেছে। এগুলো বাদের আরও যা যা সাজার জিনিস ছিল, খাবার জিনিস যেগুলোর টেস্ট ভালো এগুলো দিয়েছে মেঘকে।
মেঘ বিস্ময়কর চোখে তাকিয়ে দেখছে সবগুলো জিনিস,
প্রিয়মানুষের নাম অথবা প্রিয়জনের কন্ঠ যেখানে আকাশ সম মন খারাপ দূর করতে সক্ষম সেখানে তার দেয়া সামান্যতম উপহারও অমূল্য সম্পদ ।
আবির ভাই যে তার কথা ভেবে আলাদা ভাবে জিনিস গুলো এনেছেন এতেই যেনো অষ্টাদশী খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে।। একটা মুক্তার মালা গলায় পরলো, দুহাতে দুটা ব্রেসলেট, কানেও দুল পরলো এক সেট। ঠোঁটে হালকা গোলাপি কালার লিপস্টিকও দিয়েছে।
উত্তেজিত পায়ে বাহিরে বের হলো নিজের রুম থেকে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাবে তখন ই চোখ পরে আবির ভাই উঠতেছে সিঁড়ি দিয়ে। হয়তো কোথাও গিয়েছিলেন,
মেঘ সিঁড়ি দিয়ে আর নামে নি ঠায় দাড়িয়ে আছে সেখানে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে।
আবির ভাই কাছাকাছি আসতেই উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলো,
“আবির ভাই, আমাকে কেমন লাগছে? ”
আবির সিঁড়ি থেকে চোখ তুলে মেঘের দিকে তাকালো, কয়েক সেকেন্ড পর চোখ নামিয়ে বললো,
“ভালো!”
এমন ভাবলেশহীন উত্তরে মেঘের উত্তেজনা মিলিয়ে গেছে, মলিন হয়ে গেলো মুখটা, তবুও কিছুটা স্বাভাবিক স্বরে বললো,
“Thank You Abir Vai”
আবির নিজের মতো রুমের দিকে চলে যায়।
মেঘ কিছুক্ষণ এখানেই দাঁড়িয়ে থাকে আর মনে মনে বলে,
“সুন্দর লাগছে বললে কি আপনার জাত চলে যেতো?
হি*টলার একটা”
চলবে…….
#পেইজঃSalma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
মেঘ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মনে মনে আবির ভাইকে খুব করে বক*লো। তারপর মন শান্ত করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেলো মীমের রুমে। মীম এখনও নিচেই আছে৷ ২-৩ দিনের মধ্যে উপরের রুমে চলে আসবে।
মেঘ মীমের রুমের দরজায় দাঁড়াতেই মীম চোখ তুলে তাকালো। মেঘ কে দেখে উত্তে*জনায় চোখ বড় বড় করে তাকালো সহসা উঠে এলো কাছে,
মীম: আপু মাশাআল্লাহ তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে! মুক্তার মালাতে তোমার মুখ টা চকচক করছে।
মেঘ দাঁত বের করে হাসলো,
মীম তৎক্ষনাৎ ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে শপিং ব্যাগ বের করে মেঘের হাতে দিলো। মেঘ জিনিস গুলো বের না করেই দেখার চেষ্টা করলো, মীমের জন্য আনা জিনিস মেঘের তিনভাগের এক ভাগ হবে।
মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
” সবগুলো সুন্দর হয়েছে । তুই একসেট পড় তারপর আমরা ছবি তুলবো নে”
মীম ও হাসি মুখে রাজি হয়ে গেলো। মীম হালকা সাজুগুজু করে নিলো। তারপর দুই বোন সোফায় বসে ছবি তুলায় ব্যস্ত হলো । ওদের হাসির শব্দ শুনে আদিও রুম থেকে ছুটে এসেছে। আদিকে সহ ৩ ভাই বোন বেশ কিছু ছবি তুললো, তারপর ছবি দেখে খুনসুটি করতে লাগলো, কাকে কোন ছবিতে কেমন লাগছে এসব নিয়ে৷
আবির সিঁড়ি দিয়ে ব্যস্ত পায়ে নামছে। মেঘের চোখে পরতেই অকস্মাৎ হাসি থেমে গেলো মেঘের ।
মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বললো,
“তোরা রুমে গিয়ে পড়তে বস, আমিও রুমে চলে যায়”
আবির দ্রুত পায়ে হেঁটে ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে মাকে জিজ্ঞেস করলো,
“আম্মু, রান্না হয়েছে?”
মালিহা খান: হ্যাঁ রান্না শেষের দিকে। খেতে দিব তোকে?
আবির: হ্যাঁ।
ঐদিকে মেঘ চুপিচুপি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। বিকেলেই আবির ভাই পড়া নিয়ে কথা শুনাইছে।এখনও আড্ডা দিচ্ছে দেখলে নিশ্চিত মা*ইর দিবে। এই ভ*য়ে রুমে যেতে নেয় মেঘ।
৪-৫ টা সিঁড়ি উঠলো কি না!
অকস্মাৎ আবির ডেকে উঠলো,
“মেঘ, এদিকে আয়”
আবির ভাইয়ের কথায় থমকে দাঁড়ায় মেঘ, মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করছে। ধীরগতিতে নিচে নেমে ডাইনিং টেবিলের কাছে আসলো।আবির পকেটে হাত দিয়ে টেবিলে হালকা ধাক্কা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দাঁড়ানোর স্টাইল দেখে মেঘ পুরাই ফিদা!অষ্টাদশীর মনের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়েছে। মাথা নিচু করে দাঁড়ালো মেঘ।
আবির গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“খেতে বস!”
মেঘ ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে নরম স্বরে বললো,
“খিদে নেই,পরে… ”
এতটুকু বলতেই চোখ পরলো আবির ভাইয়ের চোখের দিকে,
চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে।
মেঘের হাতপা কাঁপতে শুরু করেছে। আর কিছু বলার সাহস করলো না। চুপচাপ চেয়ার টেনে বসে পরলো।
আবিরও এবার টেবিল ঘুরে নিজের চেয়ার টেনে বসলো। মেঘ মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে৷
আবির একবার মেঘের দিকে তাকাচ্ছে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে রান্নাঘরে দেখছে।
মালিহা খান আর হালিমা খান টেবিলে খাবার রাখতে ব্যস্ত হলো।
আবির একটা প্লেটে ভাত দিয়ে এগিয়ে দিলো মেঘের দিকে।
ছোট করে বললো,
“নে খা”
মেঘ কোমল হাতে প্লেট ধরতে হাত বাড়ায় কিন্তু হাত পায়ের সাথে শরীরের কাঁপাকাঁপির তীব্রতায় প্লেট পড়ে যেতে নেয়। আবির ছেড়ে দিতে নিয়েও মেঘের এ অবস্থায় আবার প্লেট ধরতে ব্যস্ত হলো।
রাগান্বিত কন্ঠে বললো,
“তোর শরীরে কতটুকু শক্তি বুঝ এখন”
হাত বাড়িয়ে মেঘের সামনে প্লেট রেখে নিজে খাওয়াতে মনোযোগ দিলো৷
আবির ভাইয়ের কথায় মেঘ মাথা নিচু করে ছোট করে ভেঙছি কাটলো, আর বিড়বিড় করে বললো,
“আপনি সামনে আসলেই তো আমার সব শক্তি বিলীন হয়ে যায়! আমি কি করবো?”
আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মেঘের দিকে, কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বললো,
“তুই কি ভাত খাবি? নাকি থা*প্পড় খাবি?”
মেঘ আবির ভাইয়ের কথায় আঁতকে উঠে, আস্তে আস্তে খাওয়া শুর করে৷ মেঘের এই ধীরস্থির গতিতে খাওয়া দেখে আবির বেশ কয়েকবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছে কিন্তু কিছু বলছে না। নিজের খাওয়া শেষ করে বেসিন থেকে হাত ধৌয়ে এসে পুনরায় চেয়ারে বসলো৷
মেঘ তখনও আস্তে আস্তে খাচ্ছিলো কিন্তু আবির ভাইয়ের আবার বসা দেখে বুকটা কেঁ*পে উঠে, খাওয়ার গতিটা কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে।
আবির বিস্ময়কর চোখে তাকিয়ে আছে অষ্টাদশীর দিকে। গলায় মুক্তার মালাতে জ্বলজ্বল করছে মুখটা । খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে মেঘের খাওয়া। মেঘ একপ্রকার নাকে মুখে খাবার শেষ করছে। কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই আবির ভাই আবারও প্লেটে খাবার দিলো,
মেঘ থাপ্প*ড়ের ভয়ে বলতে চেয়েও কিছু বলতে পারছে না।
বাধ্য মেয়ের মতো চুপ করে খাচ্ছে, এদিকে আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
হালিমা খান আর মালিহা খান রান্নাঘরে কাজ করছিলেন কিন্তু আবিরের এমন কর্মকাণ্ডে তারাও যেনো খুশিই হয়েছেন। মেঘ বাড়ির কারো কথা শুনে না। বড় আব্বুর সামনে একটু সম্মানার্থে লক্ষী মেয়ের মতো থাকে। তাছাড়া বাবা মা, কাকামনি, কাকিয়া কারো কথায় শুনে না। তানভির এত বছর ধ*মকে একটু আধটু খাওয়াতো কিন্তু সারাদিন মুখ ভোঁ*তা করে রাখতো। তানভির সারাদিন শেষে রাতের বেলা বোনের জন্য এটা সেটা কিনে এনে বোনের রাগ ভাঙাতো। এতবছর পর, আবির যেনো দ্বিতীয় ব্যক্তি যে মেঘকে শা*সন করে, জো*র করে খাওয়ায় আর মেঘ ও যেনো বাধ্য মেয়ের মতো সবকিছু মেনে নেয়। তানভির ভাইয়ার সামনে তে*জ দেখালেও আবির ভাইয়ের সামনে মেঘ একেবারে নিশ্চল হয়ে যায়।
মেঘের দূর্দ*শা দেখে মালিহা খান রান্নাঘর থেকেই বলছেন,
“মেয়েটাকে ছেড়ে দে বাবা, আর খেতে পারছে না তো!”
আবির গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ও যদি ঠিকমতো খেতো তাহলে আমার এভাবে বসে থেকে ও কে খাওয়াতে হতো না। ”
কেউ আর কোনো কথা বললো না, মেঘ চুপচাপ খাওয়া শেষ করলো। মেঘের খাওয়া শেষ হওয়া মাত্রই আবির উঠে বের হয়ে গেলো বাড়ি থেকে।
মেঘ নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ দরজার দিকে। তারপর উঠে নিজের রুমে চলে গেলো। একটু রেস্ট নিয়ে পড়তে বসলো। রাত ১২ টার উপরে বাজে মেঘ পড়তেছে কিন্তু আবির ভাই এখনও আসছে না। চিন্তা লাগছে মেঘের, বারবার উঠে বারান্দায় যাচ্ছে মেঘ।
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী
★★★
তানভির ইদানীং খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়ে কাজ করছে। মনোনয়নের ফলাফল ঘোষণা করবে আগামীকাল৷ কারো চোখে ঘুম নেই। দল থেকে মনোনয়ন পেয়ে গেলে আলহামদুলিল্লাহ। তারপর প্রচারণা চালাতে হবে। তারা কোনোভাবেই আজ রাতে তানভিরকে ছাড়ছিলো না, গো*পন মিটিং চলছে এমপির বাড়িতে । রাজনৈতিক মিটিং মিছিল থেকে ভাইকে আনতে বাধ্য হয়ে আবিরকেই যেতে হলো । এমপির বাড়ির হলরুমে মিটিং চলছিলো। আবির এমপির বাড়ির সামনে বাইক থামিয়ে হলরুমের দিকে যেতে নিলেই পথ আটকে দাঁড়ায় এমপির মেয়ে।
আবির চোখ গোল গোল করে তাকালো মেয়ের দিকে, রাশভারি কন্ঠে বললো,
“পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন কেনো?”
মেয়ে হাসিমুখে উত্তর দিলো,
“আপনাকে আমার অনেক ভালো লাগে ভাইয়া! প্লিজ আপনার নাম্বার টা দিবেন?”
আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বললো,
“আপনাকে তানভির বলে নি, আমি একজনকে ভালোবাসি? ”
মেয়ে এই কথা পাত্তায় দিলো না, হাসতে হাসতে উত্তর দিলো,
“আমি তো তানভির ভাইয়ার কথা বিশ্বাস করি নি। ওনি আমার সাথে মজা করছেন!”
আবির গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“তানভির সত্যি কথা বলেছে”
মেয়ে এমনভাবে হাসছে যেনো মনে হচ্ছে আবির জোক বলছে।
আবির এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাগান্বিত কন্ঠে বললো,
“শুনো মেয়ে, এই আমিময় আবির অন্য কারো মালিকানায় বন্দি। আমার জীবনের অস্তিত্ব জুড়ে শুধু তার রাজত্ব চলে। ”
এমপির মেয়ে অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো আবিরের দিকে। কোমল কন্ঠে বললো,
“আপনি সত্যি সত্যি কাউকে পছন্দ করেন?”
আবির সহসা বলে উঠলো,
“সে আমার পছন্দ বা ভালো লাগা নয়, সে আমার ভালোবাসা৷ আমি আমৃত্যু ভালোবাসবো তাকে”
মেয়েটার চোখ টলমল করছে,
এটা দেখে আবির এবার বিরক্তি নিয়ে বললো,
“শুনো, আমি শুধুই তোমার মোহ। দুদিন পর সব মোহ কেটে যাবে। আর যে সত্যি সত্যি তোমার জন্য আসবে সে তোমাকে কখনো অজুহাত দিবে না। তার কাছে তোমার প্রায়োরিটি থাকবে সবার প্রথমে। যেমন আমার কাছে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি আমার প্রেয়সীর। আশা করি তুমি আমার কথাগুলো বুঝতে পেরেছো। তাই ভবিষ্যতে এমন কোনো কাজ করবা না বা এমন কোনো কথা বলবা না যে কারণে তোমার এই পা*গলামি গুলো নিয়ে আমার সিরিয়াস হতে হয়। ভালো থেকো।”
গম্ভীর কন্ঠে কথা গুলো বলেই হলরুমের দিকে পা বাড়ায় আবির।
পিছন থেকে এমপির মেয়ে ডেকে উঠলো,
“সরি ভাইয়া, আর কখনো এমন হবে না। প্লিজ আব্বুকে কিছু বলবেন না, প্লিজ!”
আবির মুচকি হাসলো, মেয়েটা যে তার কথা বুঝতে পেরেছে এতেই ভালো লাগলো আবিরের।
হলরুমে ঢুকেই সালাম দিলো এমপি কে। আবিরকে দেখে হ্যান্ডসেক করলেন এমপি।
হাসিমুখে জিজ্ঞেস করালেন,
“কেমন আছো, আবির?”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“জ্বী, আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন? ”
এমপি এবার চিন্তিত স্বরে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো তবে নির্বাচন নিয়ে একটু ঝামেলায় আছি। তা তোমার কোনো দরকার ছিল?”
আবির ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“আসলে তানভির কে নিতে এসেছিলাম। এত রাতে কিভাবে যাবে এজন্য। ”
এমপি আবারও হাসিমুখে বললেন,
“মিটিং শেষ, খাওয়াদাওয়া করে চলে যেয়ো! ”
আবির বললো,
“আমরা খাবো না, অনেক রাত হয়ে গেছে। অন্য কোনো সময় খাবো ”
এমপিও আর জোর করলেন না। আবির তানভিরকে নিয়ে বের হলো বাড়ি থেকে। বাইকে আবিরের পিছনে চুপচাপ বসে আছে তানভির ।।
অনেকটা পথ যাওয়ার পর তানভির ভয়ে ভয়ে বললো,
“ভাইয়া এমপির মেয়ের সাথে দেখা হয়ছিলো?”
আবির বললো,
“হ্যাঁ”
তানভির আস্তে আস্তে বললো,
” তাকে কি বুঝাতে পারছো?”
আবির গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“আমার বুঝানো তো বুঝিয়েছি কিন্তু সে কতটা বুঝেছে এটায় এখন মূল বিষয় “‘
তানভির এবার অভিযোগের স্বরে বললো,
“”আমি কি করবো বলো ভাইয়া, কোনো দরকারে এমপির সাথে দেখা করা, গুরুত্বপূর্ণ মিটিং সবকিছু এমপির বাড়িতে হয়। আমার দেখা যায় প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ২-১ বার এমপির বাড়িতে আসতেই হয়। আর এই মেয়ে যেনো বসেই থাকে কখন আমি আসবো। দেখলেই ছুটে আসে, তোমার কথা জিজ্ঞেস করে শুধু । আমি কতবার বলেছি তুমি একজনকে পছন্দ করো, বিয়ে ঠিক, মেয়ে কোনো কথায় পাত্তা দেয় না। আমি এড়িয়ে গেলেও মেয়ে পথ আটকে দাঁড়ায়। এমপির চোখে এটা পড়লে তো আমাকে কালারিং বানাবে। ভাববে মেয়ের সাথে আমার কিছু চলে। তখন তো ঝামে*লায় আমি ফাঁ*সবো তাই তোমাকে বলেছি। “”
একদমে কথাগুলো বললো তানভির।
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“সমস্যা নাই মেয়ে আশা করি আর কিছু বলবে না তোকে৷ তুই তোর কাজে মনোযোগ দিস। ”
এরমধ্যে বাসায় চলে আসছে দুজন। প্রায় রাত দেড় টায় আবির ভাই বাড়িতে ঢুকলো বাইক নিয়ে পিছনে তানভির ভাইয়া। আবির ভাইকে দেখে মেঘের চিন্তিত মলিন মুখটা তৎক্ষনাৎ জ্বলজ্বল করে উঠেছে। সেই ১২ টা থেকে অপেক্ষা করছে আবির ভাইয়ের জন্য। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের তারা গুনে শেষ করে ফেলছে মনে হয় কিন্তু আবির ভাই আসছিল না। মেঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রফুল্ল মেজাজে দেখতে লাগলো আবির ভাইকে, বাসায় ঢুকার আগ পর্যন্ত যতটা দেখা যাচ্ছিলো৷ তারপর চুপচাপ শুয়ে ঘুমিয়ে পরলো।
★★★★
সকালে আবির রুম থেকে বের হয়ে করিডোর থেকে নিচে তাকালো ডাইনিং টেবিলে মেঘ নেই। এত রাত করে ঘুমানোর জন্য মেঘ সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে নি। আবির মেঘের দরজায় টুকা দিলো। ২ বার শব্দ হতেই ঘুমের মধ্যে টলতে টলতে এসে দরজা খুলে দিলো মেঘ। হাত দিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে তাকালো, সহসা অক্ষি যুগল বিপুল হলো মেঘের,
আবির বিমোহিত লোচনে চেয়ে আছে অষ্টাদশীর মুখের পানে। সদ্য ফুটে উঠা পদ্ম ফুলের ন্যায় সুন্দর লাগছে মেঘকে। খুব করে চাইছে দৃষ্টিতে সরাতে কিন্তু পারছে না।
আবির ভাইকে দেখে মেঘের বুকের ভেতর সেই টিপটিপ আওয়াজ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। মেঘ মুখ ফঁ*সকে ডেকে উঠলো,
“আবির ভাই”
তৎক্ষনাৎ ঘোর কাটলো আবিরের, কিছুটা নড়েচড়ে উঠলো৷
আবির ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
“এত রাতে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলি কেনো?”
আবির ভাইয়ের প্রশ্ন শুনে আঁতকে উঠে মেঘ, অকস্মাৎ চিরচেনা গতরের কাঁপা কাঁপি তীব্র হয়ে উঠে। বুকের ভেতর হাঁ*সফাঁ*স শুরু হয়েছে। হৃদস্পন্দন অনেক বেশি জোড়ালো হলো।
চিবুক নামিয়ে চাপা কন্ঠে বললো,
“রাতে ঘুম ভেঙে গেছিলো! ”
আবির ভ্রু কুঁচকে তাকালো, সহসা গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“ঘুম ভেঙেছিল নাকি ঘুমাইতেই যাস নি, সত্যি করে বল!”
আবির ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা কথা বলার সাহস অষ্টাদশীর এখনও হয়নি।
ভ*য়ে ভ*য়ে বললো,
“ঘুম আসছিলো না!”
আবির এবার ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
“কেনো?”
“মেঘ আর কিছু বলতে পারছে না। মনে হচ্ছে কথা আটকে আসছে গলায়। কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না মুখ থেকে। ”
আবির শ্বাস ঝাড়ে, ভারি স্বরে বললো,
“কি হলো?”
আবির ভাইয়ের ভারি কন্ঠে চুপসে গেলো মেঘ, বিড়বিড় করে বললো,
“আপনার জন্য! ”
আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়, কয়েক মুহুর্ত নিরব থেকে, কন্ঠ তিনগুণ ভারি করে বললো,
“কেনো মেতেছিস ধ্বং*সের খেলায়,
মেঘ, কখনো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পিছনে ছুটবি না। নিজের লক্ষ্য স্থির না করলে, জীবনে কখনো সফল হতে পারবি না। ”
চলবে……
#পেইজঃSalma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
আবির ভাইয়ের এত কঠিন কথাগুলো মেঘের মাথার তিনহাত উপর দিয়ে গেলো। কিছুই বুঝতে পারলো না সে। চিবুক নামিয়েছে গলায়। ওষ্ঠ উল্টে, গাল ফুলালো৷ আবির সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখছে।
আবার রা*গান্বিত কন্ঠে আবির বলে উঠলো,
“এখন যে সময়টা কাটাচ্ছিস, সে সময় আর কখনো আসবে না, আ*জেবা*জে চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দে। ”
মেঘ এবার বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিলো, ধীর কন্ঠে ডাকলো,
“আবির ভাই!”
সহসা আবিরের তীব্র রা*গ বিলীন হয়ে গেছে, ভ্রু কুঁচকে শান্ত চোখে তাকালো অষ্টাদশীর দিকে।
অতঃপর মৃদুগামী কন্ঠে শুধু বললো,
“হুমমমমমম”
“এই হুম তে যেনো এক আকাশ সম ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি মিশে আছে। মেঘ অতর্কিতে তাকালো আবির ভাইয়ের অভিমুখে। এই মোহঘোর মেশানো হুমমম শুনার জন্য মেঘের আমৃত্যু আবির ভাইকে ডাকতে ইচ্ছে হচ্ছে৷ মেঘ সারাজীবন আবির ভাইয়ের কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবে, আবির ভাই প্রতিত্তোরে শুধু হুমমমমম বললেই হবে। ”
এসব ভেবেই অষ্টাদশীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছে ।
আবির পুনরায় গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“কিছু বলবি?”
আবির ভাইয়ের কন্ঠে মেঘের অনিন্দিত কল্পনাদের অবসান হলো। ১ সেকেন্ডেই গায়েব হলো ঠোঁটের কোণের মিষ্টি হাসি। চিবুক নামালো আবির ভাইয়ের মুখের থেকে।
ওষ্ঠপুট নেড়ে নম্রভাবে বললো,
“আবির ভাই আপনি একটু তাড়াতাড়ি বাসায় আসবেন, প্লিজ!”
অকস্মাৎ কথাটা বলে ফেললো মেঘ, কিন্তু এরপরই শুরু হলো কাঁপা কাঁপি, বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে। আল্লাহ জানেন আবির ভাই থা*প্পড় ই দেন কি না। সহসা দু হাত নিজের দুগালে রাখলো মেঘ।
আবির ধম*ক দিতে নিয়ে মেঘের এমন কান্ডে কপাল কুঁচকালো, ঢুক গিলে রাগ গিলে সহসা চাপা কন্ঠে বললো,
“কেনো?”
অষ্টাদশী গালে হাত রেখে কাঁপা-কাঁপা কন্ঠে বললো,
“আপনি বাসায় না ফিরলে আমার ঘুম আসে না! ”
কথাটা বলেই দুচোখ বন্ধ করে, কপাল কুঁচকে দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো মেঘ।
আবির প্রশস্ত নেত্রে চাইলো অষ্টাদশী দিকে। মেঘের হালচাল দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু অষ্টাদশীর চোখ বন্ধ থাকায় শব্দহীন সেই হাসি দেখতে পেলো না।
আবির নিগূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অষ্টাদশীর দিকে যেনো এই দৃষ্টি সহজে কাটানো সম্ভব না।
কয়েক মুহুর্ত চললো এভাবে। কিছুক্ষণ পর আবিরের ফোনে কল আসায় মনোযোগ নষ্ট হলো। পকেট থেকে ফোন বের করলো, অফিসের কল তৎক্ষনাৎ রিসিভ করলো, ৩০ সেকেন্ড হবে হয়তো, কথা বলে রেখে দিলো।
এতক্ষণে মেঘ অনেকটায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু গাল থেকে হাত নামায় নি এখনো।
আবির কল কেটে পুনরায় শক্ত কন্ঠে বললো,
“আমার তাড়াতাড়ি অফিসে যেতে হবে। আমার খাওয়া শেষ হওয়ার আগে তোকে যেনো খাবার টেবিলে দেখি। ”
এই বলে করিডোরের দিকে পা বাড়ালো আবির।
মেঘ পিছন থেকে কোমল কন্ঠে আবার ডেকে উঠলো,
“আবির ভাই”
আবির সহসা উত্তর দিলো,
“হুমমমম”
এই হুমম টা ছোট্ট মেঘের বুকে বারবার যেনো ধা*ক্কা লাগছে।কোমল কন্ঠে বললো,
“বললেন না তো তাড়াতাড়ি আসবেন কি না?”
আবির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো, মেঘ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেললো,
আবির কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“আসতে পারি যদি তুই আমার কথা মানিস!”
আর কিছু না বলে দ্রুত পায়ে নেমে গেলো নিচে। আবির ভাই এত সহজে মেনে নিয়েছে ভেবেই মেঘ খুশিতে আ*ত্মহারা হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে চুল গুলো ঠিকঠাক করে, হুটোপুটি করে নিচে নামতে লাগলো।
হাসিমুখেই এসে বসলো আবির ভাইয়ের বিপরীতে।একবার দেখলো আবির ভাইকে, প্লেটের দিকেও তাকালো, কিন্তু ততক্ষণে আবির ভাইয়ের খাওয়া শেষের দিকে। মেঘ খাওয়া শুরু করতে করতে আবির ভাই খাওয়া শেষ করে উঠে ফ্রেশ হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে চলে যাচ্ছে।
মেঘ এক মুহুর্ত তাকিয়ে রইলো আবির ভাইয়ের দিকে তারপর স্বাভাবিক হয়ে খেতে শুরু করলো৷
আবির ভাইয়ের এত কথার মধ্যে “হুমমমমম” টায় যেনো বার বার কানে বাজছে মেঘের। সবগুলো কথায় মনে পরছে। খাওয়া শেষ করে রুমে গিয়ে শুয়ে শুয়ে আবির ভাইয়ের কথা ভাবছে।মেঘ মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিচ্ছে।সবশেষে সব প্রশ্নের একটায় উত্তর পেলো।।
“আবির ভাই চান আমি ভালোভাবে পড়াশোনা করি তারমানে এতেই আবির ভাই খুশি হবেন। আজ থেকে আমি সিরিয়াসলি পড়াশোনা করবো। তারপর দেখবো আবির ভাই আমার সাথে ভালো ভাবে কথা বলে কি না। ”
কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে সব ভেবে সহসা উঠে পড়তে বসলো। মেঘ সবসময় জোরে পড়ে৷ মেঘ পড়লে করিডোর থেকে তো শুনা যায় ই পাশাপাশি তানভির বা আবিরের রুম থেকেও মোটামুটি শুনা যায় ।গোসল,নামাজ, কোচিং, টিউশন সবকিছু সময়মতো করছে মেঘ যেনো আবির ভাই আর রা*গ দেখাতে না পারে। কি সব ধ্বং*সের কথা বললো এসব কথা কঠিন কথা যেনো আর না শুনতে হয়। আবির ভাই যেনো সর্বদা কোমল, ভালোবাসা মিশ্রিত কন্ঠে “হুমমমম” বলে৷ আর কিছুই বলতে হবে না।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
এদিকে মনোনয়নের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। তানভির দের এমপি দলীয় প্রতীকে মনোনীত হয়েছেন। পার্টি অফিস থেকে শুরু করে এমপির বাড়ি পর্যন্ত হৈচৈ শুরু হয়েছে। নি*ষেধা*জ্ঞা অমান্য করে সব গণহারে মিছিল দিচ্ছে। প্রথমবারের মতো মনোনীত হয়েছেন এমপি৷ তানভির সহ, সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাধারণ সদস্যরা মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন সবাইকে। এক পর্যায়ে এমপির বাড়িতে গেলো তানভির সহ আরও দুজন -চারজন।।।
এমপির মেয়ে হাসিমুখে তানভিরের সামনে এসে দাঁড়ালো। বাবা মনোনয়ন পেয়েছে এতে মেয়ের খুশির সীমা নেই। কিন্তু তানভির মেয়েকে দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেছে। আবির ভাইয়া গতরাতে বুঝিয়ে গেলো তারপর ও যদি মেয়ে পা*গলামিই করে আর সেটা এমপির নজরে পরলে তানভির শেষ।
তানভির কিছুটা ভীতু গলায় বললো,
“কিছু বলবেন?”
এমপির মেয়ে হাসিমুখে উত্তর দিলো,
“হ্যাঁ ভাইয়া। ”
তানভির কপাল কুঁচকে বললো,
“কি?”
এমপির মেয়ে হাসি থামিয়ে কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“I am Sorry Vaiya.. আমি আপনাকে এই কিছুদিন অনেক জ্বালিয়েছি। আপনি এতবার বলেছেন আবির ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড আছে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি নি। গতকাল আবির ভাইয়াও বলে গেছেন ওনার জীবনে অন্য কেউ আছে। এজন্য আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর কোনোদিন ওনার কথা জিজ্ঞেস করবো না আপনাকে। আপনাকেও আর বিরক্ত করবো না কখনো। আপনি অনেক ভালো। আমি চাই আপনি আব্বুর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন, যাতে আব্বু এমপি হতে পারেন। ”
তানভিরের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো।মনে মনে বলছে,
“বাহ! ভাইয়া, তোমার ২ মিনিটের কথায় আমার ১৫ দিনের সমস্যা সমাধান করে দিলে। You are great bro”
হাসিমুখে বললো,
“তুমি যে বুঝতে পারছো এতেই খুশি। ”
এইটুকু বলে মেয়ের থেকে বিদায় নিয়ে এমপির সাথে দেখা করতে চলে গেলো।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেছে কিন্তু এখনও বৃষ্টি শুরু হয় নি। আজ বিকেল থেকেই আকাশে মেঘের গর্জন৷ মেঘ কোচিং শেষে বাসায় এসেছে। মেঘের গর্জনের শব্দে পড়তে বসতে ইচ্ছে করছে না তাই বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে৷ গোধূলি বেলায় টিপটিপ বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। মেঘ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রাস্তায় মানুষের ছুটোছুটি দেখছে।। সবাই ছুটছে নিজস্ব গন্তব্যে। মেঘ বেলকনি থেকে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। বৃষ্টির ফোঁটার স্পর্শে মেঘের সমস্ত অনুভূতিরা যেনো অবশ হয়ে যাচ্ছে, হাত বৃষ্টিতে রেখেই কল্পনার জগতে বিচরণ করছে মেঘ। বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির ছিটে ফোটা মেঘের চোখে মুখে পরতেই হুঁশ ফিরলো অষ্টাদশীর। বেলকনি থেকে রুমে চলে গেলো। টাওয়েল দিয়ে হাত মুখ মুছে বিছানায় বসলো।
মোবাইলের ডাটা অন করতেই একটা নোটিফিকেশন আসছে। ফেসবুকে ঢুকতেই সামনে আসলো আবির ভাইয়ের পোস্ট। অফিসের বেলকনি থেকে তুলা হাতের ছবি। ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টির পানি জমে আছে হাতে।সাথে বৃষ্টি নিয়ে সুন্দর একটা ক্যাপশন ও দিয়েছেন। মেঘ মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখছে। অনুভূতিরা যেনো নাড়াচাড়া দিয়ে উঠেছে মনের ভিতর৷
“আবির ভাইও বৃষ্টিতে হাত ভিজিয়েছে। তারমানে আবির ভাইয়েরও বৃষ্টি ভালোলাগে। ভাবতেই লাজুক হাসলো মেঘ। নিজের ভালোলাগা গুলো যদি ভালোবাসার মানুষের সাথে মিলে যায় তাহলে আর কি লাগে!”
সন্ধ্যার পর ঘন্টাদুয়েক পড়াশোনা করলো মেঘ বৃষ্টি বেশি থাকার কারণে জান্নাত আপু আসবেন না বলেছেন। বাড়ির কর্তারা বাড়ি ফিরে এসেছেন সেই বৃষ্টি শুরুর দিকে৷ গাড়িতে চলাচল করায় বৃষ্টি ছুঁতেই পারেন নি ওনাদের। তানভির ও হৈহল্লা করে বাড়ি ফিরেছে ঘন্টাখানেক আগে। আকলিমা খান ডাকছেন সবাইকে খাবার খাওয়ার জন্য। মেঘ নেমেই একবার দেখলো ডাইনিং টেবিলের দিকে, আবির ভাই এখনও ফিরেন নি বাকি সবাই আছেন। মেঘ পা বাড়ালো টেবিলের দিকে তখনই কাকভেজা হয়ে ফিরেছে আবির।
মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজে একাকার অবস্থা। মেঘ চেয়ারের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে পরলো,
আবিরের এই অবস্থা দেখে মোজাম্মেল খান বলে উঠলেন,
“কিরে, এই বৃষ্টির মধ্যে আসতে গেলি কেন,৷ বৃষ্টি কমলে আসতে পারতি ”
আবির চুল ঝাড়তে ঝাড়তে উত্তর দিলো,
“অফিসে বসে থাকতে ইচ্ছে করছিলো না। ”
সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে। মালিহা খান ডেকে বললেন,
“তুই কি এখন খাবি, নাকি পরে খাবি বাবা?”
আবির সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে উত্তর দিলো,
“৫ মিনিটে আসছি আমি! ”
৫ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে একটা হালকা গোলাপি রঙের, শর্ট হাতার ট্রিশার্ট সাথে কালো ট্রাউজার পরে নিচে নামলো। ততক্ষণে মোজাম্মেল খান, আলী আহমদ খান চলে গেছেন। তানভিরের খাওয়াও শেষের দিকে।
আবির চেয়ার টেনে বসতে নিলে মেঘের নজর পরে আবির ভাইয়ের দিকে। এই প্রথম বার আবির ভাই শর্ট হাতার ট্রিশার্ট পড়েছে৷ তাও আবার সাদা, কালো রঙ বাদে। মেঘ শব্দহীন হেসে উঠলো, দৃষ্টি তার আবির ভাইতে নিবদ্ধ ।
আবির বসে বললো,
“Congratulation Tanvir, Go ahead. Best of luck. ”
মেঘের দৃষ্টি এবার তানভির ভাইয়ার দিকে যায়। তানভির ভাইয়া খুশিতে গদগদ হয়ে উত্তর দিলো,
“Thank you so much Vaiya.”
আবির এবার কিছুটা চিন্তিত স্বরে বললো,
“ঐ বিষয়টা কি সমাধান হয়ছে?”
এবারও তানভির হাসিমুখে জবাব দিলো,
“জ্বী ভাইয়া। আমার কাছেও মাফ চেয়েছে। ”
মেঘ মনোযোগ দিয়ে দুই ভাইয়ের কথোপকথন শুনছিলো, সহসা উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলো,
“কি হয়েছে?”
আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,
“তানভিরদের নেতা দলীয় মনোনয়ন পেয়েছে!”
মেঘও এবার খুশিমনে ভাইকে অভিনন্দন জানায়,সাথে মীম আর আদিও অভিনন্দন জানায়।
মীম মজার ছলেই বলে উঠলো,
“ভাইয়া আমাদের ট্রিট দিবা না?”
তানভির বললো,
“কি ট্রিট চাস বল!”
মেঘ তৎক্ষনাৎ উত্তর দিলো,
“এখন ট্রিট লাগবে না, জিতলে পরে বড় করে ট্রিট খাবো। ”
তানভির বললো,
“ঠিক আছে, আজকে তাহলে আমার পক্ষ থেকে তোদের নুডলস ট্রিট দিব রাত ১০ টায়। ”
মীম বলে উঠলো,
“তুমি রান্না করবা ভাইয়া? ”
তানভির দাঁত বের করে হাসলো, আর বললো,
“হ্যাঁ, আমিই রান্না করবো সাথে ভাইয়া থাকবে!”
আবির অকস্মাৎ কপাল কুঁচকে, ঠাট্টার স্বরে জবাব দিলো,
“ইসসস, তুই ট্রিট দিবি আমি কেন হেল্প করবো? আনন্দ যেমন তুই করে আসছিস, এখন কষ্ট টাও তোকেই করতে হবে। ”
তানভির ভ্রু গুটিয়ে এক পলক তাকালো ভাইয়ার দিকে, তারপর বললো,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে।৷ আমিই করবো। তোমাদের আমার রুমে দাওয়াত রাত ১০ টায়। ”
মেঘ,মীম আর আদি একসাথে বলে উঠে,
“ইয়াহু”
তানভির আঁতকে উঠে বলে,
‘এই থাম থাম, চুপ কর তোরা । বড় আব্বু আর আব্বু শুনলে সব আনন্দ মাটি চা*পা দিয়ে দিবে। ”
তিনজনই থেমে গেলো। তানভির খাওয়া শেষ করে উঠে গেলো। মেঘ খাচ্ছে সাথে আবির ভাইকেও একটু পর পর দেখছে। কয়েকবার দেখার পর হঠাৎ আবির চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের । মেঘ তখনও শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। মেঘের চাউনি দেখে আবির কপাল কুঁচকালো কিন্তু মেঘের সে দিকে নজর নেই। মীম আর আদি খাচ্ছে তাই আবির কোনো কথা না বলে টানা ২-৩ ভ্রু নাচালো, এতক্ষণে মেঘের আবেশ কাটে। লাজুক হেসে মাথা নিচু করে ফেলে। মেঘ মাথা নিচু করেই খাবার শেষ করলো।
রুমে গিয়ে আবারও পড়তে বসলো মেঘ। আবির খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ মা, মামনি আর কাকিয়ার সাথে গল্প করলো। এত রাতে বাড়ি ফেরায় তাদের সাথে ঠিকমতো কথায় হয় না ছেলেটার। গল্প শেষে নিজের রুমে যাওয়ার পথে কানে ভেসে আসে মেঘের পড়ার শব্দ । মুচকি হেসে রুমে চলে গেলো।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
রাত ১০ টার পর তানভিরের রুমে সামনে হাজির হলো মেঘ।বিছানার উপর বসে আছে মীম আর আদি। তানভির খাবার পরিবেশন করছে। মেঘ ঢুকতে নিলেই তানভির বলে উঠে,
“বনু বসার আগে ভাইয়াকে একটু ডেকে আসবি প্লিজ! আর হ্যাঁ জোরে ডাকিস না।৷ আব্বুর কানে গেলে খবর আছে আমার!”
মেঘ মলিন হাসলো। মনের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে যাচ্ছে মেঘের। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলো আবির ভাইয়ের রুমের দিকে। দরজা খুলায় ছিল। মেঘ দরজা থেকে উঁকি দিলো ভিতরে। কিন্তু রুমে কেউ নেই। ধীর পায়ে ভিতরে ঢুকে বেলকনির দিকে পা বাড়ালো মেঘ। আবির ভাই গ্রিলে হাত রেখে তাকিয়ে আছে আকাশের পানে। বৃষ্টি কম তবে আকাশে মেঘের গর্জন হচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর পর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ।
মেঘের খুব ইচ্ছে করছে আবির ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি উপভোগ করবে। তাই চুপচাপ আবির ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে পরেছে। একটু পর পর বিদ্যুৎ চমকানো দেখে আঁতকে উঠছে মেঘ। দিনের বেলা বৃষ্টি তার যতই পছন্দ হোক না কেনো, রাতের বেলা বৃষ্টি হলে মেঘ কখনো বেলকনিতে বের হয় না।। শব্দের মাত্রা তীব্র হলে কানে আঙুল দিয়ে ঘুমায়। আজ সাহস করে রাত ১০ টায় আবির ভাইয়ের পাশে তো দাঁড়িয়েছে কিন্তু বিদ্যুৎ চমকানো দেখে বার বার বুক কাঁপছে অষ্টাদশীর,
আবির তখনও দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে অসীম দূরত্বে। সহসা বলে উঠলো,
“মনে জোর নেই তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?”
মেঘ আবির ভাইয়ের দিকে তাকালো কিন্তু আবির ভাইয়ের অভিব্যক্তি বুঝা গেলো না। তাকিয়ে আছে আকাশের পানে।
মেঘ ভাবছে, “আবির ভাইয়ের কি সব দিকে চোখ আছে? ”
মেঘ আস্তে আস্তে বললো,
“ভাইয়া ডাকতে বলছে আপনাকে। ”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“তুই যা, আমি আসছি!”
মেঘ রুমে ঢুকতে নিতেই ঠা*টার শব্দ হয় সাথে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চিৎকার দিয়ে উঠলো।
আবির দু কদম এগিয়ে সহসা মেঘের হাত ঝাপ্টে ধরে বলে,
“কি হয়ছে? ভয় পাইছিস?”
আবির পুনরায় বললো,
“তুই ভিতরে ঢুক আমি আছি, ভয় পাইস না।”
মেঘ দু’হাতে আঁকড়ে ধরলো আবির ভাইয়ের হাত, গুটি গুটি পায়ে ভেতরে ঢুকলো। আবির একহাতে বিছানার উপর থেকে ফোন টা নিয়ে ফ্ল্যাশ জ্বালালো।
মেঘ তখনও শক্ত করে ধরে আছে আবির ভাইয়ের হাত। ফোনের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মেঘের ভ*য়ার্ত মুখমন্ডল, কপাল কুঁচকে চোখ বন্ধ করে রেখেছে।
আবির কোমল কন্ঠে বললো,
“কিছু হয় নি! তাকা”
মেঘ আস্তে আস্তে চোখ পিটপিট করে তাকালো। চোখ পরলো আবির ভাইয়ের হাতের দিকে। দুহাতে খামছে ধরে আছে আবির ভাইয়ের হাত। তৎক্ষনাৎ ছেড়ে দিলো হাত। ততক্ষণে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। মেঘ আর আবির ভাইয়ের দিকে তাকালো না ছুটে চলে গেলো রুম থেকে। ধীরপায়ে ঢুকলো তানভির ভাইয়ার রুমে। বিছানার এককোনায় বসে পড়লো মাথা নিচু করে।
১ মিনিটের মধ্যে আবির ও রুমে ঢুকলো। তানভির সবাইকে খাবার দিতে ব্যস্ত হলো- নুডলস, চা,বিস্কুট, সাথে মুড়ি মাখিয়েছে।
আবির তানভিরের দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার স্বরে বললো,
“বাহ! এত আয়োজন? সাবাশ!”
তানভির হাসিমুখে বললো,
“খেতে ভালো না হলে কেউ অভিযোগ করবা না!”
সবাই খাওয়া শুরু করলো। মেঘের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কোনো ভাবেই খেতে পারছে না। কোনোরকমে চোখ তুলে তাকালো আবির ভাইয়ের হাতের দিকে, দেখার চেষ্টা করলো, খামছি টা কতটা লেগেছে। আবির ভাই হাত ঘুরাতেই চোখে পরলো সেই দাগ। তিন আঙুলের নখের চাপে চামড়া কেটে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। মেঘ আবির ভাইয়ের হাতের অবস্থা দেখে ভ্রু কুঁচকালো। টলমল করছে চোখ, নিজের প্রতি খুব রা*গ হচ্ছে, বার বার দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
আদি আবির ভাইয়ের হাত দেখে চিৎকার দিয়ে উঠলো,
“ভাইয়া তোমার হাতে কি হয়েছে?”
সবার নজর পরলো আবিরের হাতের দিকে।
আবির একপলক দেখলো মেঘকে, তারপর স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“কিছু হয় নি! কোথায় লেগে কেটে গেছে!”
চলবে………
(১৫)
#পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী
তানভিরের রুম থেকে খেয়ে আবির চলে গেছে নিজের রুমে। ১ মিনিটের মধ্যে মেঘও বের হয়ে গেছে, কোনো দিক না তাকিয়ে চলে গেলো আবির ভাইয়ের রুমে। দরজার বাহির থেকে ধীর কন্ঠে ডাকলো,
“আবির ভাই..”
কোনো সারা নেই। দ্বিতীয় বার আর একটু জোরে ডাকলো,
“আবির ভাই..”
আবির বললো,
“ভেতর আয়”
আবির আধশোয়া অবস্থায় ফোনে কি যেনো করছে। ফ্যানের বাতাসে আবিরের চুলগুলো এলোমেলো উড়ছে। মেঘ আবির ভাইয়ের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে চুপচাপ চেয়ে আছে আবির ভাইয়ের হাতের পানে।
আবির অকস্মাৎ বলে উঠলো,
“কিছু বলবি?”
মেঘ কন্ঠ খাদে নামিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“Sorry আবির ভাই, এতটা লেগে যাবে বুঝতে পারি নি। ”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠেই উত্তর দিলো,
“আমি কি কিছু বলেছি তোকে?”
মেঘ পুনরায় বলে উঠলো,
“বেশি ব্যথা লাগছে? মলম লাগিয়েছেন?”
আবির গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলো,
“না! কিছু লাগাতে হবে না।”
মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে, শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
“লাগাতে হবে !”
মেঘের শক্ত কন্ঠের কথা শুনে আবির মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে অষ্টাদশীর পানে তাকালো৷ মেঘের চোখে মুখে অধিকারবোধ স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে।
আবির নিরুদ্বেগ কন্ঠে বললো,
“তাহলে তুই ই লাগিয়ে দে!”
এতক্ষণ শক্ত থাকলেও এই কথা শুনার পর মেঘ আর শক্ত থাকতে পারলো না। বুকের ভেতর অনুভূতিরা ঢোল বাজিয়ে নৃত্য করছে। হাতপায়ের কম্পন তীব্র হতে শুরু করেছে৷ আবির ভাইকে মলম লাগিয়ে দিবে এটা ভাবতেই বার বার শিউরে উঠছে অষ্টাদশী।
আবির পুনরায় শক্ত কন্ঠে বললো,
“হয় নিজে লাগিয়ে দিয়ে যা, না হয় চুপচাপ ঘুমাতে যাহ! আমি লাগাতে পারবো না। ”
আশপাশে তাকাচ্ছে মেঘ। চোখ পরলো ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা মলমের দিকে।মলম টা হাতে নিয়ে আবির ভাইয়ের কাছাকাছি বসলো৷ হৃদপিণ্ড ছুটছে এদিক সেদিক। আঙুল কাঁপছে অষ্টাদশীর। শীতল হস্তে, আলতোভাবে মলম ছুঁয়ালো আবির ভাইয়ের হাতের সেই কাটা অংশে। হালকা কাঁ*পলো আবিরের হাত।মেঘ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে মলম লাগিয়ে দিচ্ছে।
আবির ভ্রু গুটিয়ে, শান্ত কন্ঠে বললো,
“ভাবিস না তোকে দিয়ে খাটাচ্ছি আমি!
যে ভুল করবে, শাস্তি তো তাকেই পেতে হবে!”
মেঘ মনে মনে ভাবছে,
“এরকম হাজারটা শা*স্তি পেতেও আমি রাজি!”
আবির অভিভূতের ন্যায় নিষ্পলক চেয়ে আছে মেঘের দিকে । আবির ভাইয়ের দৃষ্টি বুঝতে পেরে মেঘ চিবুক নামালো, কোনোদিকে না তাকিয়ে কোনোরকমে মলম লাগিয়ে, চুপচাপ রুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। যেনো আর কিছুক্ষণ আবির ভাইয়ের কাছাকাছি থাকলে, নিজেকে বাঁ*চাতে পারবে না।
আবির একবার হাতের দিকে দেখলো তারপর অষ্টাদশীর যাওয়ার পানে তাকিয়ে মৃদু হাসলো।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী
★★★★
সকাল বিকাল মেঘের নজর শুধু আবির ভাইয়ের হাতের দিকে। কেটে গেলো কয়েকদিন। খান বাড়ির প্রতিটা মানুষ ব্যস্ত নিজের কাজে। ইকবাল খান সিলেট থেকে রাতে ফিরেছেন। সেই খুশিতে সবাই জড়ো হয়েছে ড্রয়িং রুমে সাথে বাহারি খাবারের মেলা৷ সবাই আড্ডা আর খওয়ায় ব্যস্ত থাকলেও বরাবরের মতোই আবির ব্যস্ত ছিল নিজের কাজে। সামনের মাসের ১ তারিখ নিজের অফিস শুরু হবে, তাই সবকিছু গুছাতে হচ্ছে । সাথে আবিরের বেস্ট ফ্রেন্ড রাকিব আর রাসেল তো আছেই।
রাকিব আর আবির প্রাইমারি স্কুল থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড তারপর তাদের জীবনে আসে রাসেল। বর্তমানে তারা ৩ জনের জীবন এক সুতোয় বাঁধা। তাই কোম্পানিও শুরু করছে একসাথে। এছাড়াও আরও ২ বন্ধু আছে আবিরের, মোবারক এবং লিমন৷ এই ৫ জন প্রতি শুক্রবার একসাথে আড্ডা দেয় মাঝে মাঝে তানভিরও যুক্ত হয় তাদের সাথে। তবে সব বন্ধুর মধ্যেও একজন স্পেশাল ফ্রেন্ড থাকে যে সবকিছু জানে, সেটা হলো রাকিব।
সবার মাঝে আবির নেই বলে ইকবাল খান কয়েকবার আবিরকে কল দিচ্ছেন কিন্তু আবির কল রিসিভ করছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় ঢুকলো আবির।
পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বললো,
“সরি,কাকামনি! বাইকে ছিলাম তাই রিসিভ করতে পারি নি।”
ইকবাল খান একগাল হেসে বললেন,
“সমস্যা নাই, আয় বোস এসে। ”
আবির ভাই আসতেই মেঘ সোফা থেকে উঠে জায়গা দেয় আবির ভাইকে। আবির এসে মেঘের জায়গায় বসে স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কেমন আছো কাকামনি? কাজ ঠিকঠাক হয়েছে?”
ইকবাল খান হাসিমুখে উত্তর দিলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। সব ঠিকঠাক করে আসছি। আশা করি ২ মাসের মধ্যে আর সিলেটের পা দিতে হবে না।”
ইকবাল খান পুনরায় মজার ছলেই বললেন,
“তোর কোম্পানি কবে ওপেন করবি?আমাদেরকে দাওয়াত দিবি না?”
আবির মলিন হেসে উত্তর দিলো,
“ইনশাআল্লাহ আগামী মাসের ১ তারিখ! তোমাদের সবার জন্য কার্ড রেডি করছি খুব শীঘ্রই পেয়ে যাবে!”
ইকবাল খান অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন,
“কার্ড? এত VIP আমি?”
আবির এবার স্ব শব্দে হেসো উত্তর দিলো,
“কার্ড স্পেশালি আব্বু আর চাচ্চুর জন্য , তুমি একা মিস যাবে কেনো তাই তোমাকেও দিবো!”
তারপর তারা দুজন ব্যস্ত হলো অফিসের আলোচনায়। এদিকে মেঘ বিমোহিত নয়নে আবির ভাইকে দেখছে আর ভাবছে,
“একটা মানুষ এত সুন্দর করে কিভাবে কথা বলে?”
আলী আহমদ খান ও মোজাম্মেল খান হাজির হলো এই আড্ডায় । তাই মেঘ নিজের রুমে গিয়ে পড়তে বসেছে।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী ( scsalma90)
★★★★
শুক্রবার মানেই খান বাড়িতে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। প্রতি শুক্রবারের মতো আজও বাড়িতে বেশ পদের রান্না করা হচ্ছে। মেঘ ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে ঘন্টা দুয়েক পড়াশোনা করেছে। নিচে নেমে মীম আর আদির সাথে আড্ডাও দিতে দিতে নাস্তাও করে এসেছে। কিন্তু আবির আর তানভিরের খবর নেই।
তানভিরদের এমপি মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে তানভিরের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে তিনগুন। তানভির ছোট থেকেই ভালো ছবি তুলতে পারে। রাজনীতি যেমন তার পছন্দ তেমনি ছবি তুলাও তার পছন্দের একটা কাজ। এমপি যেই না শুনেছে তানভির ভালো ছবি তুলতে পারে সেই থেকে দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছে তানভিরের উপর। মনোনয়ন পাওয়ার পর একটা নির্দিষ্ট তারিখ পর্যন্ত এমপি কোনে জনসমাবেশ করতে পারবে না৷ তাই এমপির পক্ষ থেকে সভাপতি, সহ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক থেকে শুরু করে প্রত্যেকে মিলে নির্দিষ্ট জায়গায় জনসমাবেশের আয়োজন করে এবং এমপি বাড়ি থেকে ভিডিপ কনফারেন্সের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এই টোটাল দায়িত্ব পরে গেছে তানভিরের উপর। সারাদিন শেষে বাকিদের থেকে ছবি সংগ্রহ৷ ইডিটিং৷ ভিডিও ক্রিয়েট সকল দায়িত্ব তানভিরের। সব কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে রাত ১২-১ টা বেজে যায়। মাঝে মাঝে সময় পেলে একটু আগে চলে আসে। পুরোটায় এখন এমপির মতামতের উপর নির্ভর । ইদানীং আবির ৮-৯ টার মধ্যে বাড়িতে ফিরে আসে, সময় সুযোগ মিললে তানভির বাসায় এসে খেয়ে আবিরের বাইক নিয়ে আবার বের হয়। রাত করে ফেরার কারণ সকালে উঠতে একটু দেরি হয়ে যায়। আজ যেহেতু শুক্রবার তাই রিলাক্সে ঘুমাচ্ছে দুই ভাই।
কিন্তু এদিকে মেঘ ছটফট করছে। ১০ টার উপরে বেজে গেছে এখনও আবির ভাই কেনো উঠছে না তা ভেবেই কুল কিনারা পাচ্ছে না। আবির যে বৃহস্পতিবার রাতে ঘুমায় না তা তো অষ্টাদশী জানেই না। বৃহস্পতিবার রাত শুধু আবিরের শোকের রাত৷ ভোরবেলা নামাজ পরে ঘুমায়, উঠে ১২ টার দিকে। তারপর গোসল করে নামাজে যায়।
অষ্টাদশীর কোমল মনকে কোনোভাবেই মানাতে পারছে না। তাই এতকিছু না ভেবে ছুটে গেলো আবির ভাইকে ডাকতে৷ শান্ত হস্তে দরজা ধাক্কা দিলো, সহসা খুলে গেলো দরজা। জানালার পর্দা টানা, রুমে আলোর পরিমাণ সীমিত, ফ্যানের বাতাসে পর্দা উড়ছে এদিক সেদিক। মেঘ প্রথমেই বিছানার দিকে তাকায়৷ বার বার পর্দা সরে যাওয়ায় বাহির থেকে আসা সূর্যের আলো চোখে মুখে পরছে আবিরের।
মেঘ আপাদমস্তক দেখলো। আবির গভীর ঘুমে মগ্ন, উন্মুক্ত শরীর, পেট পর্যন্ত পাতলা কাঁথা দিয়ে ঢাকা। চোখ সরালো মেঘ, দৃষ্টি পরলো আবির ভাইয়ের তামাটে চেহারায়। কি অপরূপ সেই মুখমণ্ডল!
সবাই ফর্সা ছেলেদের পিছনে ছুটে আর মেঘ যেনো এই তা*মাটে চেহারা,গুরু-গম্ভীর, অনুভূতিহীন, হি*ট লার স্বভাবের লোকটার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত দূর্বল হয়ে যাচ্ছে৷ মেঘের হৃদপিণ্ডের পিটপিট শব্দ যেন জানান দিচ্ছে,
“সামনে আগালে তোর মৃ*ত্যু নিশ্চিত! ”
তবুও মেঘ পা টিপে টিপে আগাচ্ছে আবির ভাইয়ের কাছে যেনো নুপুরের শব্দ না হয়। আবির ভাইয়ের কাছাকাছি গিয়ে থামে। আবির অবসন্ন চেহারাটা গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে মেঘ৷ ঘুমন্ত অবস্থাতেও আবির ভাইয়ের সৌন্দর্য যেনো একটুখানিও কমে নি বরং তা বেড়ে গেছে বহুগুণ । গাল ভর্তি ছাপ দাঁড়ি, সামনের দিকের লম্বা চুলগুলো ফ্যানের বাতাসে বারবার কপালে এসে পরছে। মেঘের মনে হচ্ছে, “আবির ভাইয়ের থেকে সুদর্শন পুরুষ দ্বিতীয়টি নেই। ”
মেঘের হৃদপিণ্ড ছুটছে দ্বিকবিদিক । নিশ্বাসের শব্দ জোড়ালো হলো।ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়েও ঘামতে শুরু করেছে মেঘ। ভাবছে চলে যাবে, কিন্তু এই শোভিত পুরুষকে রেখে যেতে পারছে না। মেঘের ইচ্ছে করছে সারাজীবন এভাবেই আবির ভাইকে দেখতে।
মেঘ দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছে না। তাই আবির ভাইয়ের পাশে বিছানাতেই বসে পরেছে। আবির তখনও ঘুমের দেশে নিমজ্জিত। অষ্টাদশী অভিনিবিষ্টের ন্যায় চেয়ে আছে৷
সব বাঁধা পেরিয়ে, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেঘ আস্তে করে ডাকলো,
“আবির ভাই”
ঘুমন্ত আবিরের থেকে কোনো উত্তর আসে নি৷ মেঘের খুব ইচ্ছে করছে আবির ভাইকে ছুঁয়ে দিতে।
মেঘ আরেকটু এগিয়ে আবিরের কাছাকাছি বসলো। কাঁপা কাঁপা হাত ছুঁয়ালো আবির ভাইয়ের গাল ভর্তি ছোট ছোট দাঁড়িতে। সঙ্গে সঙ্গে শিউরে উঠলো সমস্ত শরীর। বোধশক্তি হওয়ার পর জীবনে প্রথমবার মেঘ নিজের ইচ্ছেতে কোনো পুরুষকে ছুঁয়েছে , যেই ছোঁয়ায় মিশে আছে ভালোবাসা, অন্যরকম অনুভূতি জাগিয়ে দিচ্ছে অষ্টাদশীর হৃদয়ে।
সহসা আবির ডান হাতে চেপে ধরলো নিজের গালে রাখা অষ্টাদশীর হাত।মেঘের হাত কাঁপছে, দুনিয়া ঘুরছে, বক্ষে উথাল- পাতাল ঢেউ। বরফের ন্যায় জমে যাচ্ছে সম্পূর্ণ শরীর৷
আবির ঘুমের মধ্যেই মেঘের আঙুলের ভাঁজে আঙুল ডোবায়। গাল থেকে তুলে নিজের হাতের মুঠোয় নেয়। আবিরের হাতের মধ্যে মেঘের আঙুলগুলো কাঁপছে দেখে আবির আর একটু শক্ত করে চেপে ধরলো।
মেঘের ভয়ে ভয়ে তাকিয়েছে আবির ভাইয়ের মুখের দিকে। আবির তখনও চোখ বন্ধ করেই শুয়ে আছে,
অকস্মাৎ আবির আধোঘুমন্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
“আমি ছুঁয়ে দিলে সামলাতে পারবি তো মেঘ?”
মেঘ দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আবির ভাইয়ের মুখবিবরে আর ভাবছে,
“এখনও আধোঘুমে আছে মানুষটা, কিভাবে বুঝলো আমি এটা?”
আবির একহাতে কাঁথাটা পেট থেকে টেনে বুকে তুললো। আরেকহাতে তখনও মেঘের হাত চেপে ধরে আছে৷
আবির পুনরায় কন্ঠ ভারী করে বললো,
“এভাবে হুটহাট আমার রুমে আসবি না, যা তা হয়ে যাবে তখন আমায় কিছু বলতে পারবি না!”
সঙ্গে সঙ্গে শক্ত করে ঝাপটে ধরা হাতটাও ছেড়ে দেয়।
“মেঘ নির্বোধের মতো চেয়ে আছে আবির ভাইয়ের দিকে। আবির ভাইয়ের কথাটা বুঝার চেষ্টা করছে কিন্তু মোটা মাথায় কিছুই ঢুকছে না। রুমে আসলে কি এমন হবে?”
আবির পুনরায় বললো,
“এভাবে চেয়ে থাকিস না, আমার শরম করে”
মেঘ সহসা চোখ গোল গোল করে তাকায়, কিন্তু আবির ভাইয়ের অভিব্যক্তি বুঝার ক্ষমতা তার এখনও হয় নি। মেঘ চুপচাপ রুম থেকে বের হয়ে গেছে।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
ঘন্টাখানেক পর আবির উঠে শাওয়ার নিয়ে কালো পাঞ্জাবি সাথে সাদা প্যান্ট পরে নামাজের উদ্দেশ্যে নামছে। ইকবাল খানও রেডি হয়ে বেরিয়েছেন রুম থেকে।
ইকবাল খান আবিরকে দেখে ডাকলো,
“কিরে নামাজে যাচ্ছিস?”
আবির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে উত্তর দিলো,
“হ্যাঁ, তুমি যাবে না?”
“হ্যাঁ যাবে তো, আদি আসছে ওকে নিয়ে যাই। দাঁড়া একটু! ” ইকবাল খান বললেন।
মেঘ সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আবির ভাইকে দেখে ঠয় দাড়িয়ে পরে, সকালের ঘটনা মনে পরে যায় মেঘের। কালো পাঞ্জাবিতে মা*রাত্মক সুন্দর লাগছে আবির ভাইকে।
নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিলো,
“কিছু সুন্দর জিনিস দূর থেকে দেখায় শ্রেয়, কাছে গেলে জ্ব*লসে যাবি!”
একপা একপা করে পিছন দিকে উঠছে। আবিরের দৃষ্টি পরে সিঁড়িতে থাকা অষ্টাদশীর দিকে। মেঘের কান্ডে আবির কপাল কুঁচকালো , তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বুঝার চেষ্টা করলো।। আবির ভাইয়ের তাকানো দেখে মেঘ সহসা ছুটে রুমে চলে যায়।
আবির, আদি আর ইকবাল খানও নামাজের জন্য চলে গেছেন। তানভিরও রেডি হয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। এই সুযোগে মেঘ খেতে আসে।
পেইজ: Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
৩ টায় মেঘের পরীক্ষা আছে টিউশনে। তাই রেডি হয়ে একেবারে বের হয়েছে রুম থেকে। পার্কিং এ গাড়ি আছে কিন্তু ড্রাইভার আংকেল নেই দেখে ফোন বের করলো কল দেয়ার জন্য। তখনি আবির আঙুলে চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে বের হলো।
মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে আবির ভাইয়ের দিকে।
আবির বাইকের দিকে যেতে যেতে বললো,
“আংকেল ছুটিতে আছে৷ কল দিয়ে লাভ নেই। ”
মেঘ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কি করবে বুঝতে পারছে না, রিক্সা দিয়ে চলে যাবে নাকি আবির ভাই নিয়ে যাবে কিছুই বুঝতে পারছে না।
আবির বাইক টেনে মেঘের সামনে এসে থামলো,
ছোট করে বললো,
“উঠ”
মেঘ লাজুক হেসে বাইকে উঠলো, আজ আর তাকে দ্বিতীয় বার বলতে হলো না, বাইকে বসেই আবির ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলো।
বাইক থামলো টিউশনের সামনে মেঘ নেমেই ভেতরে ঢুকে গেলো, আসার পথে একটা কথাও বলে নি কেউ। কে ই বা বলবে, মেঘ তে সকালের ঘটনা নিয়েই এখনও আপসেট আর অন্যদিকে আবির তো স্ব ইচ্ছেতে কখনো কথায় বলে না।
মেঘ ভিতরে ঢুকে বন্যর পাশে বসলো। দুই বান্ধবীর ২-১ টা কথা বলতে বলতে আবির ঢুকলো ভিতরে। স্যারকে সালাম দিতেই স্যার তাকালো আবিরের দিকে,
কয়েক মুহুর্ত পর স্যার বলে উঠলেন,
“তুই আবির না?”
আবির হাসিমুখে উত্তর দিলো,
“জ্বী৷ কেমন আছেন স্যার?”
স্যার হাসিমুখে উত্তর দিলো,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তোকে কতবছর পর দেখলাম৷ দেশে আসলি কবে?”
“২০-২২ দিন হবে, বাসার সবাই কেমন আছে স্যার?”
“আলহামদুলিল্লাহ সবাই ভালো আছে। মেঘ ই তো তোর বোন? ”
“জ্বি স্যার, চাচাতো বোন!” আবির উত্তর দিলো।
স্যার হাসিমুখে বললেন,
“ও তো পড়াশোনায় খুব ভালো, মনোযোগী কিন্তু মাঝে মাঝে একটু ফাঁকি দেয়। তুই একটু নজর রাখিস। ”
“জ্বি স্যার, আমি আসি তাহলে । আসসালামু আলাইকুম স্যার।”
মেঘ আর বন্যা এতক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে আবির ভাই আর স্যারের কথোপকথন শুনছিলো। এক বান্ধবী আরেক বান্ধবীর দিকে তাকাচ্ছে বার বার৷ এরমধ্যে স্যার পরীক্ষা শুরু করে দিয়েছেন।
১ ঘন্টা পরীক্ষা দিয়ে বের হলো দুই বান্ধবী। আবির ভাই রাস্তার পাশে বাইকে বসে ফোন চাপতেছিলেন। মেঘকে দেখেই বাইক থেকে নেমে দাঁড়ালেন। মেঘ বন্যার থেকে বিদায় নিয়ে আবির ভাইয়ের কাছে এসে প্রশ্ন করলো,
“আপনি যান নি?”
আবির সবসময়ের মতো গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলো,
“না”
আবির পুনরায় স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“কিছু খাবি?”
মেঘ মাথা দিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো৷
আবির বললো,
“কি?”
মেঘ ভয়ে ভয়ে বললো,
“বক*বেন না তো?”
আবির গুরুভার কন্ঠে বললো,
“কি খাবি বল”
মেঘ কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
“ফুচকা”
আবির সহসা বললো,
“উঠ ”
বাইক স্টার্ট দিলো থামালো এসে একটা ফুচকার দোকানের সামনে। মেঘ নেমে সাইডে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আবির বাইক থেকে নেমে হেলমেট খুলতেই, দূর থেকে রাকিব দৌড়ে এসে ঝাপটে ধরে আবিরকে।
আকস্মিক ঘটনায় কিছুটা নড়ে উঠে আবির৷
রাকিব ঠাট্টার স্বরে বললো,
“কিরে বন্ধু, এই জীবনে তো তোকে ফুচকার দোকানে দেখি নি৷ তা হঠাৎ এখানে কেনো? সে আসবে নাকি?”
আবির চোখে ইশারা দিতেই রাকিবের চোখ পরে মেঘের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আবিরকে ছেড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়ায় ।
রাকিব হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে,
“কেমন আছেন ভা… সরি আপু?”
মেঘ আবির ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিলো,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো,আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আমি রাকিব। তোমার আবির ভাইয়ের ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড। তুমি মেঘ তাই তো?”
মেঘ উত্তর দিলো,” জ্বি”
” ফুচকা খেতে এসেছো?” প্রশ্ন করলো রাকিব ভাইয়া।
মেঘ পুনরায় ছোট করে বললো,
“জ্বি।”
রাকিব এবার হাসিমুখে বললো,
“আজ আমার পক্ষ থেকে তোমার জন্য ফুচকা ট্রিট। আনলিমিটেড ফুচকা খেতে পারো!”
মেঘ কিছু বলার আগেই আবির রাগান্বিত কন্ঠে বললো,
“তোর ট্রিট দিতে হবে না। আনলিমিটেড ফুচকা খাওয়ানোর ক্ষ*মতা আমার আছে। ”
রাকিব স্ব শব্দে হেসে বললো,
“আরে বন্ধু রা*গ করছিস কেন, তুই তো খাওয়াবিই সারা….”
এতটুকু বলতেই আবির রাকিবের মুখ চেপে ধরে। রা*গে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
“নিজের কাজে যা৷ আমার টা আমাকে বুঝে নিতে দে!”
রাকিব কিছুটা আহত হলো৷ মেঘের থেকে বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো,
“সন্ধ্যার পর চলে আসিস ”
আবির সহসা বলে উঠলো, ‘ঠিক আছে”।
চলবে………..
গানের কথা, সুর ও শিল্পী: মোঃ জহিরুল ইসলাম
https://www.youtube.com/watch?v=KY9ZFJoF1_w&list=RDKY9ZFJoF1_w&start_radio=1
